ইলুমিনাতি সম্পর্কে নিশ্চয়ই কমবেশি অবগত রয়েছেন সবাই। এটি হলো একটি গুপ্ত সংগঠন যা বিশ্বের সকল দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এ বিষয়ে প্রচলিত কন্সপিরেসি থিওরি বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব রয়েছে যে এই রহস্যময় গোপন সংগঠনের সদস্যবৃন্দের মধ্যে রয়েছেন বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যাংকার, রাজনীতিবিদ এবং বিশ্ব মিডিয়ার রাঘব বোয়ালগন। এদের মূল লক্ষ্য হচ্ছে ক্রমবর্ধমান শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দেশে দেশে অত্যাচারী সরকার ব্যবস্থা কায়েম করে দেশ ও জাতি নির্বিশেষে মানুষের ধর্মীয়, মানবিক, সামাজিক এমনকি ব্যক্তিগত অস্তিত্বের উপর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা।

তবে ইলুমিনাতিকে বলা চলে অনেকাংশেই পশ্চিমা একটি সংস্কৃতি। কেমন হবে যদি আপনাদেরকে বলি, ভারতীয় উপমহাদেশেরও রয়েছে এমনই একটি গুপ্ত সংগঠন, যেটি কিনা ইলুমিনাতির চেয়েও অনেক বেশি ব্যাপক, সক্রিয় ও রহস্যময়? হ্যাঁ পাঠক, ঠিক এমনটিই মনে করা হয় ‘The Nine Unknown Men’ তথা ‘নয় রহস্যময়’ সম্পর্কে। আজ আপনাদের সামনে তুলে ধরব এই নয় রহস্যময়েরই ইতিবৃত্ত।

এ ব্যাপারে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই যে নয় রহস্যময়ের গোড়াপত্তন করেন সম্রাট অশোক। তবে কবে এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় সে ব্যাপারে কিছুটা বিতর্ক রয়েছে বৈকি। কেউ বলেন খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩ সালের পর, আবার কারও মতে খ্রিষ্টপূর্ব ২২৬ সালের পর। নয় রহস্যময় সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনায় যাওয়ার আগে জানা দরকার সম্রাট অশোকের ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। সম্রাট অশোক সম্পর্কে এইচ. জি. ওয়েলস তাঁর Outline of World History গ্রন্থে লিখেছিলেন, “Among the tens of thousands of names of monarchs accumulated of the files of history, the name Ashoka shines almost alone, like a star.”

তিনি ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পৌত্র, যিনি গ্রীকদের নিকট পরিচিত ছিলেন সান্দ্রোকোত্তোস বা আন্দ্রাকোত্তাস নামে, এবং যিনি প্রথম সম্রাট হিসেবে বৃহত্তর ভারতের অধিকাংশকে এক শাসনে আনতে সক্ষম হন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য স্বেচ্ছা অবসর নিলে সিংহাসনে আরোহণ করেন তাঁর পুত্র বিন্দুসার, এবং তারপর উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতায় আসীন হন সম্রাট অশোক। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, সম্রাট অশোকের কাঁধে ছিল এক বিশাল সাম্রাজ্য শাসনের গুরুদায়িত্ব। সেই সাম্রাজ্যকে বহিঃশক্তির আক্রমণ থেকে করা এবং প্রজাদেরকে সন্তুষ্ট ও অনুগত রাখা একদমই সহজ কোন কাজ ছিল না।

যদিও সম্রাট অশোক ছিলেন ভারতবর্ষের অধিকাংশেরই অধিপতি, কলিঙ্গ (বর্তমান কোলকাতা ও মাদ্রাসের মধ্যস্থিত) অঞ্চলের মানুষকে তিনি নিজের শাসনের অধীনে আনতে পারেননি। তারা সম্রাটের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, আর সেই প্রতিরোধ এক পর্যায়ে গড়ায় এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। কিন্তু তখনকার দিনে সম্রাট অশোকের সৈন্যদলের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে যুদ্ধ করার মত বোকামি আর কিছুই ছিল না। ফলে যা হবার তা-ই হয়েছিল। কলিঙ্গের যুদ্ধে অশোকের সৈন্যরা লক্ষাধিক কলিঙ্গ সৈন্যদেরই শুধু নির্মমভাবে হত্যা করেনি, বাস্তুচ্যুত করেছিল প্রায় দেড় লক্ষ সাধারণ মানুষকেও।

যুদ্ধে সম্রাট কলিঙ্গেরই জয় হয়েছিল বটে, এবং এর ফলে তার সাম্রাজ্যের আকারও পূর্বসূরীদের থেকে অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছিল, কিন্তু এর ফলে যে বিশাল সংখ্যক মানুষকে প্রাণ হারাতে হয়, তা গভীর ছাপ ফেলেছিল সম্রাট অশোকের মনে। যুদ্ধের ভয়াবহতায় এক কথায় যেন শিউরে উঠেছিলেন তিনি। এবং তখনই তাঁর মধ্যে এই অনুধাবনের সৃষ্টি হয় যে যুদ্ধ-বিগ্রহ করে হয়ত রাজ্য জয় করা যায়, কিন্তু মানুষের মন জয় করা যায় না। তখন তাঁর মনোজগতে এক বিশাল পরিবর্তন আসে, এবং তিনি প্রতিজ্ঞা করেন ভবিষ্যতে আর কখনোই কোন প্রকার যুদ্ধ-বিগ্রহ বা নৃশংসতার সাথে নিজের নাম জড়াবেন না। কিন্তু শুধু এ কথা বললেই তো আর হবে না! তিনি হয়ত যুদ্ধ-বিগ্রহে জড়াতে চান না, কিন্তু শত্রুপক্ষের মনোবাঞ্ছা তো ভিন্নতরও হতে পারে। তাহলে তাদের হাত থেকে নিজের সাম্রাজ্যকে কীভাবে রক্ষা করবেন তিনি?

এই ‘কীভাবে’র উত্তর দেয়ার আগে ভিন্ন একটি প্রসঙ্গের উল্লেখ না করলেই নয়। সেটি হলো সম্রাট অশোকের বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ। তাঁর মনোজগতে যে বিশাল পরিবর্তন এসেছিল, সেটির পেছনেও বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে বলে অনুমান করা হয়। কেননা এ ধর্মের মূল কথাই যে, ‘অহিংসা পরম ধর্ম’! তাই সম্রাট অশোক শুধু নিজে এ ধর্মের দীক্ষা নিয়েই ক্ষান্ত হননি, পাশাপাশি এ ধর্মের বাণী গোটা ভারতবর্ষ জুড়ে ছড়িয়ে দেয়ারও উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি। ধারণা করা হয় যে তাঁর প্রত্যক্ষ মদত ও পৃষ্ঠপোষকতায়ই বৌদ্ধ ধর্ম ভারতবর্ষের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা, মালয়েশিয়া, এমনকি নেপাল, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া ও চীনের মত দেশসমূহেও।

যাই হোক, এবার ফিরে আসি আগের প্রসঙ্গে। সম্রাট অশোক অনুভব করেছিলেন যে, যুদ্ধ-বিগ্রহ কেবল তবেই এড়ানো যাবে, যদি কিনা বিদ্রোহীদেরকেও নিজের দলে টেনে আনা যায়। আর তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল, যদি কখনও যুদ্ধ-বিগ্রহ বেঁধে যায়ই, সেক্ষেত্রে বুদ্ধিমত্তা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অপপ্রয়োগ ঘটতে পারে। এবং তিনি এই সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন যে আর কোনদিন যুদ্ধ-বিগ্রহ ও নৃশংসতায় লিপ্ত হবেন না। তাহলে কীভাবে তিনি সফলভাবে রাজ্য পরিচালনা করবেন? এই ‘কীভাবে’র প্রশ্ন খুঁজতে গিয়েই তাঁর মাথায় আসে একটি গুপ্ত সংগঠন গড়ে তোলার প্রাথমিক ধারণা।

সম্রাট অশোক জানতেন, তিনি চাইলেও মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না, আর তার ফলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্মেষকেও কোনভাবেই আটকানো যাবে না। তাই তিনি চিন্তা করে দেখলেন, এমন একটি গুপ্ত সংগঠন গড়ে তুললে কেমন হয়, যেখানে থাকবে রাজ্যের সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও করিৎকর্মা ব্যক্তিগুলো, এবং যারা প্রতিনিয়ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা করে নতুন অনেক কিছুর উদ্ভাবন করলেও, সেগুলো সাধারণ মানুষের লোকচক্ষুর অন্তরালেই থাকবে! অর্থাৎ জ্ঞান-বিজ্ঞানকে একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই গোড়াপত্তন হয় নয় রহস্যময় নামক গুপ্ত সংগঠনটির।

আধুনিক যুগে, ১৯২৩ সালেই বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পারে নয় রহস্যময়ের অস্তিত্ব সম্পর্কে। এবং তা সম্ভব হয়েছিল টালবট মান্ডি নামক এক ব্যক্তি রচিত The Nine Unknown বইটি থেকে। মান্ডি ছিলেন ২৫ বছর ধরে ভারতে কর্মরত ব্রিটিশ পুলিশ বাহিনীর একজন সদস্য। তিনি তাঁর বইতে উল্লেখ করেন যে, সম্রাট অশোক তাঁর সাম্রাজ্যের সকল জ্ঞানী ব্যক্তিকে এক জায়গায় জড়ো করেন, তারপর সেখান থেকে বেছে নেন সেরা নয় জ্ঞানীকে। আর এভাবেই গড়ে ওঠে নয় রহস্যময়।

নয় রহস্যময় নামক গুপ্ত সংগঠনটির সদস্য সংখ্যা সবসময়ই থাকত নয়জন, এবং তাদের প্রত্যেকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের একটি নির্দিষ্ট শাখার উপর কাজ করত। শুধু তা-ই নয়, এই গুপ্ত সংগঠনের জন্য নানা ভাষার সংমিশ্রণে একটি নতুন ভাষারও সৃষ্টি করা হয়েছিল, এবং সেই ভাষাতেই প্রত্যেক সদস্য স্ব স্ব বিষয়ের উপর একটি করে বই রচনা করেছিল, আর কয়েকদিন পর পর নতুন উদ্ভাবিত নানা তথ্যের সমন্বয়ে সেই বইগুলোকে হালনাগাদ করা হতো। এবং আজ অবধি তা চলে আসছে!

চলুন দেখে নিই কোন বইয়ের বিষয়বস্তু কী ছিল-

১। প্রথম বইতে আলোচনা করা হয়েছিল প্রোপাগান্ডার কলাকৌশল ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ সম্পর্কে। মান্ডির মতে, ‘বিজ্ঞানের সবচেয়ে ভয়ংকর শাখা হলো গণ-অভিমতকে নিয়ন্ত্রণ করা। কেননা এর সাহায্যে যে কারও পক্ষে সম্ভব সমগ্র বিশ্বকে নিজের মত করে শাসন করা।’

২। দ্বিতীয় বইতে আলোচনা করা হয়েছিল শারীরবিদ্যা সম্পর্কে, এবং ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছিল যে কীভাবে স্রেফ স্পর্শের মাধ্যমে একজন মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়া সম্ভব। নির্দিষ্ট কিছু স্নায়ুর কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ বা পরিবর্তন করে দেয়ার মাধ্যমে মানবহত্যার এই বিরল পন্থাকে বলা হতো ‘স্পর্শমৃত্যু’।

৩। তৃতীয় বইতে আলোচনা করা হয়েছিল অণুজীব বিজ্ঞান ও জৈব প্রযুক্তি নিয়ে।

৪। চতুর্থ বইতে আলোচনা করা হয়েছিল রসায়ন ও ধাতুর রূপান্তর বিষয়ে। এক কিংবদন্তী মতে, ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন ভয়াবহ রকমের খরা দেখা দিয়েছিল, তখন মন্দির ও ধর্মীয় ত্রান কার্যক্রমের সাথে জড়িত সংগঠনগুলো কোন এক গোপন উৎস থেকে বিপুল পরিমাণে সোনা পেয়েছিল।

৫। পঞ্চম বইতে টেরেস্ট্রিয়াল কিংবা এক্সট্রা-টেরেস্ট্রিয়াল, যোগাযোগের সব ধরণের উপায় সম্পর্কে বিশদ বিবরণ দেয়া ছিল। এ থেকে ধারণা করা হয়, নয় রহস্যময়রা এলিয়েন তথা ভিনগ্রহবাসীর অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবগত ছিল।

৬/ ষষ্ঠ বইতে আলোচনা করা হয়েছিল অভিকর্ষ বলের গোপন রহস্য নিয়ে, এবং প্রাচীন বৈদিক বিমান তৈরীর নিয়মকানুন সম্পর্কে।

৭। সপ্তম বইতে আলোচনা করা হয়েছিল সৃষ্টিরহস্য ও মহাজাগতিক নানা বিষয়-আশয় নিয়ে।

৮। অষ্টম বইতে আলোচনা করা হয়েছিল আলোর গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে, এবং কীভাবে এটিকে ব্যবহার করা যায় একটি কার্যকরী অস্ত্র হিসেবে।

৯। নবম বইটির বিষয়বস্তু ছিল সমাজবিজ্ঞান। এতে আলোচনা করা হয়েছিল কীভাবে সমাজের ক্রমবিকাশ ঘটে, এবং কীভাবেই বা এটি ক্রমান্বয়ে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।

যেমনটি আগেই বলেছিলাম, সবসময়ই নয় রহস্যময়ের সদস্য সংখ্যা নয়। কোন একজনের মৃত্যু ঘটলে তার জায়গা নেয় নতুন আরেকজন। এভাবে আজীবন এই নয় রহস্যময়ের সদস্য সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকবে, এবং এই নয়জনের বাইরে তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে কখনোই আর খুব বেশি মানুষ অবগত ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবেও না।

যদিও কারা এই গুপ্ত সংগঠনের সদস্য সে সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলার কোন উপায় নেই, তারপরও যুগ যুগ ধরে এর অতীত ও বর্তমান সদস্যদের ব্যাপারে নানা গুজব প্রচলিত রয়েছে। ধারণা করা হয়, নয় রহস্যময়রা বর্তমানে সমগ্র বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে, এবং তাদের মধ্যে অনেকেই বিশ্ব রাজনীতির খুবই উঁচু পদে আসীন রয়েছে।

নয় রহস্যময়ের সম্ভাব্য সদস্য হিসেবে এখন পর্যন্ত যাদের নাম উঠে এসেছে, তাদের মধ্যে দশক শতকের প্রভাবশালী পোপ দ্বিতীয় সিলভাস্টার ও উপমহাদেশে রকেট বিজ্ঞানের জনক বিক্রম সারাভাই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

প্রাচীন বিশ্ব ইতিহাস ঘাঁটতে গিয়ে আমরা যুগ যুগ ধরে দেখে এসেছি, নিজস্ব জ্ঞানকে কুক্ষীগত করে রাখাই হলো গুপ্ত সংগঠনগুলোর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। এমনটি আমরা শুধু ইলুমিনাতির ক্ষেত্রেই দেখিনি, দেখেছি প্রাচীন মিশরীয়, তিব্বতীয় মংক, মায়ান পুরোহিত, মুক্ত ম্যাসন, রোসিক্রুসিয়ান ও আরও অনেকের ক্ষেত্রেই। তারা তাদের অর্জিত জ্ঞান অন্য কারও সামনে প্রকাশ করত না বলেই হয়ে উঠেছিল অদম্য শক্তির অধিকারী। এবং ঠিক তেমনটিই আমরা দেখতে পাই নয় রহস্যময়ের ক্ষেত্রেও। এখন তাদের কী অবস্থা সে সম্পর্কে আমরা হয়ত অবগত নই, কিন্তু এটুকু আন্দাজ করতেই পারি যে, যতই দিন যাচ্ছে, তাদের জ্ঞানের পরিধি ততই আকাশ ছুঁচ্ছে, এবং তারা ততই অপরাজেয় শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

তথ্যসূত্র- ancientexplorers.comwww.speakingtree.in

আরও পড়ুন-

Comments
Spread the love