নিজের বাবা আর চাচার সাথেই গাড়িতে উঠেছিল সাবা। গাড়িটা চলল নদীর দিকে। সাবা তখনও বুঝতে পারছেনা কী হতে যাচ্ছে। তবে বাবা আর আপন চাচার কাছে সে নিরাপদ, এমনটাই ভাবছিল হয়তো। নদীর তীরে থামল গাড়িটি। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সাবা কে পরপর দুটি গুলি করল তার পিতা। এরপর সাবার নিথর দেহটি ভাসিয়ে দিল নদীতে। ঘটনার পরপরই গ্রেফতার করা হয় এই দুজনকে। আদালতে সাবার পিতা বলে, “মর্যাদা এবং সম্মানের জন্য আমি সারাজীবন জেলে কাটাতে রাজি আছি।” কিন্তু তাদের সারাজীবন জেলে কাটাতে হয়নি, কিছুদিন পরই মুক্তি পেয়ে যায় তারা এবং গর্ব সহকারে নিজের কন্যাকে গুলি করার কথা স্বীকার করে বেড়ায়। তার দাবি এতে করে সমাজে তার মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। মর্যাদার জন্য তারা যেকোন কিছু করতে পারে!

ঘটনাটি ঘটেছিল হাফিজাবাদ, পাকিস্তানে। ১৯ বছর বয়সী সাবার অপরাধ ছিল পরিবারের অমতে গিয়ে একটি ছেলের সাথে প্রেম এবং এরপর কোর্টে গিয়ে বিয়ে করা। পরিবারের ‘সম্মান রক্ষার জন্য’ তাই সাবাকে হত্যার চেষ্টা করে তার পিতা, এই ধরণের ঘটনা পরিচিত ‘অনার কিলিং’ নামে এবং পাকিস্তানে খুব সাধারণ একটি ঘটনা এই ‘অনার কিলিং’ যার মানে দাঁড়ায়- সম্মান/মর্যাদা রক্ষার্থে খুন। কেবল ২০১৪ সালেই পাকিস্তানে অনার কিলিং এর শিকার হয়েছে ১০০৫ জন নারী, যার সব গুলোর কথা জানাও যায় না। ২০১২ সালে এক কিশোরীকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করে তার বাবা, অপরাধ ছিল এলাকার এক কিশোরের দিকে তাকানো! ২০১৭ সালে কেবল মাত্র পাখতুনেই ৯৪ জন নারী অনার কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন। পাকিস্তান মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী বিগত দশকে প্রতি বছর গড়ে ৬৫০ অনার কিলিং এর ঘটনা ঘটেছে! (তথ্যসূত্র-দি গার্ডিয়ান)।

আরও একটি ভয়ংকর ঘটনার কথা জানা যায়, ৫ জন মেয়ে ও ৩ জন পুরুষকে হত্যা করা হয়, কারণ এরা একসাথে পিকনিকে গিয়ে হাত-তালি দিতে দিতে গান করছিল! পুরুষরাও সেখানে অনার কিলিং এর শিকার হয়, কিন্তু নারীদের তুলনায় সেটা বেশ কম। তবে সবথেকে ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটে খোদ পাকিস্তানের হাইকোর্ট প্রাঙ্গনে।

ফারজানা পারভিন নামক এক নারীকে হাইকোর্টের সামনে পাথর মেরে মেরে হত্যা করে তার পরিবারের সদস্যরা, যাদের মধ্যে ছিল তার নিজের বাবা এবং ভাই। ফারজানা পারভিন সে সময় গর্ভবতী ছিলেন, তার অপরাধ ছিল পরিবারের অমতে গিয়ে একজনকে বিয়ে করা! এই ঘটনাটি বিশ্বে আলোড়ন তুলেছিল এবং প্রথমবারের মতো পাকিস্তানে এই অনার কিলিং এর বিরূদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছিল।

অনার কিলিংয়ের পর অপরাধী গ্রেফতার হলেও যে কারণে শাস্তি হয় না তার কারণ শরীয়া আইনের বড় একটা ফোকর। শরীয়া আইনে ‘ব্লাড মানি’ বলে একটা ব্যাপার আছে। অর্থাৎ খুনী নিহতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে পারে এবং নিহতের পরিবার যদি তাকে ক্ষমা করে দেয় তাহলে সে মুক্তি পেয়ে যায়। যেহেতু অনার কিলিং গুলো একটি পরিবারের মধ্যেই সংগঠিত হয়, তাই দেখা যায় বাবা অপরাধী হলে মা তাকে ক্ষমা করে, ভাই অপরাধী হলে মা-বাবা তাকে ক্ষমা করে। ফলে অপরাধীর আর শাস্তি হয় না, উল্টো এই কাজকে তারা সঠিক বলে মনে করে! সাবার বাবা পরে বলেছিল এই কাজে তার সমাজে সম্মান বেড়ে গিয়েছে, তার অন্য মেয়েদের জন্য অনেক ভালো ভালো জায়গা থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসছে!

এই ঘটনা দিয়ে বোঝা যায় সামাজিকভাবেই ব্যাপারটার একটা গ্রহণযোগ্যতা সেখানে আছে! কারণ এই বর্বর সমাজে নারীদেরকে গণ্য করা হয় সম্পত্তি হিসেবে, সেখানে নারীদের কোন স্বাধিনতা নেই। পরিবারই ঠিক করে দেয় একটি মেয়ে কাকে বিয়ে করবে, সেখানে তাদের মতামতের কোন বালাই নেই। কিন্তু শ্বাশ্বত ভালবাসার অনুভূতি তো সবজায়গাতেই এক। তাই যে নারীরা সাহস করে নিজের পছন্দ মত বিয়ে করে তাদের অনেকে এই বর্বরতার শিকার হয়। আমরা দেখেছি, শুধু বিয়ে না, কেবলমাত্র অপরিচিত কারও দিকে তাকানোও তার জীবন সংশয়ের কারণ হতে পারে। পাকিস্তানের মত বর্বর দেশে এবং শরীয়া আইনের মত আইনের ছত্রছায়ায় এধরণের অপরাধ এসকল দেশকে নরকে পরিণত করেছে।

আমাদের দেশেও বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের স্বাধীনতা এখনও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। শিক্ষিত পরিবার এবং শিক্ষিত মেয়েদের ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা আশাব্যাঞ্জক হলেও অনেক স্থানেই পরিবার যাকে ধরে এনে দেয় তাকেই বিয়ে করতে বাধ্য হয় একটি মেয়ে। তবে আমাদের দেশে পাকিস্তানের মতো না হলেও খুব সামান্য কিছু অনার কিলিং এর খবর পাওয়া যায়। যে সকল দেশে অনার কিলিং হয় বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি, এই তালিকাতে আমেরিকা-ইংল্যান্ডের নামও আছে। আর এগুলো সংগঠিত হয় মূলত ধর্মান্ধদের দ্বারা। তবে এসকল দেশে আইন কঠোর হওয়াতে এবং শরীয়া আইন না থাকাতে এই মাত্রা অনেক কম। ভারতেও ধর্মান্ধদের দ্বারা অনার কিলিং এর ঘটনা কম নয়, তবে পাকিস্তান সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। আইনে বড়সড় ফাঁক থাকার কারণে।

পাকিস্তানের শিক্ষিত তরুণ অংশটি অবশ্য এর বিরূদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে। সাবার ঘটনাট বিশ্বের নজরে আনাই তার প্রমাণ। সাবার এই ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত শর্ট ডকুমেন্টারি ‘A GIRL IN THE RIVER: THE PRICE OF FORGIVENESS’ ২০১৬ সালে জিতে নিয়েছে অস্কার, সেরা শর্ট ডকুমেন্টারী ক্যাটাগরিতে। ডকুমেন্টারিটির নির্মাতা শারমিন ওবায়েদ অস্কার প্রাপ্তির পর বলেন,

“এই ডকুমেন্টারীটি একাডেমি অ্যাওয়ার্ড লাভ করায় অনার কিলিং ইস্যু, যা কিনা শুধু পাকিস্তানি মহিলাদের না, সমগ্র বিশ্বের মহিলাদের ক্ষতির কারণ, সেটা সকলের নজরে আসবে।”

এই নির্মাতা ২০১২ সালেও সেরা ডকুমেন্টারী ক্যাটাগরিতে অস্কার লাভ করেছিলেন, সেটাও নির্মিত হয়েছিল পাকিস্তানি মহিলাদের দুর্দশা নিয়েই। পাকিস্তানের মত অন্ধকার বর্বর দেশে মালালা, শারমিন ওবায়েদরা এখনও একটু একটু করে আশা জাগিয়ে রাখছেন, এটা পাকিস্তানের জন্য আশার কথা।

ভাগ্যিস, আমরা পাকিস্তান থেকে রক্তাক্ত সংগ্রাম করে আলাদা হয়ে এসেছিলাম! তবে পাকিস্তানি চিন্তা চেতনা এখনও আমাদের দেশের অনেকের শিরায় শিরায় বিদ্যমান। মাঝে মধ্যেই পাকিস্তানের পক্ষে নগ্ন উল্লাস, ক্রিকেটে তাদের সমর্থন আর শরীয়া আইনের দাবিতে কিছু উন্মাদের আস্ফালন সেটাই প্রমাণ করে বৈকি!

[ফুটনোটঃ ওই ঘটনায় সাবা প্রাণে মারা যায়নি। নদীতে তার দেহ ভেসে বেড়ানোর পর একদল লোক তাকে উদ্ধার করে। তার মাথায় গুলি করা হলেও শেষ মুহুর্তে মাথা সড়িয়ে নেয়াতে গুলি তার মুখমন্ডল ভেদ করে চলে যায়। পরবর্তীতে সমাজকর্মীদের সহায়তায় সাবার চিকিৎসা হয় এবং সে নতুন জীবন শুরু করে, সেই ছেলেটির সাথেই। শারমিন ওবায়েদ যখন পুরষ্কার নিচ্ছেন তার কিছুদিন আগে পুত্র সন্তানের জন্ম দেন সাবা, তার স্বপ্ন ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করা। আমরা সাবা এবং তার সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করি।

দি গার্ডিয়ান পত্রিকায় শারমিন ওবায়েদের সাক্ষাৎকার পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

ইউটিউবে দেখে নিন এক ঝলক-

Comments
Spread the love