– কেমন আছেন?
– টিনের চালের ফুডার মতো।

– বুঝিনি। একটু বুঝিয়ে বলেন। 
– গরীবের টিনের চালে কত ফুডা থাকে! বৃষ্টির সিজনে প্রবলেম। একটা বন্ধ করলে আরেকটা দিয়ে পানি পড়ে। আমার হইসে ওই দশা। ভালো থাকার টাইম পাই না। ফুডা বন্ধ করতেই করতেই জীবন চলে যায়!

– তবুও দেখি আপনি হাসেন। কীভাবে সম্ভব?
– কারন, যে ছিদ্র দিয়ে বৃষ্টি পড়বে, ঐ ছিদ্র দিয়ে তো আকাশও দেখা যায়!

– তাই তো। এভাবে তো ভাবিনি।
– শহরের মানুষ আপনারা। ভাবা তো আপনাদের কাজ না। ভোগ করা আপনাদের কাজ।

– তাহলে আপনার কাজ কি?
– আমাদের কাজ ঠেকায় পড়া।

– কীভাবে ঠেকায় পড়েন?
– ফসল চাষ করি। এর চেয়ে বড় ঠেকা আর কী আছে!

– এটা তো খুবই ভালো কাজ। আপনারাই তো দেশের অর্থনীতি। আমরা গর্ব করি কৃষকদের নিয়ে।
– হুম। আবার গালিও দেন চাষার বাচ্চা খ্যাত বলে। আর ভাইসাব আরেকটা কি যেন বললেন বুঝি নাই।

– বললাম দেশের অর্থনীতির খুঁটি তো আপনারাই।
– ও আচ্ছা। এই জন্যে বোধহয় আমার মতো কৃষকদের নিজেদের খুঁটির গোঁড়ায় মাটি নাই।

– এত সুবিধা পান, তারপরও যদি এই কথা বলেন! ১০ টাকায় ব্যাংক একাউন্ট, কম দামে সার…
– থামেন ভাই। ব্যাংক একাউন্টে যদি টাকাই না রাখবার পারি তাহলে একাউন্ট দিয়া করবো কি আমরা?

– টাকা কি পান না? আপনাদের এই এক সমস্যা। যত পাবেন তত গলা শুকাবেন।
– হুম খুব পাই। এক কেজি মূলা বেঁচতে হয় ১ টাকা কেজি। একটা ফুলকপি বিক্রি করতে হয় ৩ টাকা। যেখানে আপনারা বড়লোকেরা দুই মিনিট কথা বললেও ফোনে এর চেয়ে বেশি টাকা কাটে। যেখানে এক কাপ চা রাস্তায় দাঁড়িয়ে খেলেও এর চেয়ে বেশি খরচ হয়। আর আমার তো মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। আপনাদের দেয়া “কম দামের সার” আর রোদের পর রোদ, বৃষ্টির পর বৃষ্টি উপেক্ষা করেও মাঠে থাকতে হয়। কাঁচাবাজারে নগদ টাকা দিয়ে যে সবজিটা কিনে আনেন ওটা নগদে জন্মায় না ভাই। অনেক খুচরা শ্রম দিতে হয়। এই জন্য আমার পুরষ্কার হচ্ছে এক টাকা কেজি ধরে বিক্রি করে করে নগদ টাকা গুনে ১০ টাকার একাউন্টে জমানো, তাই না?

– দুঃখিত দুঃখিত। আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। ন্যায্য মূল্য না পেলে বিক্রি করবেন না। তাহলেই তো হয়!
– ওই যে বললাম ঠেকায় পড়সি। “মহাজনে যতন করে সুদ ধরাইসে টাংকি ভরে” – অনেক ঋণ। অন্যের জমিতে ফসল ফলাই। তার খাজনা। আড়তদারের চাপ। দামে না হলে অন্য কারো কাছ থেকে মাল নেবে। আমারটা নেবে না। তারপর কাঁচা সবজি সময়মতো বিক্রি না হলে কেউ কিনে না। পচে যায়। তাতে তো আম-ছালা দুইটাই যাবে আমার। এই জন্য আমি কষ্ট করে পচি, আপনারা শহরের লোক আরাম করে টাটকা খান। এটাই ঠিক আছে।

– বলেন কি ! এই অবস্থা তাহলে। কই কেউ তো কিছু বলে না।
– খেটে খাওয়া আর খাটে যাওয়া মানুষদের নিয়ে কেউ কথা বলবে না। কারণ, যে বলবে সে নিজেই তো তার বিবেকের কাছে ধরা।

– রাইট। একদম ঠিক বলেছেন। আচ্ছা আপনাদের মন খারাপ হয় না? দুঃখে কাঁদতে ইচ্ছা হয় না?
– আমাদের তো অইডা নাই। কী যেন বলে না? মনে পড়ছে, ফেসবুক! মন খারাপ, দুঃখ এগুলা করতেও টাকা লাগে, একাউন্ট লাগে।

– আপনার তো পরিবার নিয়ে চলতে অসুবিধা হয় তাহলে অনেক। তাই না?
– নাহ কিসের কষ্ট? দুই পোলা। আমার সাথে ক্ষেতে কাজ করে। ফাঁকে একটু পড়াশুনা করে। চাষার পুত তো। দাবি দাওয়া কম। দামি মোবাইল চায় না, প্রাইভেট মাস্টার চায় না। ঘুরতে যাইতে চায় না। তাদের কোনো কষ্ট নাই। তারা রঙ তামাশা কম বুঝে। কাজ বুঝে বেশি। শুধু যেদিন ফসল তুলি ঘরে ওইদিন সবার মুখে একটু হাসি দেখি। ওই হাসি কেউ কিনতে পারবে না। আমার সম্পদ বলতে গেলে তাদের ওই হাসি।

ঢাকায় কত কিছু রপ্তানি করেন আপনারা। জানেন শুধু এই হাসিটাই নেই শহরে। কেউ হাসলেইমনে হয় ঠকানোর ধান্ধা। আপনাদের এইসব দুঃখের দিনগুলো কবে বদলাবে, আমার জানা নাই। কে ভাববে আপনাদের নিয়ে, জানি না। কিন্তু আপনাকে একটা কথা বলে যেতে চাই, আপনি একজন শিক্ষক, সম্ভবত সব কৃষকের মধ্যেই একজন শিক্ষক সত্ত্বা আছে। যে ভাবে, যে ভাবায়। বাদ বাকিরা শুধু ভোগ করে যায়…ভালো থাকবেন স্যার।

– আচ্ছা তাহলে বিদায়। আজ আমার টিনের ফাঁকে আকাশ দেখার দিন।

_

সাক্ষাৎকারটি কাল্পনিক। বাস্তবের কোনো ঘটনার সাথে এর কোনো মিল নেই। এদেশে কৃষক বড্ড আনন্দে আছে, সুখে আছে। তাদের বিন্দুমাত্র কষ্ট নেই। শুধু ফুডা বন্ধ করতেই করতেই জীবন চলে যায়, এই যা!

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো