শামির মোন্তাজিদ

রোজা রেখে ল‍্যাবে কাজ করছিলাম সারা দিন ধরে। হঠাৎ এক বান্ধবী ফোন দিয়ে বললো:

— দোস্ত! পিজ্জা গাইতে বুকিং পাইসি! আনলিমিটেড পিজ্জা। যাবি? 
— বুকিং পাওয়া কি অনেক কঠিন?
— আরে, তুই কিসু জানোস? গত রমজানে প্রায় এক সপ্তাহ আগে সব বুকিং শেষ হয়ে গেছে। এইবার তো মানুষ রোজা শুরুর আগে বুকিং দিসে! 
— আচ্ছা, আমার যেতে সমস‍্যা নাই! খরচ কেমন?
— ভ‍্যাট সহ ১০০০ এর মতো লাগতে পারে!
— আমারে কুত্তায় কামড়াইসে? আমি ইফতারে বেশি হলে ৪ স্লাইস পিজ্জা খাইতে পারবো। তার জন‍্য ১০০০ টাকা?

বান্ধবী বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে দিলো। বাসায় এসে নিজেই পাস্তা বানালাম। ২০০ টাকা খরচ করে রান্না করে প্রায় তিন বেলা খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুড় তুললাম।

এখন আমাদের সবচেয়ে বড় ট্রেন্ড হলো ইফতার হ‍্যাংগ আউট। হালের ক্রেজের কথা মাথায় রেখে বুদ্ধিমান রেস্টুরেন্ট ব‍্যবসায়ীরা সাজিয়ে বসেছেন তাদের ইফতার প্ল‍্যাটারের নীল নকশা। একজন মানুষের ভালোমানের ইফতার করতে সর্বোচ্চ ১০০-১৫০ টাকা খরচ হতে পারে। কিন্তু, ফুড ব‍্যাংকের পোস্টে দেখা যায় ৫০০-১৫০০ টাকার বাহারী ইফতার!

ইদানীং যেই জিনিসটা সবচেয়ে বিরক্ত লাগে সেইটা হলো- আনলিমিটেড ইফতার। পিজ্জা, পাস্তা এমনকি কেএফসির বার্গারও “যত খুশি তত খাও” ভিত্তিতে অফার দেয়া হচ্ছে। সারাদিন না খেয়ে থাকা একটা মানুষ হঠাৎ করেই অনেক খাবার খেতে পারে না। তার জৈবিক বিক্রিয়া এত লোড সহ‍্য করতে পারবে না— এটাই স্বাভাবিক।

তাই, ৯০০ টাকায় আনলিমিটেড পিজ্জা অফারে ১২ স্লাইস পিজ্জা খেয়ে চাদঁরাতে গরু কেনার ফিলিংস নিয়ে যারা বাসায় ফিরেন তাদের উদ্দেশ‍্যে বলছি: আপনি কোন দিনও খেয়ে টাকা উসুল করতে পারবেন না। রেস্টুরেন্টের বিজনেসটা অনেকটা লাস ভেগাসের ক‍্যাসিনোর মতো। No matter what happens, the house always wins. আপনি নিজে ২৪ স্লাইস পিজ্জা খেয়ে নিজেকে দানব মনে করলেও বাকী সবাই ৪ স্লাইস খেয়ে কোন মতে শেষ করতে পারে না। এখন আপনি যদি বলতে চান যে, তাতে আপনার কি? আপনার টাকা তো উসুল!

আসলে না। চূড়ান্ত মাত্রায় চিজ দেয়া ২৪ স্লাইস পিজ্জা খেয়ে নিজের সংযমের যে পরীক্ষা দিলেন তার সাইড ইফেক্টে বয়স ৩৫ হতেই হার্টে একটা-দুইটা ব্লক ধরা দিবে। একটা রিং পড়াতে খরচ আছে প্রায় ২ লক্ষ টাকা। ৮৯৯ টাকা পিজ্জার বিল দেয়ার পর এক টাকাটা চেয়ে নিয়েন। কারণ, ভবিষ‍্যতে দরকার হবে।

এখন আপনি বলবেন যে, রমজানের অন‍্যতম উদ্দেশ‍্য হলো ভাতৃত্ববোধ সৃষ্টি। সবাই মিলে একসাথে ইফতার করতে গেলে একটা সুন্দর সামাজিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এই প্রসঙ্গে আপনাকে মনে করিয়ে দিতে চাই সেই ছোট্টবেলার কথা। মনে পড়ে পাশের বাসায় প্লেট ভর্তি করে ইফতার দিয়ে আসার কথা? আজ পর্যন্ত একটা প্লেট খালি ফেরত আসে নাই।

আমাদের এক প্রতিবেশীর আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ ছিলো। আম্মু বেশ ভালো ইফতার বানালেই তার বাসায় কিছুটা অংশ পাঠানো হতো। খালি প্লেট ফেরত না দিয়ে লোকটা প্লেট ভর্তি করে মুড়ি দিয়ে দিতো। ব‍্যাপারটা মনে হলেই খুশিতে মনটা ভরে যায়! এখন আপনাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনার কয়জন প্রতিবেশীর নাম আপনি জানেন? আমি নিজেও এই উত্তরটা দিতে গেলে লজ্জায় আটকে যাই!

আর আপনি যেসব ইফতার প্ল‍্যাটার খান তার বেশির ভাগই হলো বাধ‍্য হয়ে খান। ধরুন, আপনি পাস্তা খেতে গেলেন। কিন্তু, দোকানী তার নরমাল মেন‍‍্যু সার্ভ করবেন না। তাদের আছে পাস্তা প্ল‍্যাটার। পাস্তার দাম ধরুন ২৫০ টাকা কিন্তু, প্ল‍্যাটারের দাম ৪৯০টাকা! বাকি টাকাটা দুইটা খেজুর, একটা জিলাপী, এক গ্লাস রুহ আফজার দাম! আপনাকে তারা রীতিমতো বাধ‍্য করলো খাবারটা খেতে!

এখন মনে হতে পারে, এতো অবিচার সত্ত্বেও আমরা কেন বেশীদামে এই প্ল‍্যাটার খাইতে যাই? কখনো ভেবে দেখেছেন?

উত্তরটা হলো Stress Eating. আমরা অনেক প্রেশারে থাকি। বাসায় অথবা অফিসে, সব জায়গাতেই স্ট্রেস। নিজের মাথার ঝড় এখন সবাই খেয়ে নামানোর চেষ্টা করে। ঢাকা শহরে ঘুরতে যাওয়ার তেমন জায়গা নাই। পার্কগুলো মূলত নিচুদরের যৌনব‍্যবসার জায়গা। ভদ্র ঘরের ছেলে-মেয়েরা তাই সময় কাটাতে যায় রেস্তোরাতে। আর প্রতিবার সোফায় পাছা রাখলেই অন্তত দুজনের খাবার খেতে ৬০০-৮০০ টাকা খরচ করে ফেলেন। আমি নিজেও অনেক সময়ই কাজটা করি।

অনেক তো সমস‍্যার কথা বলা হলো। আসেন সমাধানটা খুজিঁ:

1. আনলিমিটেড ইফতার অফারে যেয়ে নিজের উপর জুলুম কইরেন না। বেশী খেতে চাইলে কম খেয়ে বেশী দিন বাচেঁন। বেচেঁ থাকলে অনেক খেতে পারবেন।

2. যেহেতু রেস্তোরাতে প্ল‍্যাটার খেতে গেলে অনেক খাবার বেচেঁ যায়, সেগুলো একটা ভালো কাজে লাগান। খাবার আগেই কিছুটা অংশ আলাদা করে রাখুন। বিল দেয়ার আগে সেটা প‍্যাকেট করে নিন। দোকান থেকে বের হলেই দেখবেন বেশ কিছু বাচ্চা-কাচ্চা ভিক্ষা করছে খাবারের জন‍্য। ওদের সাথেও আপনার আনলিমিটেড হ‍্যাপিনেসটা শেয়ার করুন।

3. আসুন, প্রতি রমজানে অন্তত একদিন হলেও প্রতিবেশীদের বাসায় আবার ইফতার পাঠানোর রীতিটা চালু করি। এটা অনেক সুন্দর একটা প্রথা। এটাকে বাচিঁয়ে রাখি।

সবশেষে আরো একটা আবদার। বাংলাদেশে মুসলিম এবং বিধর্মীদের বিবাদ ইদানীং বেশ চরমে উঠেছে। আমার এক হিন্দু বন্ধু বুয়েট পাশ করে দেশে ছাড়তে চায় কারণ তার মতে এই দেশ হিন্দুদের জন‍্য নিরাপদ নয়। এই দেয়ালটা আসুন পবিত্র রমজানে ভেঙ্গে ফেলি। ভিন্ন ধর্মানুসারী কলিগ-বন্ধু-প্রতিবেশীদের ডেকে একদিন ইফতার করান। তারাও দেখুক আমাদের খোদাভীতি। সারাদিন না খেয়ে থাকা সত্ত্বেও প্লেট ভর্তি ইফতার নিয়ে আমরা বসে থাকি — এই দৃশ‍্য দেখলে দেখবেন তারাও বেশ অনুপ্রাণিত হবে।

ঢাকা বেশ ব‍্যস্ত নগরী। কাজের চাপেই আমাদের বাহিরে খেতে হয়। অন্তত একটা চেষ্টা করি, একদিন ইফতার থেকে ৫০ টাকা বাঁচিয়ে একটা রিকশাওয়ালাকে দেই। ১ কোটি মানুষের এই শহরে তাইলে প্রায় ৫০ কোটি টাকার খুশি বিলিয়ে দেয়া হবে। ঈদের দিন কারো বাসায় তাইলে আর সেমাইয়ের অভাব হবে না।

আনলিমিটেড পিজ্জার বদলে আসুন আনলিমিটেড খুশির অফারটা নেই। এই প্ল‍্যাটারের দাম বেশ কম…

Comments
Spread the love