ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে কি ইলিয়াস কাঞ্চনকে থামানো যাবে?

পরিবহন শ্রমিক আর মালিকদের কাছে ‘ইলিয়াস কাঞ্চন’ নামটা চক্ষুশূল হয়ে আছে অনেক বছর ধরেই। বিভিন্ন সময়ে তাকে হেনস্থা করার চেষ্টা করেছে এসব সংস্থার লোকজন। রাজপথে তার কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছে, তার ছবি পোড়ানো হয়েছে। পরিবহন শ্রমিকদের বিভিন্ন সমাবেশ থেকে তার ওপরে হামলা চালানোর উস্কানিও দেয়া হয়েছিল নানা সময়ে, এমনকি তার গাড়িতে ধাক্কা দিয়ে তাকে প্রচ্ছন্ন হুমকিও দেয়া হয়েছে। ইলিয়াস কাঞ্চনের ‘অপরাধ’ একটাই, তিনি পরিবহন শ্রমিক আইনের সংশোধন চেয়েছেন, নিরাপদ সড়কের দাবীতে রাস্তায় নেমেছেন, চালক-যাত্রী-পথচারী সবাইকে সচেতন করার চেষ্টা করেছেন। সেই অপরাধেই এবার ইলিয়াস কাঞ্চনকে দেশের সব বাস-ট্রাক টার্মিনালে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ।

তবে পরিবহন শ্রমিকদের এই নিষেধাজ্ঞায় খুব একটা বিচলিত নন ইলিয়াস কাঞ্চন। তাঁর মতে, পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতাদের এমন হুমকিতে তেমন কিছুই হবে না, তবে বাস টার্মিনালে চালক ও সহযোগীদের জন্য যে সচেতনতার কাজ করতেন, সেটা কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ইলিয়াস কাঞ্চন বলছিলেন-

“আমরা তো চালক ও সহযোগীদের প্রশিক্ষণ দিই। আইনকানুন সম্পর্কে সচেতন করি। যাঁরা গাড়ি চালাতে জানেন, কিন্তু নিয়ম মানতে চান না, আবার কেউবা সড়কের সংকেতগুলো সেভাবে জানেন না, গতি সম্পর্কেও অবহিত করি তাদের, কিন্ত মালিক-শ্রমিক নেতাদের এরকম কথার কারণে এখন এই কর্মসূচি পালনে বাধা আসতে পারে।”

এই অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার ব্যপারটাকে হুমকি হিসেবেই নিচ্ছেন ইলিয়াস কাঞ্চন। সংবাদমাধ্যমকে তিনি জানিয়েছেন- “এটা হুমকি। এই ধরনের হুমকি তো নতুন কিছু না। ২০১২ সালেও এমন অনেক হুমকি পেয়েছি। সে সময় তো শহীদ মিনারে সমাবেশ ডেকে আমার ছবির মধ্যে জুতার মালা পরানো হয়েছিল। একটা কথা এত দিন বলিনি, কিন্তু এসব ঘটনা দেখে বলতে বাধ্য হচ্ছি। স্কুলের ছোট বাচ্চারা যখন আন্দোলন করছিল, তখন খুলনা ও ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে আমার ছবি পোড়ানো হয়েছে।”

তবে এসব চিন্তা করে পিছিয়ে যাচ্ছেন না ইলিয়াস কাঞ্চন। এত বছর ধরে যে কাজটা একটানা করে এসেছেন, তাতেও ছেদ পড়তে দিচ্ছেন না তিনি। হুমকি বা নিষেধাজ্ঞা যাই আসুক, তিনি তার কাজ চালিয়ে যাবেন। ইলিয়াস কাঞ্চন জানিয়েছেন,

“চালকদের যেভাবে বলা দরকার, পথচারী ও সাধারণ যাত্রীদের যেভাবে সচেতন করার দরকার, সেই কাজ আমরা চালিয়ে যাবই। আমি মনে করি, তাঁরা যে ভুল বুঝেছেন, সেখান থেকে একদিন অবশ্যই বেরিয়ে আসবেন। আরেকটা বিষয়, আমাদের দেশে কিন্তু অদক্ষ চালকদের মধ্যে শুধু বাস আর ট্রাকের না, অযান্ত্রিক যানবাহন, ব্যাটারি বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা, মোটরসাইকেলের চালকদের অনেকেই কিন্তু আইন মানেন না। এমনকি কেউ তো শেখেও না।” 

“আমি কর্মসূচি অবশ্যই চালিয়ে যাব। এমন হুমকিতে তো বন্ধ করে দিতে পারি না। দেশের মানুষকে সচেতন করার এই কাজ আমি করছি ২৫ বছর ধরে। এই কাজে আমার অর্থ, জ্ঞান, সময় ও পরিশ্রম, সবকিছুই দিয়েছি, চেয়েছি শুধু সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সবাইকে সচেতন করতে এবং সবাইকে সড়কের আইন মানায় শ্রদ্ধাশীল হতে। কয়েকজন মানুষও যদি আমার কথা শুনতে না চায়, আমি কী করতে পারি। আমি বিশ্বাস করি, একসময় সবার ভুল ভাঙবেই। তখন হয়তো তারা শুনবে।”

১৯৯৩ সালে মর্মান্তিক এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই নিরাপদ সড়ক আন্দোলন নিয়ে কাজ করছেন একসময়ের বাংলা চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন। মূলত স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রাঙ্গন থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন তিনি, তার পরিবর্তে সবটুকু মনযোগ ঢেলে দেন নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কাজে। সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে গড়ে তোলেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ নামের একটি সংগঠন। এ সংগঠনের ব্যানারে গত পঁচিশ বছর ধরেই দেশজুড়ে সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন এবং জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করে আসছেন তিনি।

ইলিয়াস কাঞ্চন বরাবরই বলে এসেছেন, সড়ক দুর্ঘটনাকে শুধু দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার কিছু নেই। কখনও কখনও এটা হত্যাকাণ্ডও হয়ে দাঁড়ায়। সড়ক দুর্ঘটনা শুধু চালকের দোষে ঘটে না, এটাও বারবার বলেছেন তিনি। এজন্যেই তিনি চালকদের যেমন সতর্ক করেছেন, তেমনই সতর্ক হতে বলেছেন যাত্রী আর পথচারীদেরও। চালকের লাইসেন্স থাকাটা যেমন দরকার, তেমনই যাত্রী বা পথচারীর সচেতনতাও সমান জরুরী। কিন্ত এই কাজগুলো করতে গিয়েই তিনি শত্রু হয়েছেন পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের, তারা তাকে নিজেদের স্বেচ্ছাচারীতার পথে কাঁটা হিসেবেই দেখেছে সবসময়। কে জানে, সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা হয়তো সড়কে নির্ঝঞ্ঝাটে মানুষ মারার অধিকার চায়, এজন্যেই ইলিয়াস কাঞ্চন নামটা তাদের কাছে বিষফোঁড়া! 

কিছুদিন আগে সারাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবীতে আন্দোলন করলো কলেজপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরা। সরকারও তাদের দাবী আংশিক মেনে নিয়ে পরিবহন আইনে খানিকটা পরিবর্তন এনে সড়ক দুর্ঘটনায় দোষী চালকের সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড করেছেন, যেটা আগে সর্বোচ্চ তিন বছর ছিল। সেই সময়ে সেভাবে প্রতিক্রিয়া না জানালেও, এখন এই আইন পরিবর্তনের দাবীতে আবার জোট পাকাচ্ছে সংগঠনগুলো। আইন পরিবর্তন করা না হলে লাগাদার পরিবহন ধর্মঘটের হুমকিও দেয়া হয়েছে। আর তারাই এখন দেশের সব বাস-ট্রাক স্ট্যান্ডে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে ইলিয়াস কাঞ্চনকে, এর মধ্যে দিয়ে যেন সড়ক আইন সংশোধনের শোধই তোলার চেষ্টা করছে তারা! কিন্ত এসব করে কি তাকে দমানো যাবে? গত পঁচিশ বছর ধরে তো কেউ থামাতে পারেনি তাকে!

যে মানুষটা নিজের সব কাজকর্ম শিকেয় তুলে বছরের পর বছর ধরে লেগে আছেন সড়ককে নিরাপদ করে গড়ে তুলতে, যে মানুষটা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে যাচ্ছেন, নিজের খরচে কর্মশালার আয়োজন করছেন চালক আর যাত্রীদের সচেতন করার জন্যে, তার বিরুদ্ধেই প্রতিহিংসামূলকভাবে অদ্ভুত সব নিষেধাজ্ঞা দেয়া হচ্ছে, তাকে কাজ করতে দেয়া হচ্ছে না। কে জানে, এদেশে ভালো কাজ করাটাই বোধহয় অপরাধ। ইলিয়াস কাঞ্চন সেই অপরাধ করেই দোষী হয়েছেন! 

আরও পড়ুন- 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close