একটা কিশোর যখন তার প্রথম ‘আউট’ বই হিসেবে হিমুর হাতে পাঁচটি নীলপদ্ম পড়ে, তখন তার মাথা খারাপ হওয়া স্বাভাবিক। খুব স্বাভাবিক। এমনই মাথা খারাপ হলো যে সেই কিশোর আর হুমায়ুন আহমেদ নামক ট্রমা থেকে বেরুতে পারলো না। সারা জীবন আউট বই বলতে হুমায়ুন আহমেদকেই বেছে নিল। অন্য কোন কিছুই আর তাকে টানে না। তা যত ভালোই হোক না কেন!একারনেই কিছু পড়ার ইচ্ছে হলেই আপনার লেখা বই যে বই ইতিমধ্যে ২৫-৩০ বার পড়া শেষ করেছি, আবার সেটাই পড়ি।

মধ্যবিত্ত বাঙালী পৃথিবীর সবচেয়ে কম্পলিকেটেড বস্তু। কী সুন্দর সাবলীলভাবেই না আপনি উপস্থাপন করলেন আমাদের।আমার, আমাদের চারপাশে বেঁচে থাকার, আনন্দে থাকার যে এত সব উপকরণ আছে আপনি না থাকলে জানতামই না স্যার।

— হ্যালো এটা কি রেলওয়ে বুকিং?
–না আপনার রং নাম্বার হয়েছে।
— এক্সকিউজ মি! রুপা কি জেগে আছে?

এই লাইন তিনটা আমি ক্লাস চলাকালীন পড়ে এত জোরে হেসে দিয়েছিলাম যে এ কারনে শাস্তি পেতে হয়েছিল।স্যার বেতের বারি মারছিল আর আমি দম বন্ধ করে হাসি আটকানোর চেষ্টা করছিলাম।

স্যার আপনার হিউমার! এ নিয়ে শত শত লাইন লেখা হলেও কম লেখা হবে!

আমাদের বয়সী প্রতিটা ছেলেই জীবনের কোন না কোন সময়ে কিছুক্ষণের জন্য হলেও নিজেকে হিমু ভেবেছে।আপনি ভাবতে বাধ্য করিয়েছেন।সারা জীবন হিমু পড়ে আমার মনে হয়েছে সে প্রচণ্ড আবেগী একজন কিন্তু কোন এক কারনে সে তার আবেগ প্রকাশ করে না।

হিমু হওয়া খুব কঠিন কিন্তু হিমুর দু একটা গুন তো থাকতেই পারে। আমি মনে করতাম এই গুনটা (কিংবা দোষ) আমার মধ্যে প্রবল ভাবে আছে!

মুক্তিযুদ্ধ গল্প আকারে বলে এর প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা কেউ করেনি। এমন সব ভারিক্কি টাইপ লেখা পেতাম যে ইচ্ছা থাকলেও আগ্রহ শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা যেত না। এমন সময়ে হাতে পেলাম জোসনা ও জননীর গল্প।

এই বইটা আমি ইচ্ছে করে এক বসায় শেষ করিনি। প্রতিদিন একটু একটু করে পড়তাম।এমন ভাবেই ভিতরে ঢুকে গিয়েছিলাম যে প্রতিদিনের পড়া শেষ করে যখন বাইরে বের হতাম তখন চারিদিকে তাকিয়ে মনে হত দেশে কারফিউ চলছে।এই বুঝি হানাদার বাহিনী আসছে।রুমি হয়ত এসে ব্রাশ ফায়ার করে সবাইকে মেরে ফেলবে।

একদিন পড়া শেষ হল। শেষদিকের বিবরণটা ছিল অনেকটা(পুরোটা লাইন বাইই লাইন মনে নাই) এরকম “এই দেশের আনাচেকানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নাম না জানা দেশের সাহসী সন্তানদের কবর।কোন এক জোসনা রাতে চাঁদের আলো তাদের ঢেকে ফেলে আর বলে আহারে! আহারে!! আহারে!!

ওই যে বলেছিলাম আমার মধ্যে হিমুর ঐ গুণ বা দোষটা আছে কিন্তু সে দিন বুঝেছিলাম আসলে তেমন কিছু আমার মধ্যে নাই।এত এত এত বেশি মন খারাপ হয়েছিল যে লিট্রেলি আমি কাঁদছিলাম এবং কান্না থামানোর কোন চেষ্টাই সেদিন কাজ করছিল না!বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছি আর টপটপ করে পানি পড়ছিল চোখ থেকে!

আমি ভাগ্যবান আমি বাংলা পড়তে জানি আর আপনি সেই বাংলাতেই লিখতেন। নয়তো জীবনটাকে হয়ত এভাবে উপভোগই করা হতো না।

শুভ জন্মদিন স্যার।

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো