দারিদ্র‍্যতার কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে স্বাভাবিক পথ ছেড়ে খানিকটা অস্বাভাবিকতার পথে হাঁটতে বাধ্য হয় অনেক মানুষই। সেগুলোর কোনটি হয়তো অপরাধমূলক, আবার কোনটি অপরাধ না হলেও, সভ্য সমাজের মেনে নেয়ার মতো কাজ নয়। এমনই একটা কাজ হচ্ছে পতিতাবৃত্তি। যৌনতা অনেক আগে থেকেই পৃথিবীর অন্যতম বড় একটা ব্যবসা। একটা সময় মূলত নারীরাই এখানে পন্য হিসেবে ব্যবহৃত হতেন, এখন পুরুষেরাও সরাসরি অংশগ্রহণ করছেন। তবে সিংহভাগ মানুষই শখের বশে নয়, আয়-উপার্জনের অন্য কোন উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়েই আসেন এই পেশাটায়।

দারিদ্র‍্যতা নাকি ভালোবাসা কেড়ে নেয়। বাংলায় তো একটা কথাই প্রচলিত আছে- অভাব ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকলে নাকি ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়! অভাব ভালোবাসা কেড়ে নিতে পারুক আর না পারুক, আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় কিন্ত অভাবই কেড়ে নিচ্ছে ভালোবাসার মানুষকে, গৃহকর্ত্রীকে বাধ্য করছে পতিতাবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়তে। আর ঘরের কর্তাব্যক্তিটিও খানিকটা স্বচ্ছল স্বাভাবিক জীবনের আশায় মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন সবকিছু, নিজেই স্ত্রীর জন্যে ক্রেতা খুঁজে আনছেন, কাজ করছেন স্ত্রীর ম্যানেজার হিসেবে।

এমনই এক দম্পতি গল্প বলি। কেনিয়ার কাওয়ালে প্রদেশের সানডে রামাদান আর জেনেট ওয়াম্বুই। মেঘলা সকালে রামাদানকে দেখা গেল সবুজ জামা আর কালো শর্টস পরিহিত অবস্থায়। পেটা শরীর, আর দশজন পরিশ্রমী আফ্রিকানের যেমন হয়ে থাকে। টেবিলে ব্রেকফাস্ট রেডি, স্ত্রী জেনেট ওয়াম্বুই গ্লাসে পানি ঢেলে নিজেও বসলেন। খানিকটা তাড়াহুড়ো দুজনের মধ্যেই। উইকেন্ড শুরু হচ্ছে আজ থেকে, যার যার ক্লায়েন্ট ধরতে হবে দুজনকেই। রামাদান আর জেনেট দুজনেই যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করেন, তবে পুরুষ হওয়ায় রামাদানের কাজের পরিমাণ জেনেটের চাইতে খানিকটা কম। মাঝেমধ্যে তো ক্লায়েন্টই খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে জেনেট প্রতি সপ্তাহেই কাউকে না কাউকে পেয়ে যান।

জেনেট দুইদিন আগেই দশদিনের একটা ট্যুর থেকে ফিরেছে। জার্মান এক ট্যুরিস্ট ভাড়া করেছিল তাকে। মাওয়েনি নামের যে তাদের বসবাস, সেখান থেকে বেশ কয়েক মাইল দূরে একটা বিলাসবহুল রিসোর্টে তাকে নিয়ে গিয়েছিল লোকটা। সেখানেই দশদিন কাটিয়ে ফিরেছে সে। টাকাকড়িও মন্দ দেয়নি ওই শ্বেতাঙ্গ লোকটা, এই টাকার জন্যেই তো এই পথে আসা! রামাদান স্ত্রীর এই কাজে রাগ করতে পারে না, রাগ করার মতো অবস্থা আসলে নেই। অনন্যোপায় হয়েই দুজনে মিলে এই রাস্তাটা খুঁজে বের করেছে। ঘরে টাকা আসছে, খানিকটা স্বাচ্ছ্যন্দে বেঁচে থাকা যাচ্ছে, এইটুকুতেই পেছনের গল্পগুলো ভুলে যেতে চায় দুজনে।

রামাদান আর জেনেটের বিয়ে হয়েছিল প্রায় বিশ বছর আগে। শুরুটা এরকম ছিল না মোটেও। রামাদান কৃষিকাজ করতো, সংসারে অভাব ছিল, তবে সেটা পতিতাবৃত্তিতে জড়ানোর মতো ভয়াবহ পর্যায়ে যায়নি তখনও। কিন্ত খরায় ফসল নষ্ট হলো কয়েক মৌসুম, ক্ষেত ছেড়ে সাগরে পাড়ি জমিয়েছিল রামাদান, মাছধরা নৌকায় কাজ নিয়েছিল। ততদিনে ওদের কোলজুড়ে সন্তান এসেছে। কিন্ত ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করানোর সময় দেখা গেল, আধপেটা খেয়ে দিন চালিয়ে নেয়া গেলেও, রামাদানের এই আয়ে ছেলের পড়াশোনা চলবে না কোনভাবেই। ঠিক ওই সময়েই রামাদানের পরিচয় হয় ড্যান নামের এক জার্মান পর্যটকের সঙ্গে।

মোম্বাসা থেকে ত্রিশ কিলোমিটার দূরের কাওয়ালে শহরের সাগরতীরে একটা জায়গায় কাপড় বিক্রি করছিল রামাদান, সেই জার্মান পর্যটক কিছুক্ষণ কথাবার্তা বললো তার সঙ্গে। ট্যুরিস্টদের আনাগোনা থাকায় এখানকার লোকজন মোটামুটি ইংরেজী বলতে পারে, রামাদানও ভাষাটা রপ্ত করে নিয়েছে প্রয়োজনের তাগিদেই; এমনকি জার্মান ভাষাতেও সে ভালোভাবেই কথা বলতে পারতো। কথায় কথায় ড্যান জানালো, সে বেশ কয়েকদিন এখানে থাকবে, এবং এই কয়েদিনের জন্যে তার একজন নারী সঙ্গীর প্রয়োজন। সে বেশ ভালো অঙ্কের একটা টাকা এজন্যে খরচ করতে রাজী আছে, যে অঙ্কটা রামাদানের জন্যে বিশাল কিছু।

সেদিন বাড়ি ফিরেই স্ত্রী জেনেটকে সব খুলে বললো রামাদান। স্ত্রীকে বোঝালো কিছুক্ষণ, সেই লোকের সিস্টার হিসেবে কাজ করার কথা বলেছিল সে। প্রস্তাবটা নিয়ে কয়েকদিন ভাবার পরে জেনেট রাজী হলো। ওয়াইম্বু বলছিলেন- “আমি দেখেছি আমার আশেপাশের অন্য নারীরা এই পেশায় প্রবেশের মাধ্যমে তাদের জীবনে কি দারুণ পরিবর্তন এনেছে। অথচ আমি শুধু পরিবারের টুকটাক কাজ করতাম, গৃহিনীর কাজে তো কোন আয়-উপার্জন নেই। রামাদানের স্বল্প আয়ের উপর আমাকে নির্ভরশীল থাকতে হতো।”

“আমার স্বামী খুবই স্বল্প আয় করতো, আর সেটার উপর নির্ভর করে আমাদের জীবন খুব কষ্টে চলত। সেদিন বিকেলে বাড়িতে ফিরে যখন ও আমাকে এই কাজের প্রস্তাব দিলো, আমার আর কোন পথ ছিল না। আমি অনেক ভেবেছি, তারপরেই হ্যাঁ বলেছি। আমি ওর প্রস্তাবে এই কাজ করতে রাজি হয়েছিলাম, কারণ আর কোন উপায় ছিল না আমাদের হাতে। আমার পরিবার এখন তিন বেলা খেতে পারে। আমরা আমাদের ছেলে মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে পারি।”

কেনিয়ার মাওয়েনি গ্রামের কাছের এই দায়ানী বিচ, যেখানে রামাদান-জেনেট দম্পতির বসবাস, সেটা গতবছর ট্রিপ-অ্যাডভাইজরের মতে আফ্রিকার সপ্তম সেরা দ্বীপ নির্বাচিত হয়েছে পর্যটকদের ভোটে। পর্যটকের পরিমাণটা বাড়ছে দিনদিন। আর সেটা রামাদানের জন্যে খুশীর কারণ। স্বাভাবিক সপ্তাহগুলোতে মেইল এসকর্ট হিসেবে প্রতি উইকেন্ডে সে চল্লিশ-একশো ডলার পর্যন্ত আয় করে থাকে। আর জেনেটের আয় একশোর ওপরে থাকে প্রতি উইকেন্ডে। কোন উৎসব বা বড়দিনের মতো উপলক্ষ্য হলে সেটা চার-পাঁচগুণ বেড়ে যায়।

ওরা যে বাড়িটাতে ভাড়া থাকে, প্রতি মাসে সেটার ভাড়া দিতে হয় আশি ডলার করে। তিনটে সন্তানের বাবা মা ওরা এখন, সবাই স্কুলে যায়, পড়াশোনা করে। দুজনের আয়ে মোটামুটি চলে যায় ওদের জীবন, মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করার সামর্থ্য এখন আছে ওদের।

জেনেট জানেন, যে কাজটা ওরা করছেন, এটা হয়তো ভদ্র সমাজে মেনে নেয়ার মতো নয়। কিন্ত শখ করে তো আরর এই কাজে নামেনি ওরা। তার মতে- আমি শুধু একটু উন্নত জীবনের জন্যেই এই পেশায় জড়িয়েছি। অনেকের চোখে এটা হয়তো অনৈতিক, কিন্ত আমার স্বামী যখন আমাকে সমর্থন করছে, তখন এতে আমি দোষের কিছু দেখি না।

কেনিয়ার উপকূলবর্তী শহরগুলোতে এই গল্পগুলো নতুন কিছু নয়। প্রতিটা শহরে, প্রতিটা গ্রামে আপনি এমন গল্পের খোঁজ পাবেন, রামাদান-জেনেটের মতো দম্পতিরা সব জায়গাতেই আছেন। দারিদ্র‍্যতার কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে যারা অর্থ উপার্জনের জন্যে এই পথটা বেছে নিতে বাধ্য হন। তবে তারা ইউরোপিয়ান ট্যুরিস্টদের জানতে দেন না যে নিজেদের স্ত্রীদেরই তাদের হাতে তুলে দিচ্ছেন তারা। রামাদান যেমন জেনেটকে সেই জার্মান পর্যটকের কাছে নিজের দুঃসম্পর্কের বোন হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। রামাদানের কথা হচ্ছে- “আমার ঘরে একজন মহিলা থাকতে আমি কেন অন্য কাউকে টাকা আয়ের সুযোগ করে দেব? অভাবী তো আমি, টাকার দরকার আমার। এটা আমাদের কাছে কিছু নগদ অর্থ আয়ের দারুণ একটা সুযোগ।”

তথ্যসূত্র- আল জাজিরা, আফ্রিকান এক্সপোনেন্ট ডটকম, আফ্রিকা ফিডস।

Comments
Spread the love