আমাদের দেশে প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেই এক ধরণের সংস্কৃতি লক্ষ করা যায়- ‘শ্রেষ্ঠত্বের সংস্কৃতি’। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের থেকে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে এর প্রচলন বেশি চোখে পড়ে- স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়- সবখানেই। 

সংস্কৃতিটা হচ্ছে- ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানই শ্রেষ্ঠ’ – এই বাক্যটি শিক্ষা দেয়া। এটা খুবই সাধারণ বিষয় এবং অনেক ক্ষেত্রে দরকারীও বটে। একজন শিক্ষার্থী যদি নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রতি ভালোবাসা এবং টান অনুভব না করে তবে সে প্রতিষ্ঠানে বেশিদূর এগোতে পারবেনা অথবা এগোতে কষ্ট হবে। এই টান বা ভালোবাসা সৃষ্টির উপায় হচ্ছে তাকে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে গর্বিত করে তোলা। আর এই গর্ব সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই আগমন ঘটে তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্বের। 

একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ কিভাবে নির্ণীত হতে পারে? প্রথমত, ফলাফল দিয়ে (যেটা আমাদের দেশে অনুসরণ করা হয়)। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার মান এবং পরিবেশ নিয়ে (নটরডেম কলেজ এর শিক্ষার মান সম্পর্কে যেমন উচ্চ ধারণা প্রচলিত) এবং তৃতীয়ত, ঐতিহ্য বা ঐতিহাসিক গুরুত্ব দিয়ে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকা কলেজ) । আবার কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে থাকার ‘অতিরিক্ত সুবিধা’ পাওয়া যায়, এমন ধারণাও কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের থাকে (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আই.বি.এ)। 

ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবার ইচ্ছা প্রায় সকলেরই থাকে। কলেজে ভর্তির সময় ছেলেদের প্রথম পছন্দ থাকে নটরডেম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢাবি (ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া যাদের ইচ্ছা,তাদের কথা আলাদা, সেখানেও শ্রেষ্ঠত্বের বিচার করা হয়)। এখন এই পরিমাপক দণ্ড গুলো কিন্তু ভুল বা অযৌক্তিক নয়। নটরডেম কলেজে পড়াশুনার মান আসলেই উন্নত এবং দেশের ইতিহাসে ঢাবি এবং ঢাকা কলেজ ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান- বাংলাদেশের প্রায় সকল রথী-মহারথীরা এই দুটো প্রতিষ্ঠানের কোন একটার অথবা উভয়েরই ছাত্র ছিলেন। 

শ্রেষ্ঠত্ব, বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাবি

(অবশ্য এর ব্যাখ্যায় বলা যায় তখন রাজধানী ঢাকায় স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ছিলই মোটে দু-একটা। বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ঐ একটাই। তাই যারা পড়াশুনার সুযোগ পেয়েছে তাঁরা ওগুলোতেই পড়েছেন। আজ থেকে ১০-১৫ বছর পর কিন্তু বলা কঠিন হবে যে দেশের সব উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। দেখা যাবে তখন বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ড, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকেই অনেকে উঠে এসেছেন, কারণ এখন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা অনেক।) 

প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে শ্রেষ্ঠত্বের শিক্ষাদান বা শ্রেষ্ঠত্বের বোধ- এটা সঠিক ভাবে আমরা চর্চা করছি কিনা? এই শ্রেষ্ঠত্ববোধ উগ্রবাদে পরিণত হচ্ছে কিনা? এই শ্রেষ্ঠত্ববোধ অন্যকে হেয় করার জন্য আমরা ব্যবহার করছি কিনা- এই প্রশ্ন গুলো আমাদের ভেবে দেখা দরকার। 

কয়েক দিন আগেই ঢাকা কলেজ এবং আইডিয়াল কলেজের ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ বেঁধেছে দু দফায়,গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে এবং এতে বেশ কয়েকজন ছাত্র আহতও হয়েছে। তাদের সংঘর্ষের ‘এজেন্ডা’ ছিল দুটি- ১. আইডিয়াল কলেজের কয়েকজন ছাত্রীর সাথে ঢাকা কলেজের কয়েকজন ছাত্রের প্রেম এবং এই নিয়ে বিবাদ, ২. কোন কলেজ শ্রেষ্ঠ- সেই নিয়ে বিবাদ! (খবরঃ প্রথম-আলো) । 

আমাদের শিক্ষার্থীরা রাস্তাঘাটে গাড়ি ভাঙচুর আর মারপিট করে বেড়াচ্ছে, ‘কোন কলেজ শ্রেষ্ঠ’ এই দ্বন্দ্বে- এটা আমাদের জন্য কতখানি লজ্জার, সেটা হয়তো এই ঘটনা-দুর্ঘটনার বাজারে আমাদের মগজে আসছেনা।এই উদাহরণ টানলাম, আমাদের ‘শ্রেষ্ঠত্ববোধ’-এর অবস্থান কোথায়, তার একটা ছোট্ট নমুনা দেয়ার জন্য। 

দ্বিতীয়ত,এই শ্রেষ্ঠত্ববোধ আমাদের ভিতরে প্রবিষ্ট করানোর পদ্ধতিটা সব সময় ঠিক নয়। সাধারণত অতীত গৌরব শিক্ষা দেয়া হয় যেন সেখান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে উজ্জ্বল বর্তমান গড়ে তোলা যায়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা দেখছি, অতীত গৌরব রোমান্থন যতটা হচ্ছে, উজ্জ্বল বর্তমান সৃষ্টির প্রয়াস ততটা নেই। দেশের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব এক সময় ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন- এটা এখন তাদের গর্বের বিষয় নয়। বাসের কন্ডাক্টরকে হুমকি ধামকি দিয়ে ‘৫ টাকায় দশ জন’ ভ্রমণ করতে পারাটাই তাদের এখনকার গর্বের বিষয়বস্তু! 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা দেশের ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয়টির ভূমিকা নিয়ে গর্ববোধ করে, কিন্তু দেশের বর্তমান গঠনে তারা কোন ভূমিকা রাখছে কিনা- সেটা নিয়ে খুব একটা চিন্তা ভাবনা করেনা। এক সময় এই বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিয়েছে, সকল গণ আন্দোলনে অগ্রভাগে থেকেছে। সেই বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন রাজনৈতিক ভাবে ধ্বজভঙ্গের শিকার কেন হল- এই নিয়ে কারো মাথা ব্যাথা নেই। তাই উত্তরণের চেষ্টাও নেই। 

বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম বিশ্ববিদ্যালয় অক্সফোর্ড, ক্যাম্ব্রিজ- এগুলোও ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন শিক্ষাকেন্দ্র। এগুলোর করিডর ধরে হাঁটলেও কোন একজন নোবেল লরিয়েটের সাথে ধাক্কা খাওয়ার সম্ভাবনা আছে! ঐতিহ্য রোমান্থন করে নিশ্চয়ই তারা তাদের বর্তমান অগ্রগতি বন্ধ করে দেয়না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থীরা যখন নানামুখী জ্ঞান চর্চায় নিয়োজিত আমরা তখন ‘ইউটিউব ভিডিও বানানো’ নিয়ে মোটিভেশন নিচ্ছি! আর আমাদের কলেজে পড়া ছোটভাইরা ‘অমুক কলেজের ছেলের সাথে আমাদের কলেজের মেয়েরা কেন প্রেম করবে’- এই বিরাট সমস্যা নিয়ে রাস্তায় গাড়ি ভাঙচুর করছে! 

 

শ্রেষ্ঠত্ব, বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাবি 

অমুক প্রতিষ্ঠান শ্রেষ্ঠ, তমুক প্রতিষ্ঠান খারাপ- এই চিন্তাটা পুরোপুরি অযৌক্তিক একটা চিন্তা। যে মানদন্ড গুলোর কথা উল্লেখ করেছি, তার বিচারে বলা যেতে পারে, কোন একটা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আছে অন্যদের চেয়ে। তার মানে এই না যে, সেটা ‘শ্রেষ্ঠ’, আর বাকি গুলো নিকৃষ্ট। এই অযৌক্তিক, তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্বের মোহ আমাদের উগ্রতা বৃদ্ধি করেছে, অন্যদিকে বাড়িয়েছে হীনমন্যতা। এই হীনমন্যতার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়া ইডেন কলেজের একজন শিক্ষার্থী এখন নিজেকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী’ হিসেবে পরিচয় দেয়। কেন? ইডেন কলেজ খারাপ কিসে? আর এই শ্রেষ্ঠত্বে মোহিত হয়ে, কলেজ গুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হওয়াতে, ঢাবি’র শিক্ষার্থীরা অপমানিত বোধ করে! 

আমাদের মূল সমস্যা হল, আমাদের লক্ষ্য খুবই ছোট। প্রথম পর্যায়ে, কোন একটি বিশেষ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারা আর দ্বিতীয় পর্যায়ে, কোন একটি বিশেষ চাকরি পাওয়া। ব্যাস এইটুকুই। সুন্দরী স্ত্রী, টাকা, বাড়ি গাড়ি- এগুলো ঐ চাকরির প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত। তাই সেই বিশেষ প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পেলেই বা সেই বিশেষ চাকরি লাভ করলেই আমরা মনে করি,আমরা বিশ্ব জয় করে ফেলেছি এবং আমরা অন্যদের থেকে ‘শ্রেষ্ঠ’। কিন্তু ‘বনগাঁয়ে শেয়াল রাজা’।

প্রতিষ্ঠান নিয়ে আমাদের গর্ব যেন অহংকারে পরিণত না হয়। যে নিজে সমৃদ্ধ- সে করে গর্ব, আর যে নিজে নিঃস্ব- অহংকার তার আভরণ। তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শ্রেষ্ঠত্ববোধ থেকে বেড়িয়ে এসে, নিজেকে উন্নত করা আর সেই উন্নতির ভাগ গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেয়াটাই সত্যিকারের শ্রেষ্ঠত্বের চর্চা হওয়া উচিত।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-