বন্ধুর বোকা কথাবার্তায় কিংবা কর্মকাণ্ডে প্রায়ই আমরা বলি, “দোস্ত তোরে তো নোবেল দেয়া দরকার”। এই নোবেল যে আক্ষরিক অর্থেই নোবেল নয় বরং সে বন্ধুকে খোঁচামেরে বলা সেটি আমরা সকলেই জানি। কিন্তু আমরা সবাই কি এটা জানি যে হাস্যকর নানা রকম আবিষ্কারের স্বীকৃতি প্রদানে আসলেই এক অদ্ভুত নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়! তাও আবার বেশ বড়সর পরিসরে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির মত বড় কোন মঞ্চে!

ইগ নোবেল। ১৯৯১ সাল থেকে “সায়েন্টিফিক হিউমার ম্যাগাজিন” প্রতিবছর বিজ্ঞানের হাস্যকর অর্থহীন সব আবিষ্কারের সাথে মানুষকে পরিচয় করিয়ে দিতে এবং হাসাতে এই এ্যাওয়ার্ডর আয়োজন করে। এই এ্যাওয়ার্ডটির নাম ইগ নোবেলবলার কারনটি হচ্ছে এটি মূলত IGNOBLE/নীচ, হীন, অসম্মানজনক শব্দটি থেকে এসেছে। পদার্থ, রসায়ন, শারীরবৃত্ত, সাহিত্য, শান্তিসহ মোটদশটি বিষয়ের উপর প্রদান করা হয় এই ইগনোবেল।  তবে প্রতি বছরের জন্য পুরষ্কার প্রদত্ত দশটি বিষয় নির্দিষ্ট নয়। অর্থাৎ প্রতি বছরই যে এই নির্দিষ্ট বিষয়ে ইগনোবেল দিতে হবে এমনটি নয়। বিদ্রূপাত্মক সমালোচনার মাধ্যমে নির্মল বিনোদন প্রদান এবং সেই সাথে অবান্তর চিন্তাভাবনায় ভাবাবেগ সৃষ্টির লক্ষ্যেই ইগনোবেলের আয়োজন। এই লেখায় আমরা কিছু চমকপ্রদ তাজ্জব বনে যাওয়া ইগ নোবেল প্রাপ্তি ও তাদের উদ্ভট আবিষ্কারের কয়েকটি ঘটনা জানব- 

গেবম্ব(শান্তি, ২০০৭)২০০৭ সালে শান্তিতে ইগ নোবেল এ্যাওয়ার্ডটি নিজেদের দখলে নিতে সমর্থ হয় আমেরিকান এয়ারফোর্সের “রাইট ল্যাবরেটরি” টিম। ওহিওর এই ল্যাব তাদের অসাধারন রাসায়নিক আবিষ্কারের নাম দিয়েছে “গে বোম্ব”। প্রতিপক্ষ ঘাঁটির সৈন্যদের পরাস্ত করতে তারা তৈরি করে এই গে বোমা। তাদের বানানো এই বোমার বিস্ফোরণে কারো আহত নিহত হবার সম্ভাবনা না থাকলেও যুদ্ধের ময়দানে সৈন্যদের সমকামী করে তোলার অসাধারন ক্ষমতা ছিল। শান্তিতে ইগনোবেল প্রাপ্ত এই গে বোমা তৈরির রাসায়নিক ফর্মুলাটি ছিল প্রায় ৩ পৃষ্ঠার।

বিছানার চাদরে ভাঁজ পরার কারন অনুসন্ধান (পদার্থবিজ্ঞান, ২০০৭) লক্ষ্মীনারায়ণ মহাদেব ও এন্রিক ক্যারডা অনুসন্ধান করেছেন দৈনন্দিন বিজ্ঞানের আকর্ষণীয় এক বিষয়বস্তু নিয়ে। তারা জানতে চেষ্টা করেছেন আমাদের বেডশিট ভাঁজ হয়ে যাবার মূল কারন। ত্রিমাত্রিক কোন বস্তুতে যদি কোন চাঁদর বিছানো হয়ে তবে চাদরটি ঠিক যে যে কারনে ভাঁজ হবে তা নিয়ে তারা পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন থেকে বিস্তর গবেষণা করে দেখিয়েছেন। আর প্রত্যাশিতভাবেই এই গবেষণার ফল হিসেবে তারা পেয়েছেন পদার্থের ইগ নোবেল।

হাস্যকর উদ্ভট আবিষ্কার, স্বীকৃতি, ইগনোবেল পুরষ্কার

কানের বৃদ্ধি (শারীরবিদ্যা, ২০১৭) ব্রিটিশ জেমস হেটকটের ভাগ্যে জুটে ২০১৭ সালের এনাটমির ইগ নোবেল পুরস্কার। দেহের প্রতিটি অঙ্গের বৃদ্ধি বয়স বাড়ার সাথে সাথে বৃদ্ধি পায় এবং নির্দিষ্ট একটা সময় পর গ্রোথ হরমোনের প্রভাব আর সক্রিয় থাকে না বলে দেহের আর বৃদ্ধি ঘটে না। কিন্তু হেটকট প্রমাণ করে দেখিয়েছেন যে নির্দিষ্ট বয়সে এসে দৈহিক অন্যান্য সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বৃদ্ধি স্থিমিত হয়ে গেলেও কানের ক্ষেত্রে তার ব্যাতিক্রম লক্ষ্য করা যায়। এজন্য বুড়োদের কান অপেক্ষাকৃত বড় হয়। সেই সাথে তিনি দাবি করেন মানুষের কান প্রতিদিন দশমিক বাইশ মিলিমিটার করে বৃদ্ধি পায়।

হাস্যকর উদ্ভট আবিষ্কার, স্বীকৃতি, ইগনোবেল পুরষ্কার

গরুর নামকরণ ও দুগ্ধ তত্ত্ব (ভেটেরিনারি মেডিসিন, ২০০৯) নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির ক্যাথরিন ডগ্লাস এবং পিটার রলিন্সন গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে যেসব গাভীর নির্দিষ্ট নাম রাখা হয়েছে সেগুলো নামহীন গাভীদের তুলনায় বেশী পরিমানে দুধ দেয়। ফলে তাদের এই অসাধারন আবিস্কার খুব সহজেই তাদের এনে দিয়েছে ইগ নোবেল প্রাপ্তির সম্মান। তারা মনে করেন গাভীকে নাম ধরে ডাকলে ওরা সেটি বুঝতে পারে বলে মালিকের প্রতি অনুগত থাকে এবং ভালবাসা অনুভব করতে পারে। এতে শরীর মন ভাল থাকে ও আচরণে পরিবর্তন আসে বলেই দুগ্ধ উৎপাদনের পরিমান বেড়ে যায়। গবেষক দল আরও দাবী করেন নাম ধরে ডাকার দরুন প্রতি গরুতে দুধের পরিমাণ প্রায় 258 লিটার বেড়ে যায়।

হাস্যকর উদ্ভট আবিষ্কার, স্বীকৃতি, ইগনোবেল পুরষ্কার

যমজ তত্ত্ব (প্রতীতি, ২০১৭) মেটিও মারতিনি, ইলারিয়া বুফালারি, মারিয়া স্তেযি এবং মারিয়া এগ্লিওতির লেখা “Is That Me or My Twin? Lack of Self-Face Recognition Advantage in Identical Twins” এ একটি আজব তথ্য উদঘাটন করে জিতে নেন ২০১৭ সালে প্রতীতিতে ইগনোবেল। বেশির ভাগ যমজদের দেখেই পরিবারের বাইরের অন্য কেউ সহজে পার্থক্য করতে পারেনা তা আমাদের প্রায় সবারই জানা। কিন্তু তাদের আবিস্কারের বিশয়বস্তু ছিল যে অধিকাংশ যমজরা নিজেরাই তাদের ভিসুয়াল ইমেজ দেখে নিজেদের পার্থক্য সঠিকভাবে বুঝতে পারে না। তারাই আসলে একটা সময় পর্যন্ত নিজেদের চিনতে দ্বিধায় ভোগে এবং ঘাবড়ে যায়।

হাস্যকর উদ্ভট আবিষ্কার, স্বীকৃতি, ইগনোবেল পুরষ্কার

গরুর দাঁড়িয়ে কিংবা শুয়ে থাকা (সম্ভাব্যতা, ২০১৩)- বার্ট টক্যাম্প এবং মেরী হেস্কেল এ দুজন একই সময়ে তাদের পৃথক পৃথক গবেষণায় প্রায় একই ধরনের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে একটি গরু কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে এবং কতক্ষণ পর শুয়ে পড়বে সে সময়টা চাইলেই অনুমান করে বের করা যায়। তারা মনে করেন, একটি গরু যত বেশী সময় পর্যন্ত শুয়ে থাকবে, ততই তার উঠে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা প্রবল হবে। এবং যে সময়ে গরুটি উঠে দাঁড়াবে, সেসময়ের কতক্ষণ পরে আবার গরুটি ঘুমিয়ে পরবে তা অনুমান করাটা খুব কঠিন এবং দুঃসাধ্য ব্যাপার। সম্ভাব্যতার এমন কিম্ভুত তত্ত্ব প্রদানের জন্য তারা অর্জন করেন ইগনোবেল। তবে চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে তাদের এই গবেষণা প্রতিবেদনটি ২০১০ সালে বিজ্ঞানবিষয়ক জার্নাল “এলসেভিয়ার” কর্তৃকও প্রকাশিত হয়।

হাস্যকর উদ্ভট আবিষ্কার, স্বীকৃতি, ইগনোবেল পুরষ্কার

রাস্তায় গাড়ি পার্কিংয়ে ট্যাংক থেরাপি (শান্তি, ২০১১)- লিথুনিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াসের মেয়র আরটুরাস যুকাসের ইন্টারনেটে ভাইরাল একটি ভিডিও রয়েছে। যেখানে দেখা যায় তিনি ট্র্যাফিক আইন ভঙ্গকারী অভিজাত সব গাড়ির উপর তার ট্যাংক উঠিয়ে দিয়ে সেগুলোকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছেন। এই ঘটনা একই সাথে তার কাজের প্রশংসা এবং নিন্দার ঝড় তুলে। এই আলোচিত অদ্ভুত উদ্যোগ গ্রহনের জন্য ২০১১ সালে তাকে শান্তিতে ইগনোবেল সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।

হাস্যকর উদ্ভট আবিষ্কার, স্বীকৃতি, ইগনোবেল পুরষ্কার

ইঁদুরের ভাষা পার্থক্য বুঝতে না পারা (ভাষাবিজ্ঞান, ২০০৭)- জুয়ান ম্যানুয়াল তরো এবং জসেপ বি ত্রবালন গবেষণা করেছেন ইংলিশ ভাষাভাষী অঞ্চলের প্রায় 60 টি ইঁদুর নিয়ে। যে ইঁদুর গুলো কখনোই ডাচ কিংবা জাপানিজ ভাষা শুনেনি বলেই গবেষকরা ধরে নেন। অতঃপর শুরু হয় ইঁদুরদের উপর নানা এক্সপেরিমেন্ট। একটি বদ্ধ রুমে রেখে ইঁদুরকে শুনানো হয় ডাচ এবং জাপানিজ ভাষার কথোপকথন। ইঁদুররা আগের মতই স্বাভাবিক আচরণ করতে থাকায় ধরে নেয়া হয় যে এরা এই দুটি ভাষার বিশেষ পার্থক্য বুঝতে অপারগ। আর এভাবেই প্রথমবারের মত ভাষাবিজ্ঞানে ইগনোবেল ছিনিয়ে নেন এই দুই গবেষক ভাষাবিজ্ঞানীদ্বয়।

হাস্যকর উদ্ভট আবিষ্কার, স্বীকৃতি, ইগনোবেল পুরষ্কার

সবশেষে ইগনোবেল সম্পর্কে একটা ধারনা স্পষ্ট করা দরকার যে, এই পুরষ্কারের লক্ষ্য নিছক লোক হাসানো বা বিনোদনই নয়। আয়োজকরা বিশ্বাস করে যে ইগনোবেল প্রথম শর্তে মানুষকে হাসালেও এটি মানুষকে ঠিকই ভাবাবে।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-