অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

সত্যিই কি কাউকে হিপনোটাইজ করা সম্ভব?

ধরে নিন, একটি অসাধারণ মুভি দেখছেন কিংবা সাড়া জাগানো কোনো গল্পের বই।

প্রথম কয়েক মিনিটের পর গল্পের ভেতর এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন যে, পারিপার্শ্বিক আর কিছুই আপনার খেয়াল নেই। চুলার ওপরে যে চা বসিয়ে এসেছেন, সে কথাও মনে নেই। চায়ের পানি শুকিয়ে এরই মধ্যে কেতলি মরুভূমি হয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যা সাতটায় গল্পের ভেতরে ডুবে এখন যে রাত এগারোটা বেজেছে সেদিকেও আপনার ভ্রূক্ষেপ নেই। গল্পের এতোটাই গভীরে আপনি চলে গিয়েছেন যে, গল্পের জগতটাকেই সত্যি বলে মনে হচ্ছে এবং আপনি নিজেও সেই জগতের একজন হয়ে গিয়েছেন। গল্পের নায়কের জায়গায় আপনি নিজেকে আবিষ্কার করছেন এবং বিভিন্ন এডভেঞ্চারে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন। আপনি বুঝতেও পারছেন না লেখক আপনাকে মনের সেই স্তরে নিয়ে গিয়েছে যে স্তরে আপনার নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে নেই কিন্তু আপনি স্বয়ংক্রিয় ভাবে গল্পের জগতে যাবতীয় ঘটনা ঘটাচ্ছেন।

হিপনোটিজম কিংবা সম্মোহন বিদ্যা বলে একটা ব্যাপার আমরা অনেকেই শুনেছি। উপরে যে দৃশ্যকল্পটি বলেছি, হিপনোটিজম অনেকটাই এরকম। আপনাকে যখন কেউ সম্মোহিত করবে, আপনি তখন এমন এক বিভ্রমের জগতে চলে যাবেন যে আপনি শুধু তা-ই দেখবেন বা অনুভব করবেন যা আপনাকে দেখতে বলা হবে। অবচেতন মনে আপনি এতোটাই প্রভাবিত হবেন যে, আপনি সম্মোহিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট আচরণ করতে বাধ্য হবেন।

হিপনোটিজম বেশ প্রাচীন বিদ্যা। প্রাচীন মানব সভ্যতার অনেকেই এই বিদ্যাটিকে ভাবতো যাদু বিদ্যা। কেউ হিপনোটিজম করলে মানুষ মনে করতো তার অলৌকিক ক্ষমতা রয়েছে।

অষ্টাদশ শতকের দিকে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা শহরে ড. ফ্রান্ডস অ্যান্টন মেজমার হিপনোটিজমের চর্চা করতেন। তখন এই বিদ্যাটি বেশ ছড়িয়ে পড়ে, অনেকেই এই পদ্ধতি চর্চার দিকে ঝুঁকে। তৎকালীন সময়ে সেই ডাক্তার মেজমারের নামেই এই বিদ্যাটির তখন নামকরণ হয়েছিলো “মেজমেরিজম”!

অবশ্য এই নাম পালটে যায়। ১৮৪০ সালে স্কটল্যান্ডের ড. জেমস ব্রেড এই বিদ্যার নাম দেন “হিপনোটিজম”। নামের পেছনে অবশ্য কার্যকরণ আছে। হিপনোটিজম শব্দটির উতপত্তি গ্রীক শব্দ হিপনোস (Hypnos) থেকে। এই হিপনোস শব্দের অর্থ হচ্ছে, “ঘুম”। হিপনোস নামে গ্রীকে একজন ঘুমের দেবতাও আছেন। যাই হোক, যেহেতু সম্মোহিত ব্যাক্তি অনেকটা ঘুমের ঘোরেই হিপনোটাইজড হয়ে কাজ করতে থাকেন, তাই এই বিদ্যাকে হিপনোটিজম নাম দেয়া হয়।

সম্মোহনের কয়েকটি পর্যায় আছে।

  • মারণ
  • ত্রাটন
  • স্তম্ভন
  • বশীকরণ

১. মারণ: মারণ হল অপছন্দের লোক কিংবা কোনো শত্রুকে সম্মোহিত করে নিকেশ করে ফেলা।

২. ত্রাটন: ত্রাটন হল ত্রাণ। এর মানে হচ্ছে, সম্মোহন করে শত্রুর দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া। সুযোগ নিয়ে তাকে বশীভূত করা।

৩. স্তম্ভন: স্তম্ভন মানে তোল্লাই দেওয়া বা বার খাওয়ানো। এই পদ্ধতিতে ঘোরতর অপরাধীকে সম্মোহন করে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় যে, সে অপরাধবোধ স্বীকার করে মহান হতে চায়। স্তম্ভনে ফেঁসে গিয়ে আসামী গড়গড় করে সব কিছু তদন্তকারী অফিসারকে বলে দেয়।

৪. বশীকরণ: নানা কৌশলে মানুষকে সম্মোহনের মাধ্যমে নিজের বশে এনে বিভিন্ন নির্দেশ দেয়াই বশীকরণ।

চাইলেই অবশ্য কাউকে সম্মোহন করা যায় না। কাউকে হিপনোটাইজ করতে হলে তার সাহায্য লাগবে। মানে সেই ব্যক্তি যদি ইচ্ছে না করেন তাহলে হিপনোটাইজ করা সম্ভব হয় না। সাধারণত সম্মোহিত করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে প্রথমে কোনো নিরিবিলি পরিবেশে বসিয়ে তাকে খুব মৃদুস্বরে বলা হয়, শরীর যতটা সম্ভব শিথিল করে আরাম করে বসতে। এরপর এক দৃষ্টিতে কোনো জিনিসের দিকে পূর্ণ মনযোগ দিয়ে তাঁকে তাকিয়ে থাকতে বলা হয়। অনেকক্ষণ যাবত যখন লোকটা কোনো কিছুর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে তখন এমনিতেই চোখ এবং মনও কিছুটা ক্লান্ত হয়ে যাবে। তখন তাকে বলা হবে চোখ বন্ধ করতে। চোখ বন্ধ করেই সম্মোহিত ব্যক্তি ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে অনেকটা। যদি ঠিক ঠাক সম্মোহিত হয়ে থাকে, তাহলে এই পর্যায়ে হিপনোটাইজড ব্যক্তিকে সম্মোহনকারী ব্যাক্তি বিভিন্ন কথা বলবে, নির্দেশ দিবে। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো হিপনোটাইজড ব্যক্তি এই নির্দেশগুলো পালন করতে শুরু করবে!

আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে খুব সাধারণ ব্যাপার। কিন্তু, হিপনোটিজমের শক্তি কতটা সেটার ব্যাপারে কিছু উদাহরণ না দিলে বুঝা যাবে না। সেসব অবশ্যই দেয়া হবে। হিপনোটিজম নিয়ে পৃথিবীতে অনেক গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে। অনেক দূর্ঘটনাও ঘটেছে হিপনোটিজমের কারণে। হিপনোটিজম এমন বিদ্যা যা দিয়ে ভালোও করা যায়, আবার চাইলে কারো খারাপও করা যায়। ব্রিটিশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক নিযুক্ত একটি কমিটি এই বিষয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান চালায়। অনেক গবেষণা ও অনুসন্ধানের পর তারা রায় দেয় যে, হিপনোটিজম একটি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি। এরপর যত দিন এগিয়েছে চিকিৎসক এবং বিজ্ঞানীদের অনেকে এই বিদ্যাটির বিষয়ে প্রবল আগ্রহী হন।

হিপনোটিজমের এতটাই প্রভাব যে, ধরে নিন এখন গ্রীষ্মকাল। কিন্তু, আপনি যাকে হিপনোটাইজ করলেন তাকে আপনি বুঝালেন এখন শীতকাল। সম্মোহিত ব্যাক্তি তখন হিপনোটাইজড থাকা অবস্থায় ঠক ঠক করে কাঁপা শুরু করবে, প্রবল শৈত্য প্রবাহে যেমন করে মানুষ কাঁপে ওমন। সম্মোহিত ব্যাক্তি ঐ নির্দিস্ট সময়টায় নিজেকে কানা, খোঁড়া, অন্ধ, বাক শক্তিহীন সবকিছুই ভাবতে পারে। ধরেন, আপনার কোনো বন্ধু চরম পর্যায়ের বাঁচাল। কিন্তু, হিপনোটিজম করে আপনি তাকে বুঝালেন, তুমি বোবা, তুমি কথা বলতে পারবে না। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ঐ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সে সত্যিই বিশ্বাস করবে সে বোবা, এবং কথা বলতে পারবে না!

এই বিষয়ে সবচেয়ে যেটি উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সম্মোহন ভেঙ্গে যাওয়ার পর সেই ব্যক্তি ওই নির্দিষ্ট সময়ে কী কী ঘটেছে এবং সে কী কী করেছে, তার কিছুই মনে রাখতে পারে না!

ইংল্যান্ডে একজন দাঁতের ডাক্তার ছিলেন। তার নাম ডা. এস ডেল। তিনি এনেস্থেশিয়া (অবশ করার কৌশল) ব্যবহার না করে রোগীকে হিপনোটাইজ করে পটাপট দাঁত তুলে নিতেন। দাঁত উঠানোর সফলতা কাজে লাগিয়ে হিপনোটিজম ব্যবহার করে তিনি এরপর ফুসফুসের অস্ত্রোপচারও করেন! জটিল অপারেশনের সময় রোগীর মনে যে চাপ পড়ে, দুশ্চিন্তার তৈরি হয় সেসব দূর করা সম্ভব হিপনোটিজম করে।

এতো ভালো দিক বললাম। হিপনোটিজমের অপব্যবহারেরও উদাহরণ আছে অজস্র। ১৯৭০ দশকের কথা। আমেরিকায় থাকতেন এক ভারতীয় গুরু। তার শিষ্য সংখ্যা বেশ ভালোই। একদিন তার কি মতি হলো কে জানে! তিনি তার শিষ্যদেরকে হিপনোটাইজড করে নির্দেশ দিলেন, বিষ পান করতে। একটা বড় ড্রামে তরল বিষ ভর্তি ছিলো। শিষ্যরা সম্মোহিত অবস্থায় গুরুর কথা শুনে এক গ্লাস করে বিষ পান করলো। এই ঘটনায় এক সাথে প্রায় ৭০ জন মানুষ মারা যায়! আমেরিকান সরকার তখনকার এই গণআত্মহত্যায় আতংকিত হয়ে এই ধরণের গুরুকেন্দ্রিক আশ্রম গড়ে তোলার উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলো।

“ডিসকভারী” চ্যানেল একটি গবেষণামূলক প্রতিবেদন প্রচার করেছিলো কিছু দিন আগে। আমেরিকা ও ব্রিটেনের বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী একদল মানুষের ওপর হিপনোটিজমের প্রভাব কতখানি কার্যকর হয় সেটি নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়েছেন। তাদের গবেষণার বিষয়বস্তু ছিলো চমকপ্রদ। তারা দেখতে চেয়েছেন যে, হিপনোটাইজ করে একজন নিরেট ভদ্র ভালো মানুষকে খুনি বানানো সম্ভব কি না! গবেষণার ফল কি হয়েছে জানেন? গবেষণার ফল হয়েছে যে, একজন সাধারণ মানুষকে হিপনোটাইজ করে সত্যি সত্যি তাকে দিয়ে মানুষ খুন করানো সম্ভব! হিপনোটাইজ হয়ে সে একজন মানুষকে অবলীলায় খুন করে আসবে এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে সম্মোহন ভেঙ্গে গেলে এই খুনের কোনো কথাই তার মনে থাকবে না!

যাই হোক, বিজ্ঞান এই রহস্যময় মানসিক অবস্থা নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে এই সম্পর্কে হয়তো আরো তথ্য উপাত্ত উঠে আসবে। আপাতত, আব্রাহাম লিংকনের একটি উক্তি দিয়ে লিখাটি শেষ করছি-

“সম্মোহনের দ্বারা কিছুক্ষণের জন্য হয়তো কিছু লোককে আপনি বশ করতে পারেন, কিন্তু সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বশ করতে পারবেন না।” 

সমাজে আজকাল আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে সম্মোহিত করে রেখে অনেকেই চোখে ধুলো দিচ্ছে। আমরা যেন সত্যকে সত্য হিসেবেই দেখতে শিখি, আবেগের তোড়ে বশীভূত হয়ে ভেসে না যাই। সবার জীবনের বিভ্রান্তি দূর হোক।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close