তিনি দারুণ ক্রিকেটার ছিলেন। নিজের সময়ের সেরাদের সেরা একজন ছিলেন, সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডারের ছোট্ট তালিকা করলে সেখানেও তার জায়গা হয়ে যাবে অনায়াসে। পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে নিজের দেশের মানুষের মনে নায়কের আসন পেয়েছিলেন। এবার তিনি নির্বাচনে জিতছেন, তাও যেমন তেমন নির্বাচন নয়, জাতীয় নির্বাচনে জিতে পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসতে যাচ্ছে তার দল, তিনি হতে যাচ্ছেন পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী। তিনি ইমরান খান, ১৯৯২ সালের পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক, আর পাকিস্তানের হবু প্রধানমন্ত্রী।

খেলোয়াড়ি জীবনে ইমরান খানের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার ম্যাচ ফিক্সিঙের অভিযোগ উঠেছে, কিন্ত প্রমাণ হয়নি কোনটাই। ক্রিকেটে নিজের নিস্কলুষ ভাবমূর্তিটা মোটামুটি বজায় রাখতে পারলেও, ইমরান খান রাজনীতিতে এসে সেই পুরনো কাদাই গায়ে মাখলেন। গড়াপেটার একটা নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতায় আরোহন করছেন পাকিস্তানের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা এইএই ক্রিকেটার আর তার দল তেহরিক ই ইনসাফ। এখনও পর্যন্ত প্রাপ্ত ভোটের হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশ বড়সড় ব্যবধানে এগিয়ে আছে তেহরিক, সংবাদ সম্মেলন করে নিজেকে বিজয়ী দাবী করেছেন ইমরান। 

ইমরান খান, তেহরিক ই ইনসাফ, পাকিস্তান, নির্বাচন

প্রথমেই একটা ঘোষণা। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদে যিনিই নির্বাচিত হোন, তাতে আমাদের কিছুই আসে যায় না। এই দেশটায় নামকাওয়াস্তে গণতন্ত্র আছে, লোকদেখানো একটা ভোট হয় কয়েক বছর পরপর, মূলত দেশ চালায় সেনাবাহিনীই। সেখানে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান হলেন নাকি নওয়াজ শরীফ হলেন, তাতে নিয়ে আমাদের অন্তত মাথাব্যাথা হবার কথা নয়। তবে আমাদের দেশেরই পাকিস্তানপন্থী কিছু মানুষ আবার ইমরানের এই নির্বাচনী ‘বিজয়ে’ দারুণ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন দেখলাম, যেন ইমরান পাকিস্তান নয়, বাংলাদেশেরই প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছেন, অথবা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পর কোন এক গায়েবী শক্তির বদৌলতে ইমরান খান বুঝি বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট একশো আশি ডিগ্রিতে উল্টে দেবেন! এই লেখাটা বিশেষত তাদেরই জন্যে।

খেলোয়াড়ি জীবন থেকে অবসর নেয়ার পর রাজনীতির মাঠে ইমরানের আগমন ১৯৯৬ সালে। পাকিস্তান তেহরিক ই ইনসাফ নামের দলটার জন্মও তার হাতেই। খেলোয়াড় ইমরান খান যেমন দল-মত-ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটা পাকিস্তানীর কাছেই প্রিয় একজন মানুষ ছিলেন, রাজনীতিবিদ ইমরান খান সেরকম ইমেজ কখনও তৈরি করতে পারেননি। অবশ্য রাজনীতির ময়দানটাই এমন, কেউ পছন্দ করবে, কেউ করবে না। সবার প্রিয়য়াত্র হওয়াটা এখানে প্রায় অসম্ভব।

আরও পড়ুন-  বিশাল কারাগারের এক নিঃসঙ্গ কয়েদী 

তবে ইমরান সমালোচনা কুড়িয়েছেন ধর্মীয় গোঁড়ামী আর মৌলবাদকে আঁকড়ে ধরে রাজনীতি করায়। ব্যক্তিজীবনে পশ্চিমা আদর্শ আর ভাবধারায় বিশ্বাসী ইমরান খান রাজনীতিতে এসে হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, পাকিস্তানের মতো দেশে আধুনিকতা আঁকড়ে ধরে রাখলে পস্তাতে হবে। সেজন্যেই হয়তো বেছে নিয়েছিলেন ধর্মীয় গোঁড়ামী আর মৌলবাদকে সমর্থনের রাস্তাটা। স্বৈরশাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফকে সমর্থন দিয়েও দুয়ো কুড়িয়েছিলেন। তবে সেসব সমালোচনা বা দুয়ো গায়ে কখনও মাখেননি ইমরান। এইসব তেলবাজীকে তিনি ওপরে ওঠার সিঁড়ি হিসেবেই দেখেছেন সবসময়। 

ইমরান খান, তেহরিক ই ইনসাফ, পাকিস্তান, নির্বাচন

রাজনীতিবিদ ইমরান প্রথমবার ভালোভাবে আলোচনায় আসেন ২০১১ সালে। লাহোরে প্রায় এক লক্ষেরও বেশি সমর্থককে নিয়ে জমায়েত হয়েছিলেন তিনি, সরকারের ‘দুর্নীতি’ আর ‘দুঃশাসনে’র বিরুদ্ধে জানিয়েছিলেন প্রতিবাদ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা তখনই নড়েচড়ে বসেছিলেন। এরমধ্যে ইমরান খান জেল খেটেছেন, মোশাররফের শাসনামলের শেষে গণতান্ত্রিক সরকার আসার পর নিয়মিত সমালোচনায় মুখর হয়েছেন সরকারের। তখন থেকেই তার ওপর নজর রেখেছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। তাদের পরবর্তী পুতুল শাসক হিসেবে ইমরানকে বাছাইয়ের কাজটা শুরু হয়ে গিয়েছিল তখন থেকেই।

২০১৩ সালের নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত ভালো ফল করেছিল ইমরানের তেহরিক। জারদারী’র পিপিপি’র ওপর বিরক্ত আর ক্ষুব্ধ পাকিস্তানের মানুষ সমানে ভোট দিয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে, সেটা নওয়াজের মুসলীম লীগ, নাকি ইমরানের তেহরিক, এতকিছু বিবেচনা করেনি অনেক মানুষই। মুসলিম লীগ নির্বাচনে জিতলো, নওয়াজ হলের প্রধানমন্ত্রী, আর বিরোধীদলীয় নেতা হলেন ইমরান। তালেবান আর কট্টরপন্থী ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা বহুদিনের, তাদের ঘাড়ে চড়েই রাজনীতির ময়দানে চষে বেড়িয়েছেন ইমরান খান, এখনও চড়ছেন, ভবিষ্যতেও এই ধারা বদলানোর কোন সম্ভাবনা নেই।

আরও পড়ুন- নয়টা-পাঁচটা চাকরি? উঁহু, সম্ভব না! 

এরপর এলো ২০১৮ সাল। মেয়াদ পূর্ণ হবার আগেই পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারির জের ধরে নওয়াজ ক্ষমতাচ্যুত হলেন, সেনাবাহিনীর আস্থাও ইতিমধ্যে হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। পাকিস্তান আর্মি ততদিনে ইমরান খান নামের নতুন এক পাপেট পেয়ে গেছে। নওয়াজের বিরুদ্ধে মামলা হলো, তাকে যেতে হলো জেলে। নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে গেলেন ইমরান, অনেকটা ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার মতো ব্যাপার।

পশ্চিমা রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বারবার অভিযোগের আঙুল তুলেছেন ইমরানের দিকে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মদদপুষ্ট হয়ে এই নির্বাচনে লড়ছেন তিনি, আর পেছনে আর্মি থাকলে পাকিস্তানে কেউ ইলেকশনে হারে না। ইমরানও হারেননি। অন্য দলগুলোর নির্বাচনী প্রচারণায় হাজার রকমের বাধার চেষ্টা করা হয়েছে, নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করা হয়েছে সমানে। কিন্ত ইমরানের দলে ফুলের টোকাও পড়েনি। নৈতিকতার তো বালাই নেই সেখানে, আর তাই ইমরান খান এখন পাকিস্তানের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী! 

ইমরান খান, তেহরিক ই ইনসাফ, পাকিস্তান, নির্বাচন

যুক্তরাষ্ট্র আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা গিয়েছিলেন পাকিস্তানের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে। সেখানে গিয়ে খুব একটা স্বস্তিকর আবহাওয়া দেখতে পাননি তারা কেউই। পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হওয়া স্বত্বেও আমেরিকা এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু আর অবাধ ঘোষণা দিতে রাজী নয় এখনই! প্রতিনিধিদলের পাঠানো রিপোর্ট সন্তোষজনক নয় হয়তোবা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বলেছে, বেশকিছু কেন্দ্রে তাদের সামনেই সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, মোতায়েন করা সেনাদের ভূমিকাও অনেক জায়গায় প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। তবে তারা পুরো নির্বাচনের অফিসিয়াল ফলাফল পেলেই তাদের মত জানাবে বলেছে।

নির্বাচনের ফল প্রকাশেও অজস্র নাটক মঞ্চস্থ করা হচ্ছে। গতপরশু রাত সাড়ে দশটা পর্যন্ত ২৭২ এর মধ্যে ১৯৪টা আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছিল। এরমধ্যে তেহরিক ই ইনসাফ জিতেছিল ৯৮ আসনে। নওয়াজ শরীফের মুসলিম লীগের জয় ৪৯ আসনে। কিন্ত এরপর আর কোন আসনের ফল ঘোষণা করা হয়নি। বিলম্বের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে প্রযুক্তিগত সমস্যার কথা। কিন্ত পিপিপি আর পিএমএল এর অভিযোগ, ভেতরে ভেতরে নির্বাচনের ফল সাজানো হচ্ছে সেনাবাহিনীর পছন্দ অনুযায়ী!

শেষমেশ ঘোষিত ফলাফলে মোট ২৭০ আসনের মধ্যে ২৬১টির ফল প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে ১১৫ টি আসনে জিতে সবার ওপরে অবস্থান তেহরিক ই ইনসাফের। এককভাবে সরকার গড়তে ১৩৭টা আসনের প্রয়োজন, এখন ছোট দলগুলোর সঙ্গে জোট গড়া ছাড়া ইমরানের হাতে আর বিকল্প নেই। এই যে তেহরিকের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া, সেটার পেছনেও সেনাবাহিনীর ভূমিকা দেখছেন অনেকেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গড়লে ইমরান স্বাধীনচেতা হতে চাইতেন, হয়তো সেনাবাহিনীর একচ্ছত্র আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জও জানাতেন কোন একটা সময়ে। সেই সুযোগটা ইমরান খানকে দিলো না পাকিস্তান আর্মি। তারা ইমরানকে প্রধানমন্ত্রী বানালো ঠিকই, তবে সেটা নিধিরাম সর্দার টাইপের প্রধানমন্ত্রী। ভবিষ্যতে কিছু হলেই যাতে ইমরানের চেয়ার ধরে টান দেয়া যায়, সেই ব্যবস্থা সেনাবাহিনী করে রেখেছে ভালোভাবেই।

ইমরান খান, তেহরিক ই ইনসাফ, পাকিস্তান, নির্বাচন

খেলোয়াড়ি জীবনে ইমরান খান ম্যাচ ফিক্সিং করেছিলেন কিনা, সেটা প্রমাণ হয়নি কখনও। তবে ফিক্সিং করা এক নির্বাচনের মধ্য দিয়েই তিনি পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসছেন, পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। সেটা সেনাবাহিনীর ঘাড়ে চড়েই হোক আর তাদের মনোনীত পুতুল সরকারের প্রধান হিসেবেই হোক। পাকিস্তানের সবচেয়ে বোকা মানুষটাও জানে, সেনাবাহিনী এভাবে পেছন থেকে না ঠেললে ইমরান বা তার দলের পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসা হতো না কখনোই। কিন্ত প্রশ্ন হচ্ছে, তার বিজয়ে কিছু বাংলাদেশীর এমন উচ্ছ্বাস কেন? ইমরান খান একসময় বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন বলে? একাত্তরের ঘাতক রাজাকারদের মুক্তি চেয়েছিলেন বলে? একারণেই কি সেসব রাজাকারদের সমর্থকেরা এরদোয়ানের পর ইমরান খানকে এবার নতুন ত্রাতা হিসেবে ভেবে বসে আছে?

পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যে লোক রাজনৈতিক আঁতাত রাখে, বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে যে মানুষ অযথা নাক গলায়, সাম্প্রদায়িক আর জঙ্গী মনোভাবের কারণে যাকে তার নিজের দেশের লোকজনই ‘তালেবান খান’ নামে ডাকে, সেই লোক পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেন না আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলেন, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। তার জন্যে একরাশ ঘৃণাই বরাদ্দ শুধু। 

আরও পড়ুন- প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া এই দেশে অপরাধ, ঘুষ খাওয়া কখনোই নয়! 

আরও পড়ুন- ক্রোয়েশিয়ান প্রেসিডেন্ট ও আমাদের ‘সেক্সিস্ট’ মানসিকতা 

আরও পড়ুন- কর্মজীবী মায়ের সন্তানেরাই জীবনে সুখী ও সফল হয় বেশি!

Comments
Spread the love