– ইন্ডিয়ান গরু আইজকার হাটে আইছে বাজান?

তিন দিন ধরে এই প্রশ্নের উত্তরে ছেলেকে একটা করে আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন মনা মিয়া। আজ কী বলবেন তিনি আগে থেকে ঠিক করে রাখেন নি। এখন ভাবছেন। মনে মনে উত্তর গোছাচ্ছেন।

প্রশ্নটা আসে আবারও। প্রতিধ্বনিত হয় যেন বারবার,

– ইন্ডিয়ান গরু আইজকার হাটে আইছে বাজান?

এবার আর উত্তর না দিয়ে উপায় থাকে না। সরাসরি উত্তর দিয়ে দিতে হয় মনা মিয়াকে।
– না রে বাজান, আইজকাও আহে নাই।
– কবে আইবো?
– আমার মনডা কইতাছে কাইলকা আইবোই।
– আমারে কাইলকা হাডে নিয়া যাবা তাইলে।
– আইচ্ছা যামুনে।
– হাছা তো?
– হ হাছা।

কুরবানী ঈদ, ইন্ডিয়ান গরু

হাটে যাওয়ার আনন্দে বাবার সামনে থেকে দাঁত বের করে বাড়ির বাইরে আসে মনা মিয়ার ছেলে সুরুজ। প্রতিবার কোরবানির সময় শুধু গাওয়ালি ভাগের জন্য লাইন ধরে থাকতে সুরুজের ভালো লাগে না। কোরবানি নিয়ে যখন চারদিকে আলোচনা শুরু হয়, সুরুজ মনা মিয়াকে গিয়ে একদিন বলে,
– আব্বা, এইবার কিন্ত আমাগো কুরবানি দেওন লাগবো।
– কুরবানি দেওনের মত অত টেকা কি আর আমাগো আছে রে বাজান।
– আমি অত কথা বুঝি না। দেওন লাগবোই। দরকার হইলে আমারে যে ইস্কুলে যাওনের সময় দুই টেকা কইরা দেও ওইডা দিবা না। তাও কুরবানি দেওন লাগবো। গরু কিনুন লাগবোই।

টেনশনে পড়ে যায় মনা মিয়া। ছেলেকে সামর্থ্যের চেয়েও বেশি ভালোবাসেন তিনি। পকেটে পয়সা না থাকলেও ছেলের জন্য তার পকেট ভরা মায়া আছে।
– কি বাজান! কথা কও না কেন? কুরবানি দিবা না?
– আইচ্ছা বাপ। কুরবানি দিমু।
– কবে গরু কিনবা?
– ইন্ডিয়ান গরু আইলে গরুর দাম কইমা যাইবো। তহন গরু কিনমু।

সেই থেকে বাপ ছেলে মিলে ইন্ডিয়ান গরু আসার জন্য অপেক্ষা করছে। সর্বসাকুল্যে এদিক সেদিক মিলিয়ে মনা মিয়া অল্প কিছু টাকা জোগাড় করতে পেরেছেন। এখন দুটো কাজ, একটি হল ৭ জন ভাগীদার ঠিক করা যাদের নিয়ে অল্প দামে একটা গরু কিনতে পারবেন। তারপর ইন্ডিয়ান গরু আসার জন্য অপেক্ষা করা। কারণ দেশি গরুর দাম অনেক বেশি। তাদের সামর্থ্যের বাইরে।

কুরবানী ঈদ, ইন্ডিয়ান গরু

৭ জন ভাগীদার ঠিক করলেন মনা মিয়া। গ্রামের অসচ্ছলদের অনেকেই এই অল্প টাকায় কোরবানি করতে পারবে জেনে বরং খুশিই হচ্ছে। তবে তাদের একটাই জিজ্ঞাসা, এত কম দামে গরু পাওয়া যাবে তো? ইন্ডিয়ান গরু আসবে তো? ইন্ডিয়ান গরু না এলে তো আর দেশি গরু অত দাম দিয়ে তারা কিনতে পারবে না।

পরেরদিন হাটের জন্য রওনা হয় মনা মিয়া। সাথে লাল বল প্রিন্টের হাফ প্যান্ট আর হাতা কাটা গেঞ্জি পরে বাবার হাত ধরে সুরুজ। আর আছে অন্য ভাগীদারদের কেউ কেউ।

কদমতলী হাটের আকাশে বাতাসে গরু আর ছাগলের ভেজা ভেজা, ভারী ভারী ঢ্যাপঢ্যাপা এক গন্ধ। সেই গন্ধ যেন নেশা ধরিয়ে দেয় সুরুজের চোখে মুখে।

হাটে ঢুকতে গিয়েই গোবরে পাড়া দিয়ে স্যান্ডেল আটকে যায় সুরুজের। একটা গরু পেশাব করে দিলে ফোঁটা ফোঁটা পানি গিয়ে লাগে তার গায়ে। তবুও তার কোন বিতৃষ্ণা আসে না। গরুর প্রতি ভালোবাসা কমে না।

লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে কান খোঁচাচ্ছে, এমন এক গরু বিক্রেতাকে দেখে সুরুজ জিজ্ঞাসা করে,
– কাক্কা! ইন্ডিয়ান গরু কি আইছে?
– না ভাইস্তা। আহে নাই এহনো।

হতাশ হয় সুরুজ, তবে হাল ছাড়ে না। মনা মিয়ার পেছনে পেছনে হাঁটতে থাকে সে।

– আব্বা, কয়ডা টেকা দেও।
– টেকা দিয়া কি করবি? মজা কিনা খাবি?
– আগে তুমি দেও।

বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে গরুর গলায় দেয়ার জন্য একটা মালা কিনে আনে সুরুজ। সেটা বুকের সাথে জড়িয়ে রাখে।

সারাদিন হাটে ঘুরে ঘুরে ছোট ছোট গরুগুলোর দাম জিজ্ঞাসা করেন মনা মিয়া। দাম শুনে দুই পা পিছিয়ে আসেন।

কুরবানী ঈদ, ইন্ডিয়ান গরু

হাট শেষের দিকে। দাম হাঁকাতে হাঁকাতে ক্লান্ত ব্যাপারীরা এক হাজার টাকার নোট গুনতে গুনতে বাড়ি ফিরছে। পছন্দমত গরু কিনতে পেরে খুশি মনে সেটাকে টানাটানি করে নিয়ে যাচ্ছে চাচা- ভাতিজারা মিলে। হাটের মধ্যে ঝালমুড়ি বিক্রি করতে আসা তবরিজ মিয়া তার ডালা গোছাচ্ছেন। চাপড়ার দোকানের ঝাপ বন্ধের প্রস্তুতি চলছে।

মনা মিয়া তার অন্য ভাগীদারদের সাথে নিয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরছে। ছেলের দিকে লজ্জায় তাকাতে পারছে না। সুরুজ হাঁটছে বাবার পেছনে। তার হাতে মালা, কাগজ দিয়ে বানানো জীবন্ত এক অনুভূতি।

হাঁটছে সবাই। ফাঁকা হচ্ছে বড় রাস্তা। বড় রাস্তা পার হয়ে সবাই সবার মত এলাকার ছোট রাস্তা ধরলো। মনা মিয়া হাঁটছে ভাগীদারদের সাথে। পেছনে সুরুজ নেই।

সুরুজ বসে আছে বড় রাস্তার পাশের উঁচু ঘাসের উপর। তার হাতে স্বপ্নের মত এক মালা। তার বুকের উত্তেজনা মুহূর্তে মুহূর্তে কষ্ট হয়ে মিশে যাচ্ছে টায়ার আর ধুলোর সাথে।

সুরুজ আর কোথাও যাবে না। সে এখানেই মালা হাতে বসে থাকবে। এখানের এই বড় রাস্তার পাশেই। সে বিশ্বাস করে, এই রাস্তা দিয়েই ইন্ডিয়ান গরু ভর্তি ট্রাক আসবে…

Comments
Spread the love