গত কয়েকদিন ধরে অনলাইনে একটা শ্রেণী রীতিমত জোর জবরদস্তি করে যেভাবে “অনুপ্রেরণার গল্প” হিসেবে একটা মেয়ের “মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ” হওয়াটাকে ফোকাসে এনে গ্লোরিফাই করার চেষ্টা করে যাচ্ছে তা দেখে মনে খটকা জাগতে পারে- যেন তেন ভাবে “সফল” হলেই কি কাউকে রোল মডেল বলা যায়? সব সাফল্যই কি “অনুসরণ” যোগ্য? অনেক বোধ বুদ্ধি সম্পন্ন, সচেতন, লেখা পড়া জানা মেয়েদেরকেও সাফল্যের, সংগ্রামের উদাহরণ হিসেবে এই অর্জনটাকেই দেখার চেষ্টা টুকু দেখে মনে হতে পারে আমাদের দেশের মেয়েরা জানেই না এদেশে কত অসাধারণ সব নারী রোল মডেল আছেন যারা ঈশ্বর প্রদত্ত চেহারা বা চামড়া দেখিয়ে না, মাথার খুলির ভেতর যে মগজটা আছে সেটা কাজে লাগিয়ে অলরেডি দেশে বিদেশে বহু সুনাম কুড়িয়েছেন, সম্মানিত হয়েছেন। সমস্যা হলো, তাঁদের সংগ্রাম, সাফল্যের খবর ভাইরাল হয়না! 

আমাদের দেশের মেয়েদের কয়জন আয়েশা আরেফিন টুম্পার নাম শুনেছে? মেয়েটা ন্যানো টেকনোলজি কাজে লাগিয়ে কৃত্রিম ফুসফুস আবিষ্কার করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগতে রীতিমত হুলুস্থুল লাগিয়ে দিয়েছে! ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকোতে ন্যানো-সায়েন্সের উপর ডক্টরেট করতে থাকা মেয়েটা একই সাথে লস আলামস ন্যাশনাল ল্যাবেরটরিতে মানব মস্তিষ্কের রক্ত সংবহনের মডেল তৈরি করে ব্রেইন স্ট্রোকের কারণ অনুসন্ধান বিষয়ে গবেষণা কর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন । তার এইসব গবেষণা হাজার হাজার মানুষের জীবন বাঁচাবে হয়তো ভবিষ্যতে, অথচ তাকে নিয়ে দুই টা লাইন কেউ কোথাও লিখবে না। 

নারী, সুন্দরী প্রতিযোগীতা, সাফল্য, গবেষণা, অনুপ্রেরণা     আয়েশা আরেফীন টুম্পা, তার গবেষণাগারে 

চিকিৎসা ক্ষেত্রে দেশে বসেও নারীদের অবদান কি কম? icddr,b ঢাকার মহাখালীতে অবস্থিত পেটের অসুখ নিরাময়ে সারাদুনিয়ায় সুনাম কুড়ানো বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের ফেরদৌসী কাদরির সংক্রামক ব্যাধির গবেষণাকাজকে সম্মান জানিয়েছে দ্য ওয়ার্ল্ড একাডেমি অব সায়েন্স। একই প্রতিষ্ঠানের রুবানা রকিব ফুসফুসবহির্ভূত যক্ষ্মা রোগ নির্ণয়ের কৌশল আবিষ্কার করে সারা বিশ্বে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। আর সেখানকারই আরেক গবেষক আয়েশা মোল্লাকে বাংলাদেশ উইমেন সায়েন্টিস্টস অ্যাসোসিয়েশন সেরা বিজ্ঞানীর পুরস্কার দিয়েছে চালের গুঁড়া দিয়ে মারাত্মক ডায়রিয়ায় কার্যকর স্যালাইন আবিষ্কারের জন্য। এই বিজ্ঞানী, গবেষকরা নিরবে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছেন মানুষের জীবন বাঁচাতে। তারা কেন মেয়েদের রোল মডেল হবেন না? কেন তাদের এই পরিশ্রম গবেষণার কাজ, সাফল্য সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে না? 

চিকিৎসা থেকে এবার খাদ্যে আসা যাক। BIRI হলো আমরা যে দুই বেলা পেট ভরে ভাত খাই, সেটা যে ধান থেকে আসে, সেই ধান নিয়ে গবেষণার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। সেটার উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কিন্তু একজন নারীই- তমাল লতা আদিত্য। তাঁর হাত ধরে বাংলাদেশের কৃষকেরা পেয়েছেন ১০টি নতুন জাতের ধান! এর মধ্যে আছে ব্রি-৫৮, বাংলামতি, সরু বালাম, ব্রি-৭০। তিনি একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি এমন কিছু করতে চেয়েছি, যা আমাকে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে। দিনাজপুর থেকে নালিতাবাড়ী, যেখানে আমার ধান বোনা হয়েছে, সেখানে ছুটে গেছি।’- অনুপ্রেরণা হিসেবে কি যথেষ্ট নয়? 

নারী, সুন্দরী প্রতিযোগীতা, সাফল্য, গবেষণা, অনুপ্রেরণা                     ড. তমাল লতা আদিত্য

এখানেই শেষ নয়- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খান পাটের জীবনরহস্য উন্মোচনের কাজে যুক্ত ছিলেন। একই বিভাগের অধ্যাপক জেবা ইসলাম সেরাজের নেতৃত্বে সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে লবণসহিষ্ণু ধান- কি অসাধারণ অর্জন! এছাড়াও বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী রহিমা খাতুনের নেতৃত্বে আবিষ্কৃত হয়েছে দেশি পাট-৭, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচারের (বিনা) বিজ্ঞানী শামসাদ বেগম আবিষ্কার করেছেন গ্রীষ্মকালীন টমেটো। এগুলো কি বলার মত, অনুপ্রেরণা নেওয়ার মত সাফল্য না? 

নারী, সুন্দরী প্রতিযোগীতা, সাফল্য, গবেষণা, অনুপ্রেরণা              অধ্যাপক জেবা ইসলাম সেরাজ

শুধু কৃষি আর মেডিকেল বেশি এক্সাইটিং লাগছে না? হাউ এবাউট এপ্লাইড ফিজিক্স? সেই ১৯৭৫ সালে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে এই বিষয়ে পিএইচডি করতে যান বাংলাদেশের মেয়ে শাহিদা রফিক। তারপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। বিখ্যাত ডায়মন্ড রিসার্চ ল্যাবে তাঁদের আবিষ্কার এখনো কাজে লাগাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা! 

কিছুদিন আগেই বুয়েট একজন নারী ভিসি পেয়েছিল, খালেদা একরাম। তাঁর দায়িত্বগ্রহণের পর বুয়েটের কার্যক্রমে দারুন গতি এসেছিলো। যে বুয়েটে পড়ার স্বপ্নই দেখতে ভয় পায় লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী, সেই প্রতিষ্ঠানের ভিসি হওয়া- এটাকে রোল মডেল হিসেবে নেওয়া যায়? 

বুয়েটেরই আরেক শিক্ষক ও গবেষক তানজিমা হাশেম ২০১৭ সালের ওডব্লিউএসডি-এলসেভিয়ার ফাউন্ডেশন পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর নারী বিজ্ঞানীদের সংগঠন ওডব্লিউএসডি এই পুরস্কার দিয়ে থাকে। তিনি মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষার কম্পিউটারনির্ভর একটি উপায় বের করেছেন। অনলাইনে বিভিন্ন সেবা নেওয়ার সময় স্বাস্থ্য, অভ্যাস ও অবস্থানের বিষয়ে ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখার জন্যই এ রকম ব্যবস্থার প্রয়োজন। 

নারী, সুন্দরী প্রতিযোগীতা, সাফল্য, গবেষণা, অনুপ্রেরণা             বুয়েটের শিক্ষক তানজিমা হাশেম

আচ্ছা, শিক্ষা গবেষণা থেকে ব্যবসার দিকে যাই। মেয়েরা শুধু চাকরি করবেই কেন? মেয়েরা চাকরি দিতে পারে না? “টেকম্যানিয়া” “টিম ইঞ্জিন” “ডিক্যাস্টালিয়া ডটকমের” এই তিনটা প্রযুক্তি নির্ভর প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা কারা জানো? তিনজন নারী- যথাক্রমে তাসলিমা মিজি, সামিরা জুবেরী হিমিকা এবং সাবিলা ইনুন। তাঁদের তৈরী প্রতিষ্ঠানে এখন অন্যরা চাকরি করে। এছাড়াও বাংলাদেশ ওমেন চেম্বার অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রির (বিডব্লিউসিসিআই) প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমান সভাপতি সেলিমা আহমদ যিনি একই সাথে নিটল নিলয় গ্রুপের এ ভাইস চেয়ারম্যান সম্প্রতি তিনি অসলো বিজনেস শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। ২০১২ সালে তিনি সেরা নারী উদ্যোক্তা হিসেবে ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক পুরষ্কারও পান। এই মহিলা উদ্যোক্তা দীর্ঘদিন থেকে দেশে নারী উদ্যোক্তাদেরকে উৎসাহ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে কাজ করছেন। বাংলাদেশের এই মহিলা উদ্যোক্তাদের নিয়ে খবর বের হয় আমেরিকান পত্রিকায়! বিদেশীরা পুরষ্কার দেয়, সম্মানিত করে। 

নারী, সুন্দরী প্রতিযোগীতা, সাফল্য, গবেষণা, অনুপ্রেরণা                            সেলিমা আহমদ

এরকম আমাদের দেশের আরো অনেক মেয়েরা নিজেদের মেধা, পরিশ্রম আর দৃঢ় সংকল্প, মানবিকতা দিয়ে সফল হয়েছে, যাদের এই সাফল্য সময়ের সাথে মুছে যাবে না, বয়সের আঘাতে কুৎসিত হবে না। তাঁরা পাইলট হচ্ছে, সেনাবাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হচ্ছে, দুর্ধর্ষ পুলিশ অফিসার হচ্ছে, বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে বসছে। আমাদের দেশের মেয়েরা মেধায় মননে পরিশ্রমে কোন দিক দিয়েই পিছিয়ে নেই- দরকার শুধু তাদের স্যফল্য হাইলাইট করে সামনে নিয়ে আসা, যেন আমাদের মেয়েদের অনুপ্রেরণা নেবার জন্য উদ্ভট কোনকিছুকে রোল মডেল হিসেবে না নিতে হয়।

 
 
 

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-