ভাগ্যিস ১২১ বছর আগে এই দিনটা এসেছিল!

Ad

মূল গল্পে যাওয়ার আগে একটু একটু বইয়ের ভাষায় কিছু কথা জানিয়ে রাখি।

‘সিনেমা’ শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ কিনেমা থেকে। কিনেমা শব্দটির অর্থ গতি। স্পেনের প্রাচিন গুহা আলতামিরার দেয়ালে বাইসনের বেশ কিছু ছবি আবিষ্কৃত হয়েছিল। সেখানে এমন একটি বাইসন দেখা যায় পা ছিল ছয়টি। একটি বাইসনের পা কখনই ছয়টি হওয়ার প্রশ্ন আসে ন, বাইসনের পা চারটি। তাহলে ছয়টি পায়ের ধারণা কীভাবে আসলো প্রাচীন মানুষের মাথায়? বাইসন যখন দৌড়ায় তখন তাকে খালি চোখে দেখলে মনে হয় তার পায়ের সংখ্যা বেড়ে গেছে। যেই শিল্পী প্রাচীনকালে এই ছবি এঁকেছিলেন, তিনি যা দেখেছেন সেটাই এঁকেছিলেন। সেই শিল্পী বাইসনের গতির রূপটা ধরতে চেয়েছিলেন। আর এই গতিকে ধরাই হচ্ছে সিনেমার মূল সূত্র।

সিনেমা বিজ্ঞানের একটি সূত্র মেনে চলে আর তা হচ্ছে অবিরত দৃষ্টিতত্ত্ব বা ইংরেজিতে বললে persistence of vision. সহজভাবে এই সূত্রকে বাংলাতে ব্যাখ্যা করতে গেলে যা হয়, সেটা হচ্ছে- আমরা যখন একটি জিনিস দেখি এবং সেটা থেকে চোখ সরিয়ে অন্য আরেকটি জিনিস দেখি ; এই দুইটার মাঝে আমাদের চোখে সামান্য সময়ের জন্য হলেও ( সেকেন্ডের ১০ ভাগের এক ভাগ) প্রথমে দেখার জিনিসটির রেশ লেগে থাকে। সিনেমাতে পর পর সাজানো এক একটা শট থেকে আরেকটা শোতে দর্শককে টেনে নিয়ে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক ভিত্তিটা হচ্ছে এই অবিরত দৃষ্টিতত্ত্ব। এতিয়েন মারে নামক একজন ক্যামেরাম্যান ফটোজ্ঞান নামে রিপিট শট রাইফেলের মত এক ধরনের ক্যামেরা আবিষ্কার করেছিলেন যা দিয়ে পর পর গুলি ছোঁড়ার ভঙ্গিমায় এক সঙ্গে পর পর একাধিক ফ্রেম শুট করা সম্ভব ছিল। সেই ক্যামেরা এখন আর ব্যবহৃত হয়না কিন্তু “শুটিং” শব্দটার উৎপত্তি সেখান থেকেই।

এবার মূল গল্পে চলে যাই-

ফ্রান্সের লিয় শহরের চিত্রশিল্পী অ্যাঁতোয়া লুমিয়ের নিজের এই পেশা দিয়ে তখন খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলেন না। মন কে তৃপ্ত করতে পারলেও, পেট কে আনন্দ দিতে পারছিলেন না। ফলাফলস্বরূপ হুট করেই সিদ্ধান্ত নিলেন- ছবি আঁকা ছেড়ে দিবেন। ছবি আঁকানো বাদ দিয়ে ফটোগ্রাফিক মাল মশলা তৈরি এবং এর সরবরাহ দেয়ার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান খুলে বসলেন। এটাই সম্ভবত তার জন্য শাপে বর হল। কারণ ছবি আঁকানো ছেড়ে ফটোগ্রাফি নিয়ে নাড়াচাড়া না করলে সিনেমা আবিষ্কার করতে সম্ভবত আরও বেশ দেরি হত। যদিও সিনেমার আবিষ্কারের ক্ষেত্রে তার নাম তেমন শোনা যায়না- শোনা যায় তার দুই ছেলের নাম- অগুস্ত লুমিয়ের আর লুই লুমিয়ের। কিন্তু অ্যাঁতোয়ার মত পিতা পাওয়া তাদের জন্য বেশ ভাগ্যের ব্যাপার ছিল- সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।

ছবি আঁকা ছেড়েছিলেন অ্যাঁতোয়া, কিন্তু নিজের শিল্পীসত্ত্বাকে বিসর্জন দেননি। ক্যামেরার সাথে থাকতে থাকতে নিজের চেষ্টায় একদিন তিনি বেশ ভাল ফটোগ্রাফার হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেন। নিজের অক্লান্ত পরিশ্রমে নিজের ফটোগ্রাফির প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি গড়ে তুললেন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফটোগ্রাফিক কারখানা হিসেবে। সবচেয়ে বড় কারখানা- নিউইয়র্কের জর্জ ইষ্টম্যানের ইষ্টম্যান কোডাক কোম্পানির পরেই ছিল এর অবস্থান। অ্যাঁতোয়ায় দুই ছেলে তাদের বাবাকে সাধ্যমতো সাহায্য করতেন। বড় ছেলে মূলত ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করতেন আর ছোট ছেলে লুই পদার্থবিজ্ঞানের নতুন সব সূত্র নিয়ে মেতে থাকতেন।

১৮৮৮ সালে টমাস আলভা এডিসন আর ডব্লিউ কে এল ডিকসন মিলে মিলে কিনোটোস্কোপ আবিষ্কার করলেন। পঞ্চাশ ফুট দৈর্ঘ্যের চলমান ছবি এই যন্ত্র দিয়ে দেখা যেত, তবে বিশাল আকৃতির এই যন্ত্রে কেবলমাত্র একজন ছবি দেখতে পারতেন। ১৮৯৪ সালের গ্রীষ্মে টমাস কিনোটোস্কোপ এর প্রদর্শনীতে অ্যাঁতোয়াকে আমন্ত্রন জানালেন। অ্যাঁতোয়া এরকম অসাধারণ জিনিস দেখে একই সাথে আনন্দিত আর বিস্মিত হলেন। সাথে এর থেকে বড় কিছু করার তাড়না তাকে বারবার ঘিরে ধরতে লাগলো। নিজ শহরে এসে নিজের দুই সন্তানকে তিনি এই যন্ত্রের ব্যাপার ব্যাখ্যা করে বললেন- তোমরা এর থেকে ভালো কিছু করার চেষ্টা কর। আমি তোমাদের সাথে আছি।

বাবার ইচ্ছা আর অনুপ্রেরণা দুই ভাইয়ের মাঝে যেন নতুন উদ্যম তৈরি করল। বিশেষ করে লুইয়ের মনে যিনি পদার্থবিজ্ঞানকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। দীর্ঘ পরিশ্রমের পর তিনি এক ধরনের ক্যামেরা আর প্রোজেক্টর যন্ত্র আবিষ্কার করতে সক্ষম হন। এই দুটো যন্ত্রের ফিনিশিং বলতে গেলে তিনি এক রাতের মাঝেই করেছিলেন। সিনেমা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে তাই অনেকে লুইকেই বেশি ক্রেডিট দিতে চান। বড় ভাই অগুস্ত ও এই জিনিসটা বিনয়ের সাথে স্বীকার করে নেন। সে রাতে লুই অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। প্রচণ্ড মাথা ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন তিনি। কিছুক্ষণ পর পর দুঃস্বপ্ন দেখছিলেন। হয়তো সৃষ্টির বেদনার কারণেই!

লুমিয়ের ভাইরা তাদের প্রথম সিনেমা শুট করেছিলেন ১৮৯৫ সালের ১৯ মার্চ। ১৫ থেকে ২০ মার্চের মাঝে তারা তাদের প্রথম সিনেমার কাজ শেষ করেন। সিনেমার নাম ছিল ওয়ার্কার্স লিভিং দ্যা লুমিয়ের ফ্যাক্টরি। ১৫ থেকে ২০- এই ছয়দিনের ১৯ তারিখ ছাড়া বাকি সবদিন বৃষ্টি হয়েছিল, সুতরাং ধারণা করা যায় ঐদিনই পৃথিবীর প্রথম সিনেমার শুটিং হয়েছিল। মাত্র ৪৬ সেকেন্ডের এই সিনেমাতে দেখা যায়। লুমিয়েরদের কারখানা থেকে শ্রমিকেরা বের হচ্ছে যাদের বেশিরভাগই নারী শ্রমিক। মজার ব্যাপার হচ্ছে, কারখানা থেকে বের হওয়ার সময় তারা কেও ক্যামেরার দিকে তাকাননি। সম্ভবত তারা শুটিং এর ব্যাপারটি জানতেন তানাহলে এরকম জিনিস মেনে নেয়াটা কিছুটা কঠিনই বটে। নারী শ্রমিক ছাড়াও এই সিনেমাতে দেখা যায় একটি কুকুর, একটি বাইসাইকেল আর দুটো ঘোড়া। সুতরাং প্রথম চলচ্চিত্রে অভিনয় কোন নায়ক নায়িকা করেন নি, করেছিলেন- শ্রমিক শ্রেণী, কুকুর আর ঘোড়া। পরে লুমিয়ের ভাইরা একক শটের মোট ১৪২৫ টি সিনেমা নির্মাণ করেন, যার কোনটাই এক মিনিটের উপরে ছিল না।

 

তবে ১৮৯৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর অর্থাৎ আজকের দিনে পৃথিবীর প্রথম সিনেমা প্রদর্শন করা হয়। দুই ভাই প্যারিসের গ্রান্দ ক্যাফেতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথমবারের মত ২০ মিনিটের প্রোগ্রামে তাদের বানানো ১০ টি সিনেমার প্রদর্শন করেন। প্রথমদিকে তেমন মানুষদের ভিড় হয়নি, কিন্তু মাত্র কয়েকসপ্তাহে এই জিনিসের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পরে পুরো দুনিয়াতে। দুই ভাই যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছিলেন। তারা আগেই বেশ কিছু ক্যামেরা আর প্রোজেক্টর তৈরি করে রেখেছিলেন এবং নিজেদের বিশ্বাসী কিছু লোককে ক্যামেরা আর প্রোজেক্টরের কাজ শিখিয়ে রেখেছিলেন যাতে চাহিদামত তাদের বিশ্বের যেকোনো জায়গায় সিনেমা প্রদর্শনের জন্য পাঠাতে পারেন।

প্রথম যে সিনেমাটি দেখানো হয়েছিল, সেটি হচ্ছে- অ্যারাইভাল অফ অ্যা ট্রেন। আজকের দিনে চিন্তা করলে এটি তেমন কিছু ছিল না, কিন্তু তখনকার সময়ের জন্য এটি একটি মাস্টারপিস ছিল। প্ল্যাটফর্মে ট্রেন ঢুকছে আর মানুষ ট্রেন থেকে নামছে। ক্যামেরা এক জায়গায় স্থির ছিল। কিন্তু সিনেমার কম্পোজিশন আর ফ্রেমিং খুবই অসাধারণ ছিল। যেসব দর্শক এই সিনেমাতে দেখতে বসেছিলেন, ট্রেনকে প্ল্যাটফর্মে ঢুকতে দেখে তারা ভেবেছিলেন সেই ট্রেন আসলে সত্যিকারের এবং সেটি পর্দা থেকে তাদের দিকে অর্থাৎ বাস্তবে ছুটে আসছে। এটি চিন্তা করেই অনেকে চিৎকার করে বেরিয়ে যান সেখান থেকে। তাদের এই আচরণ শুনলে হাস্যকর লাগতে পারে, কিন্তু যারা জীবনে চলচ্চিত্র নামক জিনিসের নাম শুনে নি, চিন্তা করেনি এরকম কোন মাধ্যম হতে পারে, তাদের কাছ থেকে এরকম আচরণ একেবারে অপ্রত্যাশিত ও নয়!

এভাবে আস্তে আস্তে সিনেমা জনপ্রিয়তা পেতে লাগলো আর সেটি ছড়িয়ে পড়ল পুরো দুনিয়াতে। বাবা অ্যাঁতোয়া নিজের দুই সন্তানের সাফল্যে অনেক বেশি খুশি হলেন। তাদের আর অর্থাভাব থাকলো না। এই কারণে ১৯১১ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত অ্যাঁতোয়া ছবিই এঁকে গেছেন।

২৮ ডিসেম্বর তারিখটি সিনেমার ইতিহাসের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আজকে সিনেমা প্রদর্শনের ১২১ বছর পূর্তি। চলচ্চিত্রপ্রেমী সকল মানুষের কাছে এই দিনটির তাৎপর্য অন্য রকমের।   

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

Ad