ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

ইলিয়াস কাঞ্চন- বাস্তবের মহানায়ক

বড় পর্দায় নায়কদের বীরোচিত কর্মকান্ডের সাথে আমরা সকলেই কমবেশি পরিচিত। আবার পর্দার নায়কেরাই যে অনেক সময় বাস্তবের খলনায়ক বনে যান, সেটিও আমাদের অজানা নয়। তবে বাস্তবে খলনায়ক না হলেও, সিনেমায় নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করাদের মধ্যে ক’জনই বা পারেন বাস্তবেও সত্যিকারের নায়ক হয়ে উঠতে? সে সংখ্যা নিতান্তই হাতেগোনা। কিন্তু সেই হাতেগোনা কয়েকজনের মধ্যে একজন, এবং সম্ভবত বাংলাদেশী চলচ্চিত্র ইতিহাসের উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত হলেন ইলিয়াস কাঞ্চন।

১৯৯৩ সালের কথা। মাত্র বছর চারেক আগেই মুক্তি পেয়েছিল তার অভিনীত, তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত ছবি ‘বেদের মেয়ে জোসনা’, যেটি এখন পর্যন্ত সর্বকালের সবচেয়ে বেশি আয় করা বাংলাদেশী চলচ্চিত্র। আর এই একটি ছবিই ইতিমধ্যেই তারকাখ্যাতি পেয়ে যাওয়া ইলিয়াস কাঞ্চনকে নিয়ে গিয়েছিল বাদবাকি সকলের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সবমিলিয়ে তাঁর বৃহস্পতি সে-সময় ছিল তুঙ্গে। তাই তিনি নিজেও হয়ত ভাবতে পারেননি, ক্যারিয়ারের মধ্যগগণে থাকা অবস্থাতেই ব্যক্তিজীবনে তাঁকে এত বড় একটি ধাক্কা খেতে হবে।

বান্দরবানে একটি ছবির শুটিংয়ে ব্যস্ত ছিলেন কাঞ্চন। তাঁর বউ-বাচ্চারা ছিলেন ঢাকায়। সেখান থেকে অক্টোবরের ২২ তারিখ বান্দরবানে কাঞ্চনের সাথে দেখা করার উদ্দেশে রওনা হন তাঁরা। পথিমধ্যে ঘটে যায় এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা। সেই দুর্ঘটনায় কাঞ্চনের বাচ্চারা বেঁচে গেলেও, প্রাণ হারান তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন। স্ত্রীর অকাল মৃত্যুতে প্রচন্ড মানসিক আঘাত পান কাঞ্চন। এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে ঠিকই করে ফেলেছিলেন, আর কোন ছবিতে অভিনয় করবেন না তিনি।

সেই সময়ে তাঁর পাশে এসে দাঁড়ান এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। তিনি কাঞ্চনকে বলেন, ‘দেখো কাঞ্চন, স্ত্রীকে বাঁচাতে না পারায় তুমি খুবই ভেঙে পড়েছ। তাই হয়ত তুমি এমন চিন্তা করছো। কিন্তু এটি তো কোন সমাধান হতে পারে না। হাজার হাজার ভক্তরা তোমাকে ভালোবাসে। এবং তাদের মধ্যে অনেকেও সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। যদি পারো তো তাদের জন্য কিছু করো।’

এই কথায় হুঁশ ফিরল কাঞ্চনের। তিনি বুঝতে পারলেন, ছেলেমানুষি করে নিজের জীবিকার উৎস যেই অভিনয়, সেটি থেকে সরে দাঁড়ানো মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাতে কেবল নিজেকেই কষ্ট দেয়া হবে। অন্যদিকে তাঁর স্ত্রীর যে নির্মম পরিণতি হয়েছে, সে-রকম পরিণতি বরণ করে নিতে হতে পারে তাঁর অনেক ভক্তকেও। সেটি যেন না হয়, সে ব্যবস্থা তাঁকেই নিতে হবে। এমন চিন্তা থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার।

কিন্তু সিদ্ধান্তটি যত সহজে তিনি নিয়েছিলেন, তাঁর বাস্তবায়ন ছিল ততটাই দুঃসাধ্য একটি কাজ। একে তো তিনি সময়ের ব্যস্ততম একজন অভিনেতা, যাকে বছরের সিংহভাগ সময়ই কাজে ডুবে থাকতে হয়, অনেক সময় ঢাকার বাইরেও থাকতে হয়। পাশাপাশি সদ্য মা-মরা ছেলেমেয়েদের দেখভালের দায়িত্বও অনেকটা তাঁর কাঁধেই বর্তেছিল। এই দ্বিমুখি ব্যস্ততার চাপ সামলে আন্দোলনের লক্ষ্যে বাড়তি সময় বের করা সহজ কোন কাজ ছিল না। তাই অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হন কাঞ্চন। তখন অনেক শুভাকাঙ্ক্ষীই কাঞ্চনকে বলেছিল, কী দরকার এইসব করার! যেমনভাবে সবকিছু চলছে তেমনভাবেই চলুক না! কাঞ্চনকেই কেন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে হবে! কিন্তু এইসব কথায় কান দেননি তিনি। আলিঙ্গন করে নিয়েছিলেন চ্যালেঞ্জকে।

তাঁর আয়োজিত প্রথম কর্মসূচি ছিল একটি মিছিল। ১৯৯৩ সালের ১ ডিসেম্বর বিএফডিসি থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব পর্যন্ত মিছিল করেন তিনি। সেই মিছিলে প্রচুর জনসমাগম হয়েছিল। তবে অধিকাংশ মানুষই যতটা না এসেছিলেন নিরাপদ সড়কের দাবি নিয়ে, তারচেয়েও বেশি নায়ক কাঞ্চনকে ভালোবেসে, পর্দার নায়ককে ক্রমশ বাস্তবেরও নায়ক হয়ে উঠতে দেখার মুগ্ধতা থেকে, এমন অভিনব ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকতে। এরপর থেকে যখনই কাঞ্চন কোন কর্মসূচির আয়োজন করেছেন, সাধারণ মানুষের অফুরান ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। সাধারণ মানুষই তাঁর জন্য যাতায়াতের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এমনকি খাবারের জন্যও তাঁকে চিন্তা করতে হয়নি। সাধারণ মানুষই জোগান দিয়েছেন সে-সবের। আরও এক শ্রেণীর মানুষ শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কাঞ্চনকে সবরকমের সমর্থন দিয়ে আসছেন। তাঁরা হলেন সাংবাদিকগোষ্ঠী। কাঞ্চন আয়োজিত সকল আন্দোলন কর্মসূচিতে তিনি পাশে পেয়েছেন দায়িত্বশীল সাংবাদিকদের।

প্রথমদিকে কাঞ্চন কোন নির্দিষ্ট সংস্থার ব্যানার ছাড়াই, ব্যক্তিগত উদ্যোগে সবকিছু করছিলেন। কিন্তু প্রথম তিনি একটি সংস্থার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার বুদ্ধি পান ১৯৯৬ সালে। সে বছর ২২ অক্টোবর স্ত্রীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে একটি সেমিনারের আয়োজন করেছিলেন তিনি, যেখানে অংশ নিয়েছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর অবসরপ্রাপ্ত রফিকুল ইসলাম (বীর উত্তম) এমপি। তিনিই প্রথম কাঞ্চনকে পরামর্শ দেন একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে সুষ্ঠু ও সংগঠিতভাবে আন্দোলনের কার্যক্রম পরিচালনা করার।

দিন তিনেক পর, ২৫ অক্টোবর কাঞ্চন তাঁর বাসায় সহকর্মী, আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত কর্মী ও সাংবাদিকদের নিয়ে আলোচনায় বসেন। এবং সকলের সম্মতিক্রমে ওই বছরেরই ২১ নভেম্বর থেকে নতুন উদ্যমে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ ব্যানারে তাঁরা আন্দোলন আরও জোরদার করে তোলেন। ২০০৩ সালের ১৩ জানুয়ারি তাঁরা সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদল লাভ করেন, এবং সর্বশেষ ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর সরকার তাঁদেরকে অনুমতি দেয় একটি এনজিও হিসেবে কাজ করার।

এই মুহূর্তে সারাদেশে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর শতাধিক শাখা ও প্রায় সমসংখ্যক ইউনিট রয়েছে। পাশাপাশি এই সংগঠনের কার্যক্রম দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এখন বহির্বিশ্বেও বিস্তৃত হয়েছে। বিশ্বের ১১টি দেশে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জাতিসংঘ, ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আমন্ত্রণে প্রতিবছরই তাঁরা অসংখ্য আন্তর্জাতিক সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও কনফারেন্সের আয়োজন করে আসছে।

এত বড় একটি সংগঠন ঠিকমত পরিচালনার জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থের। কিন্তু কাঞ্চন শুরুটা হয়েছিল প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থায়। নিজের পকেট থেকেই সংগঠনের যাবতীয় খরচ নির্বাহ করতেন তিনি। পরে অন্যান্য সদস্যরাও প্রতি মাসে ২০ টাকা করে চাঁদা দেয়া শুরু করেন। এভাবে দশটি বছর কেটে যায় এবং ‘নিরাপদ সড়ক চাই‘ এর কার্যক্রমও দেশের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। নিজেদের কাজের প্রতি সংগঠনটির দায়বদ্ধতা ও একনিষ্ঠতায় মুগ্ধ হয়ে তখন এগিয়ে আসতে শুরু করে অনেক পৃষ্ঠপোষক। এনটিসি, বিএসবি ফাউন্ডেশন, ওশান গ্রুপ ও ডাচ বাংলা ব্যাংকের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ সাহায্য আসতে শুরু করে। ওয়ালটন গ্রুপ তো কাঞ্চনকে তাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডরই বানিয়ে ফেলে। ফলে অর্থচিন্তা অনেকটাই দূর হয় ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ এর। বর্তমানে দেশে এমন কোন জেলা নেই যেখানে সংগঠনটি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেনি।

বর্তমানে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ সংগঠনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন কাঞ্চন। এছাড়া এ বছরই সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত হয়েছেন কিশোরগঞ্জের এই সূর্যসন্তান।

২৫ বছর ধরে এই কর্মসূচী পালন করলেও এর কোন ইতিবাচক ফলাফল কি তিনি দেখতে পেয়েছেন? কাঞ্চন বলেন, ‘এক সময় পরিবহন মালিক শ্রমিকরা আমাকে দেখতেই পারতো না। তারা মনে করতো আমি ভুল কাজ করছি। তাদের ধারণা ছিলও দুর্ঘটনা হলও কপালের লেখা। সেটা থেকে এখন তারা বেরিয়ে এসেছে। কয়েক বছর আগে এক অনুষ্ঠানে খুলনায় একজন ড্রাইভার আমাকে ধরে কেঁদে ফেলে এবং বলে যে আপনাকে ভুল বুঝেছিলাম কারণ আপনার সম্পর্কে এতো খারাপ শুনেছি যে মনে হতো রাস্তায় পেলে আপনার ওপর দিয়েই গাড়ি চালিয়ে দিবো।’

একটি কথা না বললেই নয়, গত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে কাঞ্চন প্রায় একা হাতে পুরো সংগঠনটিকে টেনে নিয়ে আসছেন। তাঁর মত একাগ্রতা নিয়ে একটি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া সত্যিই দেশের ইতিহাসে বিরলতম ঘটনা। একাধারে তিনি সড়ক দুর্ঘটনা রোধকল্পে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের উপর চাপ দিয়ে আসছেন, বিভিন্ন দাবি-দাওয়া পেশ করছেন, পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে দিতেও চেষ্টার কোন ত্রুটি করছেন না। স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকে তাঁর প্রতিটি ছবির শুরুতে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ লেখা দেখানোর ব্যবস্থা করেছেন তিনি। এই মুহূর্তে নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে হয়ত মুখর পুরো জাতি, কিন্তু গত দুই যুগ ধরে তিনি একাই নিরাপদ সড়ক চেয়ে গলা ফাটিয়ে গেছেন।

দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য এতকিছু করেও রেহাই পাননি কাঞ্চন। বর্তমান সময়ের ফেসবুক প্রজন্মের একাংশ ঠিকই তাঁকে নিয়ে বক্রোক্তি করে, হাসি-ঠাট্টা করে দূষিত করে ফেলেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। বর্তমান আন্দোলনে কাঞ্চন কেন নেই, এই প্রশ্ন করতে গিয়ে অনেকেই অপমান করে গেছে নমস্য ব্যক্তিটিকে। অথচ এই ব্যক্তিটিই লাইভ টেলিভিশনে এক প্রকার ধুয়ে দিয়েছিলেন নৌ-মন্ত্রী শাজাহান খানকে, যিনি এই মুহূর্তে সম্ভবত দেশের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তিদের একজন। এবং বর্তমান আন্দোলনেও প্রত্যক্ষভাবে যোগ দিয়েছেন কাঞ্চন, ডাক দিয়েছেন মানববন্ধনের।

প্রথমদিকে কেন এ আন্দোলন নিয়ে নীরব ছিলেন, সে প্রশ্নেরও যৌক্তিক জবাব দিয়েছেন তিনি, ‘দেখেন, অতীতে অনেক আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করা হয়েছে। যেমন- গণজাগরণ মঞ্চ, সেটা কি এখন আছে? কিংবা কোটা আন্দোলন, সেটাও ভিন্নভাবে নিয়ে বিতর্কিত করা হয়েছে। এখন আমি যদি প্রথম দিনই রাস্তায় নেমে বাচ্চাদের সাথে যোগ দিতাম তাহলে তারা বলতো- ইলিয়াস কাঞ্চন বাচ্চাদেরকে নানাভাবে বুঝিয়ে এটা করাচ্ছে। আমি ২৫ বছর ধরে যেটার দাবী করছি আজ সন্তান তুল্য বাচ্চারা রাস্তায় তা করছে। প্রশাসনের লোক যারা লাইসেন্স চেক করবে তাদেরকেও তারা ধরছে। এই আন্দোলনকে যাতে কেউ ভিন্ন খাতে নিতে না পারে সে বিষয়ে আগামীকাল (শুক্রবার) মানববন্ধনে তাদেরকে দিকনির্দেশনা দেবো।’

সূত্র: নিরাপদ নিউজ, কিশোরগঞ্জ নিউজ, অন্তরঙ্গ ইলিয়াস কাঞ্চন ও নিরাপদ সড়ক চাই, বিবিসি বাংলা

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close