বলিউডে গত দুই দশক ধরেই চলছে খান’সাহেবদের রাজত্ব। শাহরুখ-সালমান-আমিরে বুঁদ হয়ে আছে গোটা হিন্দি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিটাই। একজন রোমান্সের জাদুকর, আরেকজন অ্যাকশনের, আর অন্যজন একেকটা ভিন্নধর্মী সিনেমা উপহার দিয়ে চলেছেন দর্শকদের। এই তিনজনের সাফল্যগাঁথার ভীড়ে বাকীদের নজরে পড়ে না সেভাবে। বক্স অফিস বলুন কিংবা দর্শক হৃদয়, সবখানেই তিন খানের জয় জয়কার। কিন্ত অভিনয়? অভিনয়ে কোন খান সেরা? এই প্রশ্নটা উঠলে শাহরুখ-সালমান-আমিরকে হঠিয়ে আরেকজন খানের চেহারা উঁকি দেয় মানসপটে।

হ্যাঁ, তিনিও খান, বাকী তিনজনের মতো ধর্মে তিনিও মুসলিম। বিশাল অঙ্কের ফ্যান-ফলোয়ার নেই এই ভদ্রলোকের, তার সিনেমা শতকোটির ব্যবসা করে না, একেকটা সিনেমা রিলিজ হলেই উৎসব লেগে যায় না। তবুও তিনি সেরা, অভিনয়ের পারদর্শীতাকে যদি মানদণ্ড ধরা হয়, তাহলে বাকী খান’দের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে আছেন এই ভদ্রলোক, নাম তার সাহিবজাদা ইরফান আলী খান, বলিউড থেকে হলিউড- বিশ্বের সিনেমাজগত যাকে ইরফান খান নামে চেনে!

পরিবারের সঙ্গে অভিনয়ের কোন সম্পর্কই ছিল না, দূর-দূরান্তের কোন আত্নীয়-স্বজন জীবনে শখ করেও নাটক-সিনেমায় অভিনয় করেছেন বলে রেকর্ড নেই। সেই রক্ষণশীল পরিবার থেকে উঠে আসা ইরফান প্রেমে পড়লেন অভিনয়ের। পূর্বপুরুষ ছিলেন জমিদার, সেই ঠাট-বাট না থাকলেও, বাবার রক্তে মিশে ছিল শিকারের ঘ্রাণ। ছুটির দিনে টায়ারের দোকান বন্ধ রেখে ভাঙাচোরা জীপগাড়ি নিয়ে তিনি ছুটতেন জঙ্গলের দিকে, কিন্ত সেই নেশাটা ছোট্ট ইরফানকে টানেনি কখনও। ইরফান সেই শিকারগুলোর পেছনে খুঁজে পেতেন নির্মম একটা গল্প। যে নিরীহ পশুটা গুলি খেয়ে কাতরাচ্ছে, তার পরিবার আছে, যে মৃত হরিণটাকে জীপের পেছনে তুলে নিয়ে আসা হচ্ছে, তারও নিশ্চয়ই বাচ্চা ছিল, সেই বাচ্চাটা হয়তো মায়ের পথ চেয়ে বসে আছে!

ইরফানের মাথায় ফিল্মের পোকা ঢুকে গেল কিশোর বয়সেই। স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া জয়পুরের এক কিশোর তখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অঙ্গভঙ্গি করে, স্বপ্নের সীমানাটা তার অনেক বড়। সে দীলিপ কুমার হতে চায়, মিঠুন চক্রবর্তীর মতো নেচে নেচে ডিস্কো মাতাতে চায়। কিন্ত নিজের চেহারা নিয়ে মনে তার বড় সংশয়, এই বিদঘুটে চেহারা নিয়ে কেউ নায়ক হতে পারে? ফিল্মস্টার হতে হলে যেতে হবে বোম্বেতে, রাজস্থান থেকে বোম্বের দূরত্বটা খুব বেশী নয়, আবার একেবারে কমও নয়। কিন্ত সরাসরি বোম্বে গেলে লাভ নেই কোন, কেউ তাকে চেনে না, শুধুশুধু তাকে কাজ দেবে কেন? খোঁজখবর করে জানা গেল, দিল্লির ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় ভর্তি হলে নাকি নাটক-সিনেমায় রোল পাওয়া যায়। যেতে হবে দিল্লিতে, কিন্ত পরিবার কি সেই অনুমতি দেবে?

কাজেই নিতে হলো মিথ্যের আশ্রয়, মনগড়া এক কাহিনী বানালেন উনিশ বছরের ইরফান। মা’কে গিয়ে বললেন, দিল্লিতে পড়তে যাবেন তিনি, সেখান থেকে ডিগ্রি নিয়ে এলে জয়পুর ইউনিভার্সিটির প্রফেসর হতে পারবেন। কিন্ত দিল্লি যাবার আগেই হুট করে বাবার মৃত্যু হলো, পরিবারের সবটুকু ভার নেমে এলো বড় ছেলে ইরফানের কাঁধে, সবাই চেয়ে আছেন তার মুখের দিকে। ইরফান দমলেন না, ছুটলেন নিজের স্বপ্নের পেছনে। নিজের ছোটভাইয়ের প্রতি ভীষণ কৃতজ্ঞ ইরফান, সেই ছোটভাই যদি পরিবারের হাল না ধরতেন সেই সময়ে, ইরফান হয়তো একজন টায়ারের ব্যবসায়ী হয়েই জীবনটা কাটিয়ে দিতেন, ইরফান খান নামের দুর্দান্ত এই অভিনেতাকে পাওয়া হতো না ভারতের।

ইরফান খান, এনএসডি, পান সিং টোমার, তিগমানশু ধুলিয়া, রাজস্থান, জয়পুর, দিল্লি, মুম্বাই, বলিউড, মীরা নায়ার

দিল্লিতে গিয়ে আরেক বিপদ, নিয়মকানুন কিছুই তো জানতেন না ইরফান। সেখানে ভর্তি হতে গিয়ে দেখেন, এনএসডিতে সুযোগ পেতে হলে কমপক্ষে দশটা নাটকে অভিনয় করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে! আবার নিতে হলো মিথ্যার আশ্রয়, ভুয়া কাগজপত্র বানালেন তিনি, নিজের খুশীমতো নাটকের নাম আর চরিত্র বসিয়ে দিলেন, জাল সই-স্বাক্ষর জোগাড় করে আবেদন করলেন। ভাইভাতে তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, কেন এনএসডিতে ভর্তি হতে চান? এখানেও মিথ্যা বললেন ইরফান, জবাব দিলেন, নাটকে অভিনয় করতে চান বলেই এনএসডিতে পরীক্ষা দিতে এসেছেন। অথচ ইরফানের স্বপ্নের আকাশজুড়ে তখন রঙিন সব সিনেমার ওড়াউড়ি!

দিল্লির জীবন শুরু হলো ইরফানের। ঘরে তখন সংকট, টায়ারের দোকান থেকে যা আয় হয়, পুরোটা দিয়েও পরিবারের খরচ চলে না। ইরফান তাই বাড়ি থেকে টাকা-পয়সাও নিতে পারেন না। এনএসডি থেকে অল্পকিছু টাকা বৃত্তি পেতেন, সেটা দিয়েই কষ্টেশিষ্টে চালিয়ে নিতেন মাসটা। কোন মাসে হয়তো মুদি দোকানে বাকী পড়ে যেতো, কোন মাসে চায়ের দোকানে। পরের মাসের টাকা হাতে এলে শোধ করতেন, কখনও বা দুই তিন মাস লেগে যেতো। একটা বাসায় গিয়ে দুটো বাচ্চাকে পড়াতেন, পনেরো রূপি করে পাওয়া যেত মাসে। সেই টাকা জমিয়ে দিল্লিতে চলার জন্যে একটা সাইকেল কিনেছিলেন ইরফান।

এনএসডি’র জীবনটা একদম অন্যরকম, যে জীবন সম্পর্কে ইরফানের কোন পূর্ব ধারণাই ছিল না। সারা দেশ থেকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করা মেধাবী ছেলেমেয়েগুলো আসে এখানে, অভিনয় শিখতে। প্রত্যেকেই খুব হাইপ্রোফাইল কালচারাল ব্যকগ্রাউন্ড নিয়েই যোগ দেয় এনএসডিতে, সেখানে ইরফানের এমন কিছুই নেই। নিজেকে কেমন যেন এলিয়েন মনে হতো ওদের ভীড়ে। তার ওপরে, পুরো ব্যাচের মধ্যে সম্ভবত ইরফানই দেখতে সবচেয়ে বিদঘুটে ছিলেন সেই সময়ে। মেইন রোল মিলতো না কখনও, নিজেও কারো কাছে বড় কোন চরিত্র চেয়ে নেননি কোনদিন। স্ক্রীপ্টটা বুঝে নিয়ে সারাদিন সেটা আত্মস্থ করতেই ব্যস্ত থাকতেন। সবাই যখন আড্ডা দিতো বা ফুর্তি করতো, তখন ইরফানকে দেখা যেত এক কোণে বসে আছে, হাতে থাকতো মোটা স্ক্রীপ্টবুকটা।

এই ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামাতেই ইরফানের বন্ধুত্ব হলো তিনজনের সঙ্গে, খুবই ভালো বন্ধুত্ব যাকে বলে। ইরফান তখন জানতেন না, ওর পুরোটা ক্যারিয়ার, কিংবা পুরোটা জীবনের চলার পথে প্রতিটা বাঁকে ওদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে চলতে হবে। এদের একজন সুতপা সিকদার, দিল্লিনিবাসী বাঙালী এই তরুণীর সঙ্গে পরে প্রণয়ে জড়িয়েছেন ইরফান, পরে তো তার জীবনসঙ্গীতেই পরিণত হয়েছেন সুতপা। আরেকজনের নাম তিগমানশু ধুলিয়া, অনেক বছর বাদে যার পরিচালিত সিনেমায় অভিনয় করেই সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বাগিয়ে নেবেন ইরফান! ওদের সঙ্গে আড্ডা দেন ইরফান, সেই আড্ডায় রবার্ট ডি নিরো উঠে আসেন, আসেন স্করসিজি কিংবা উডি অ্যালেনের মতো ব্যক্তিত্বরাও, ওদের নিয়ে আলোচনা হতো দিনভর।

১৯৮৮ সালের কথা, ইরফান তখন এনএসডির ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। থার্ড ইয়ার থেকেই মোটামুটি নামডাক ছড়িয়ে পড়েছে তার, সেবছর বিখ্যাত পরিচালক মীরা নায়ার এলেন এনএসডিতে, তার ‘সালাম বোম্বে!’ সিনেমার লীড আর্টিস্টের খোঁজে। অডিশন নেয়া হলো, প্রায় দুই-আড়াইশো ছেলের মধ্যে ইরফানকেই মনে ধরলো মীরা’র। তাকে নেয়া হলো ‘সালাম বোম্বে’ সিনেমার মেইন রোলে। গল্পটা এখান থেকে নতুন করে শুরু হতে পারতো, ইরফানের সাফল্যগাঁথার শুরুটাও এখান থেকেই হতে পারতো হয়তো। কিন্ত নিয়তির লিখন তো অন্যরকম ছিল।

ইরফান খান, এনএসডি, পান সিং টোমার, তিগমানশু ধুলিয়া, রাজস্থান, জয়পুর, দিল্লি, মুম্বাই, বলিউড, মীরা নায়ার

দুই মাসের ওয়ার্কশপ করার পরে ইরফান জানতে পারলেন, লিড রোলে তাকে রাখা হচ্ছে না। পরিচালকের মনে হচ্ছে, নায়কের রোলের তুলনায় ইরফানের বয়স বেশী। স্বপ্নটা ভেঙে খানখান হয়ে গেল ইরফানের। মীরা নায়ারের মতো পরিচালকের সিনেমায় লিড রোলে অভিনয় করে ক্যারিয়ার শুরু হবে, এসব ভেবেই স্বপ্নের ফানুস উড়ছিল ইরফানের মনে, সেই ফানুসের আগুন নিভে গেল একটা দমকা হাওয়ায়, ঝোড়ো বাতাস সেই স্বপ্নালু মেঘগুলোকে উড়িয়ে নিয়ে গেল বহুদূরে। এই খবরটা শোনার পরে বাচ্চাদের মতো কেঁদেছিলেন ইরফান! মীরা ইরফানকে একদম হতাশ করতে চাইলেন না, তাই লেটার রাইটারের একটা ছোট্ট রোলে অল্প কয়েক সেকেন্ডের জন্যে পর্দায় রাখা হলো তাকে।

এনএসডি থেকে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে মুম্বাইয়ের ট্রেনে চেপে বসলেন ইরফান। স্বপ্ন ভেঙেছে, কিন্ত সেই স্বপ্নের পেছনে ছোটা ছাড়েননি তিনি। ড্রামা স্কুলে ঢোকার আগে ভেবেছিলেন এনএসডিতে একবার ঢুকতে পারলে সিনেমায় নামতে কোন সমস্যাই হবে না। কিন্ত সেটা যে এভারেস্টে চড়ার প্রথম ধাপ, তা জানা ছিল না ইরফানের। মুম্বাই এলেন মোটামুটি খালি হাতেই, সেখানে এসে এনএসডি’র পরিচিত কয়েকজনের মাধ্যমে একটা টেলিভিশন সিরিয়ালে ছোট্ট রোলে কাজ করলেন, ছোটখাটো চরিত্রে তাকে দেখা যেতে থাকলো। এই সময়েও হাজারো বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়েছে ইরফানকে, সইতে হয়েছে নানা গঞ্জনা।

একটা সিরিয়ালে তিনি পুলিশের চরিত্রে অভিনয় করছিলেন, ছোট্ট একটা দৃশ্য ছিল তার, বন্ধ একটা দরজার সামনে গিয়ে পিস্তল তাক করে বলতে হবে- হ্যান্ডস আপ! দরজার ভেতরে থাকবেন নায়ক। সেই দৃশ্যে অভিনয় করতে গিয়ে হাত কাঁপছিল ইরফানের, সেটা দেখে নাকি তাকে যাচ্ছেতাই ভাবে বকেছিলেন সেই নায়ক। আরেকবার একটা সিরিয়ালে কাজ করেছেন, চুক্তি ছিল সাড়ে সাতশো রূপি দেয়া হবে তাকে। কাজ শেষে টাকা নিতে গিয়ে দেখেন তাকে সাড়ে তিনশো রূপি দেয়া হয়েছে, প্রোডাকশন ম্যানেজার বললেন, ইরফানের অভিনয় নাকি মোটেও ভালো হয়নি, তাই অর্ধেক পারিশ্রমিক কেটে রাখা হয়েছে!

সিরিয়াল করছিলেন, ছোটখাট চরিত্রে ফিল্মেও নাম লিখিয়ে ফেলেছিলেন মোটামুটি। কিন্ত ইরফান তো ভারত জয় করতে এসেছেন, নিজের অভিনয়প্রতিভায় সবাইকে তাক লাগিয়ে দিতে এনএসডির কষ্টসংকুল দিনগুলো পাড়ি দিয়েছেন। সেই ফিল্মেই ভালো কোন রোল পাচ্ছিলেন না। ২০০৩ সালে সেই সুযোগটা এসে গেল হাতে। একই বছরে ‘হাসিল’ আর ‘মকবুল’- দুই ছবিতেই দুর্দান্ত অভিনয় করলেন। হাসিলে তিনি ছিলেন ভিলেন রোলে, দারুণ অভিনয়ের সুবাদে সেবছর ফিল্মফেয়ারে সেরা নেগেটিভ রোলের পুরস্কারটা পেলেন ইরফান।

এরপর মোটামুটি কাজের অফার আসা শুরু করলো নিয়মিত। সিরিয়াস কিংবা কমেডি, পাগল, ভালোমানুষ অথবা ভিলেন- পর্দায় নিজেকে সবগুলো রূপেই হাজির করেছেন ইরফান। যে মীরা নায়ারের ছবির লীড রোল থেকে ক্যারিয়ারের শুরুতে বাদ পড়েছিলেন, সেই মীরা নায়ারই তাকে নিয়ে বানালেন ‘দ্য নেমসেক’। লাইফ ইন এ মেট্রো, বিল্লু, সানডে, নিউইয়র্ক, সাত খুন মাফ- জার্নিটা চলতে থাকলো। এরমাঝে অস্কারজয়ী সিনেমা স্ল্যামডগ মিলিওনিয়ারেও দেখা গেছে তাকে।

ইরফান খান, এনএসডি, পান সিং টোমার, তিগমানশু ধুলিয়া, রাজস্থান, জয়পুর, দিল্লি, মুম্বাই, বলিউড, মীরা নায়ার

তবে সবচেয়ে বড় সাফল্যটার জন্যে ইরফানকে অপেক্ষা করতে হলো ২০১২ সাল অবদি। কিংবা অভিনেতা ইরফানের সেরাটা দেখার জন্যে দর্শককে অপেক্ষা করতে হলো ২০১২ পর্যন্ত। এনএসডি’র বন্ধু তিগমানশু ধুলিয়া সিনেমা বানাবেন, সিনেমার প্লট ভারতের সাবেক সেনা জওয়ান, অ্যাথলেট এবং ভাগ্যের ফেরে ডাকাতে পরিণত হওয়া ‘পান সিং টোমার’কে নিয়ে, তার নামেই সিনেমার নামকরণ। এতদিন ধরে ছোটখাটো কিংবা মাঝারী রোল করে আসা ইরফান নিজেকে চেনালেন পান সিং-এর চরিত্রেই। সাড়ে চার কোটি রূপি বাজেটের এই সিনেমার বক্স অফিস ইনকাম ছিল প্রায় চল্লিশ কোটি রূপি, ব্লকবাস্টার হিট! অ্যাওয়ার্ড শো গুলোতে তখন পান সিং-রূপী ইরফানের জয়জয়কার, সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার হাতে তুললেন তিনি, ফিল্মফেয়ারে সমালোচকদের রায়ে সেরা অভিনেতাও ইরফান খানই!

পুরস্কার পাবার পরে দায়িত্বটা আরও বেড়ে গেল, ইরফানও সেই দায়ভার বয়ে চললেন নিজের কাঁধে। পান সিং টোমারের সঙ্গে একই বছর মুক্তি পেয়েছিল দ্যা লাঞ্চবক্স। পঞ্চাশোর্ধ্ব এক একাউন্টস কর্মকর্তার চরিত্রে ইরফানের কি দুর্দান্ত অভিনয়! সেই অভিনয়ের ধার তিনি বজায় রেখেছেন কিসসা, ডি-ডে, গুন্ডে, তালভার, পিকু, হিন্দি মিডিয়াম কিংবা কারিব কারিব সিঙ্গেল-এ। বলিউডের পাশাপাশি ভারতীয় অভিনেতা হিসেবে তাকেই একমাত্র নিয়মিত দেখা যায় হলিউডে। দ্যা এমাজিং স্পাইডারম্যান, লাইফ অফ পাই, জুরাসিক ওয়ার্ল্ড কিংবা ইনফার্নো- ইরফানের প্রতিভার স্বাক্ষর বুঝতে বিলম্ব হয়নি হলিউডি পরিচালকদের। তবে হলিউডে যতটা না কাজ করেছেন, তারচেয়ে বেশী কাজ তিনি ছেড়েছেন। শিডিউল না মেলা কিংবা গল্প পছন্দ না হওয়ায় ক্রিস্টোফার নোলানকে না করেছেন তিনি, দ্যা মার্শিয়ানে অভিনয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। ইরফান খান বলেই এটা সম্ভব বোধহয়। মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী’র সিনেমা ‘ডুব’ এ কাজ করেছেন তিনি, গল্পটা পছন্দ হয়েছে বলে। সিনেমা বাছায়ের ক্ষেত্রে স্ক্রীপ্টের চেয়ে বড় কোন মানদন্ড তার কাছে নেই, আগেও ছিল না।

ছোট্ট একটা শহর থেকে উঠে আসা মধ্যবিত্ত ঘরের সেই কালোমতোন ছেলেটাকে এখন পুরো ভারত চেনে, হলিউডের জমিনে ভারতের পতাকা ওড়ান তিনি। বাকী খানদের মতো তার সিনেমা আসা মানেই উৎসব নয়, কিন্ত শিক্ষিত শ্রেণীর দর্শকেরা চোখ বন্ধ করে ভরসা রাখতে পারেন তার ওপরে, কারণ তারা জানেন, ইরফান অভিনয়টা জানেন, স্ক্রীপ্ট বাছাইতে তার ভুল হয় না, নিজের সবটুকু মেধা আর পরিশ্রম সিনেমার পেছনেই ঢেলে দেন এই মানুষটা। ভালো গল্পের অভাবে শাহরুখ-সালমানদের সিনেমাও যখন অ্যাভারেজ বা ফ্লপের কাতারে নাম লেখায় তখন ইরফানের হিন্দি মিডিয়ামের আয় একশো কোটি ছুঁয়ে ফেলে। এসবই অধ্যবসায়ের ফল।

জীবনে কোনদিন ভালো রোল পাবার জন্যে পরিচালককে তোষামোদ করেননি, সেটা তিনি করতে জানেনও না। একজন পরিচালককে যে ফোন করে ভালোমন্দের খোঁজ-খবর নেবেন, সেই ব্যপারটাই তিনি করতে জানেন না। যেটুকু পথ ইরফান পেরিয়েছেন, যে উচ্চতায় তিনি উঠেছেন, পুরোটাই মোটামুটি একক কৃতিত্বে। স্ত্রীর সাহায্য ছিল, তিগমানশু ধুলিয়ার মতো বন্ধুরাও পাশে ছিলেন, কিন্ত কষ্টের হার্ডলগুলো ইরফানকে পেরুতে হয়েছে একা, বরফশীতল ব্যর্থতার রাতগুলোতে ইরফানের বোবা কান্নার সাক্ষী হয়তো কেউই ছিল না। সাফল্যের চূড়ায় উঠে ইরফান দেখিয়ে দিয়েছেন, মানুষ চাইলে, আর সেইসঙ্গে সর্বোচ্চ চেষ্টাটা থাকলে সবকিছুই সম্ভব।

এই জানুয়ারীতেই বয়সের ঘড়ির কাঁটা তেপ্পান্ন সংখ্যাটাকে পেরিয়ে গেছে। এই বয়স্টাই তো একজন অভিনেতার জন্যে সবচেয়ে উৎকর্ষ সাধনের বয়স, নিজের প্রতিভার সর্বোচ্চ ব্যবহারের বয়স। ইরফান সেটা করে চলেছেন, আরও করবেন। তিনি তো নায়ক বা সুপারস্টার নন, তিনি চরিত্রাভিনেতা। মেথড অ্যাক্টিংটাকে অন্য একটা পর্যায়ে নিয়ে গেছেন ইরফান, যে জায়গা থেকে তার প্রতি প্রত্যাশার পারদটা কেবল বাড়তেই থাকে। সেই প্রত্যাশা ইরফান পূরণ করে যাবেন অনেক বছর ধরে, এটাই সবার কামনা।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-