আমার ছোট ভাই সায়েন্স ফিকশন লেখক এবং শিক্ষক জাফর ইকবালকে এক ছেলে পেছন থেকে ছুরি মেরেছে।

বিষয়টা আমাকে যতটা কষ্ট দিয়েছে তারচে বেশি বিস্মিত করেছে। এতটুকু একটা ছেলে কী কঠিন ব্রত নিয়ে এত মানুষের মাঝে এরকম নির্মম একটা কাজ করল। ছেলেটা বেহেশতে যেতে চায়।

আমি ছেলেটার চেহারা দেখলাম। ছাত্রদের পিটুনি খেয়ে মাটিতে পড়ে আছে। চেহারায় মায়া নেই। আঘাতপ্রাপ্ত যে কোনও মানুষ দেখলে মায়া হয়, তারটায় হচ্ছে না। সে হয়তো নামাজও পড়ে না। নামাজি মানুষের মধ্যে একটা আলাদা আলো থাকে। তার তাও নেই।

তার ভেতরে আছে ক্রোধ। ঘৃণা। ভালোবাসা ও ঘৃনা দুটোই মানুষের চোখে লেখা থাকে। তার চোখেও ঘৃণা লেখা আছে। তার চোখে কেউ এই লেখা লিখে দিয়েছে। সে ভালো করে না পড়েছে জাফর ইকবালের বই, না পড়েছে কোরআন।

পৃথিবীজুড়ে গত কয়েক বছরে বেহেশতে যাওয়ার কিছু শর্টকাট পদ্ধতি আবিস্কৃত হয়েছে। বেহেশত খুব লোভনীয় করে তুলে ধরা হচ্ছে আমাদের কাছে। আমরা যেহেতু ধর্মকে সময় দিতে পারছি না, তাই ধর্ম পালন না করে বেহেশতে যাবার পদ্ধতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ছি।

ধর্মের সৌন্দর্য বর্ণনার চেয়ে বেহেশতের সৌন্দর্যের কথা বলে ব্রেইনওয়াশ করে ফেলছে এই ছোট ছোট ছেলেদের।
ফেসবুকে ‘আমীন’ লিখার আহবান সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

জাফর ইকবাল মাথায় আঘাত পেয়েছে। মস্তিষ্ক, নিউরণ নিয়ে তার অসংখ্য সায়েন্সফিকশন আছে। আমি জানিনা তার আঘাতের ব্যাখ্যা সে কিভাবে দেবে।

আমি তার সায়েন্সফিকশন পড়েছি। উপভোগ্য। আমি সায়েন্স ফিকশন লিখতে পারিনা।  আমার সায়েন্সফিকশনে সায়েন্স থাকেনা, মানবিকতা চলে আসে।

আমি এমন আঘাত পেলে হয়তো আমার মায়ের কাছে যেতে চাইতাম। অথবা বলতাম, মাকে আমার অপারেশন থিয়েটারে বসিয়ে রাখো।

মা থাকলে ভয় থাকবে না। অসহায় সন্তানের কাছে মায়ের উদ্বিগ্ন মুখ ওষুধের কাজ করে। সন্তানের ধারণা হয়, মায়ের এই মুখ দেখে স্রষ্টা সব সারিয়ে দেবেন। দেনও হয়তো।

কোনও নার্স মা’কে রুম থেকে সরিয়ে দিতে চাইলে মালিকের কাছে বিচার দেবার ভয় দেখাতাম। নিশ্চয়ই ভয়ও পেতো।

আমার মনে হয়, এই দেশের সব হাসপাতালের মালিকের বাসায় আমার দুয়েকটা বই আছে। পড়ে না হয়তো। রেখে দেয়। ধনী লোকের বাসায় বই জ্ঞানের আলো ছড়াতে পারেনা। ড্রয়িংরুমের লাইটের আলোই বইগুলোকে জিম্মি করে রাখে।

জাফর ইকবাল নিশ্চয়ই সুস্থ হয়ে যাবে। তার কী তখন মৃত্যু ভয় এসেছিলো? সে শক্ত মানুষ। হয়তো আসেনি। আমার আসতো। আমি মৃত্যুর পরের জীবন নিয়ে খুব আগ্রহী। কিন্তু ভয় লাগে।

ভয় আর আগ্রহ এক সাথে চলতে পারেনা। তাই সে জগত নিয়ে আমি ভাবতে পারিনা বেশি। আমি জাফর ইকবাল নিয়ে ভাবি। এই দেশ নিয়ে ভাবি।

কেনো তার মতো একটা পরিপাটি ভদ্র মানুষকে তারা মেরে ফেলতে চায়? সে তো এই দেশে এসেছিলো সব মোহ ত্যাগ করে। সে তবে কাদের মোহ নিয়ে টান দিয়েছে যা তারা মানতে পারছে না?

[ বেশ কদিন ধরে মনে হচ্ছিলো, হুমায়ূন আহমেদ বেঁচে থাকলে জাফর ইকবালের এই ঘটনা নিয়ে কী লিখতেন। ভাবতে ভাবতে লিখে ফেললাম ] 

লেখক- ইশতিয়াক আহমেদ

Comments
Spread the love