ভারতে সমকামিতা বৈধ ঘোষণার পর এটি নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে সর্বমহলে। দেড়শো বছরেরও বেশি পুরানো ৩৭৭ ধারা বাতিল করে এই ঐতিহাসিক রায়টি দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। কী ছিল ৩৭৭ ধারাতে? ঔপনিবেশিক আমলে হওয়া এই আইন অনুযায়ী সমলিঙ্গের মানুষ যৌন সম্পর্ক করলে সেটি অপরাধ বলে বিবেচিত হবে, যার শাস্তি যাবজ্জীবন কিংবা দশ বছরের জেল, সাথে জরিমানাও থাকতে পারে।

কিন্তু, এই ধারার বিরুদ্ধে অনেকদিন ধরেই ভারতের সমকামিতা সমর্থনকারীরা লড়াই করে আসছিলেন। ১৯৯৪ সালে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রথম ৩৭৭ ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে। যদিও সেটা বেশিদিন টেকেনি। ১৯৯৮ সালে ভারতে দীপা মেহতার সিনেমা ‘ফায়ার’ সিনেমায় একটি দৃশ্যের কারণে সমকামিতা আবারো ব্যাপক আলোচনায় আসে ভারতে। সিনেমায় দেখানো হয়, দুই প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজেদের স্বামীকে ছেড়ে পরস্পরের প্রেমে জড়িয়ে পড়েন।

২০০১ সালে আবারও ৩৭৭ ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে মামলা হয়। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা নাজ ফাউন্ডেশন প্রথম এই আইনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দিল্লি হাইকোর্টে মামলা করে। এটি নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে বিভিন্ন মতবাদ আসতেই থাকে। অতঃপর ২০০৯ সালের দিকে যখন হাইকোর্ট ৩৭৭ ধারা মানবাধিকার খর্ব করছে বলে রায় দেয়। তখন সমকামিতা সমর্থনকারীরা খুশি হলেও কয়েকটি ধর্মীয় সংগঠন এর বিরোধিতা করে। তারা রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। সুপ্রিম কোর্ট সমকামিতার অধিকার নিয়ে দিল্লি হাইকোর্টের রায়কে খারিজ করে দেয়। আবার সমকামিতাকে অপরাধ বলে চিহ্নিত করে শীর্ষ আদালত জানিয়ে দেয়, এই আইন বাতিল করা সংসদের কাজ।

সমকামিতা বৈধতার দাবিতে ভারতীয়দের মিছিল।

এই ছিলো মোটামুটি অবস্থা। কিন্তু, গতকালই পালটে যায় অবস্থা। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারক একমত হয়ে ৩৭৭ ধারা বাতিলের রায় দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, তারাও মনে করছেন এই রায় ব্যক্তি স্বাধীনতার পথে বাধা। প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র বলেন, ১৮৫৬ সালে যে আইন জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আজ ১৬২ বছর পরে তার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

তিনি আরো বলেছেন, “বস্তাপচা ধ্যানধারণাকে বিদায় দিয়ে সব নাগরিককে সমান অধিকার দিতে হবে। সমকামিতাকে অপরাধ করে রাখা অযৌক্তিক ও অসমর্থনীয়।” বিশিষ্ট সমকামী গীতিকার জেরি হারম্যানের লেখা বিখ্যাত গানে উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, “আই অ্যাম হোয়াট আই অ্যাম” মানে “আমি যা আমি ঠিক তা’ই।”

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কিছুদিন আগেও একটি আলোচিত রায় দিয়েছিল। ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দেন। হিজড়াদের সাথে যে বৈষম্য করা হয় এটি উল্লেখ করে রায়ে বলা হয়, এসব মানুষ সব ধরনের অধিকার পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু, এখন সমকামিতা স্বীকৃতি দেয়া ভারতের বিভিন্ন জাতি, গোত্রের বিভিন্ন ধ্যান ধারণায় বিশ্বাস করা মানুষদের মধ্যে অনেক আলোচনার তৈরি করছে। নতুন এই ঘোষণা আসার পর অনেকেই নিজেদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন, আবির মেখে উদযাপন করছেন। এই আইনকে অনেকেই স্বাগত জানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে লিখছেনও।

সমকামিতা বৈধতা পাওয়ার পর ভারতীয়দের উল্লাস।

বলিউডের মিস্টার পারফেকশনিস্ট আমির খান ধন্যবাদ জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টকে। বিচারব্যবস্থার এই রায়কে মর্যাদা দিয়ে সাধারণ মানুষকেও এই প্রসঙ্গে নিজের দায়িত্ব পালনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন তিনি। রণবীর সিং, সোনম কাপুর, অভিষেক বচ্চন, প্রীতি জিনতা, জন আব্রাহাম, করণ জোহর সহ অনেকেই রংধনুর ছবি আপলোড দিয়ে সমর্থন জানাচ্ছেন এই রায়কে। তারা এই ভারতকেই দেখতে চান, যেখানে সব মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করা হবে। সব মানুষ নিজের ব্যাক্তি স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারবে।

সমকামিতা বৈধ করার জোয়ার শুরু হয় ২০১৫ সালের আমেরিকায় সমকামিতা বৈধ ঘোষিত হওয়ার পর। সে বছর এটি নিয়ে ট্রল হয়েছে, হাসাহাসি হয়েছে বিস্তর। জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট রবার্ট মুগাবে পর্যন্ত বারাক ওবামা ট্রল করে বলেছেন, তিনি ওবামাকে বিয়ে করতে চান। রাষ্ট্রীয় বেতারেই কৌতুক করে মুগাবে বলেন, ওয়াশিংটনে গিয়ে ‘এক হাঁটু গেড়ে ওবামার পাণি প্রার্থনা’ করার ইচ্ছা আছে তার!

এছাড়া, সারাবিশ্বেই সমকামিতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার শুরু হয়। বাংলাদেশও তখন অনেকে রংধনুর ফিল্টারে প্রোফাইল ছবি পরিবর্তন করতে থাকেন। এটা দেখে অনেকে আবার টিটকারি দিয়ে বলেন, দেশে যে এতো সমকামী আছে তা তো জানতাম না!

ভারতের এই আইনেও ভারতের তুলনায় বাংলাদেশেই বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ৩৭৭ ধারা বাতিলে আমাদের দেশের মানুষদেরই মন খারাপ বেশি। তাদের কারো কারো ভাষার ব্যবহার দেখলেই মন ভরে (!) যায়। যেভাবে পারছেন গালাগালি করে যাচ্ছেন। কিন্তু, তাদের গালাগালি করার মোটিভ কি সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। বুঝেই করছেন না নাকি না বুঝেই করছেন সেটাও বোঝা যাচ্ছে না।

সমকামিতা বৈধতা পাওয়ার পর ভারতীয়দের উল্লাস।

সমকামিতা প্রাকৃতিক যে স্বাভাবিক সম্পর্ক তার থেকে একেবারেই আলাদা। যারা সমকামী সম্পর্কে বিশ্বাসী তারা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেন না। ফলে তারা সমলিঙ্গের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করেন। এটাকে বিভিন্নভাবেই অনেকে ব্যাখ্যা করেছেন। ধর্মীয় ব্যাখ্যা আছে, বৈজ্ঞানিক গবেষণাও চলছে। কিন্তু, আপনি কি কখনো এটা ভেবেছেন কেনো একটা মানুষ বিপরীত লিঙ্গের মানুষদের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেন না? এটা কি তার ইচ্ছাকৃত নাকি এটা প্রকৃতির কোনো খেয়াল বেখেয়ালের খেলা?

বাংলাদেশের কিছু লোক ভীষণ উগ্র মানসিকতা ও মনোভাব ধরে রাখে। আমাদের দেশের মানসিকতায় একটা ব্যাপার আছে, পাপ গোপনে করলে কোনো সমস্যা নেই। সেটা যার যার ব্যাক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু, সামনাসামনি যখন কোনো ট্যাবু নিয়ে কথা বলা হয় তখন এই লোকগুলো আক্রমণাত্মক হয়ে যায়। তখন সমাজ, কালচার আরো বিবিধ ফতোয়া দিয়ে তারা বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশে এখনো কোনো মেয়ের সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও সেটা জানাজানি হলে তার একশ রকম মানে বের করে তা নিয়ে সমাজে বিচিত্র ধরণের আলোচনা শুরু হয়ে যায়। যেদেশে মেয়ে ছেলে একসাথে চললে সমস্যা বলে ভেবে নেয়ার মতো উগ্র লোকের অভাব নেই, সেখানে একই লিঙ্গের মানুষের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হবে, গালাগালি হবে, ফালাফালি হবে সেটাই স্বাভাবিক।

কেউ কেউ বলছেন, খোদার গজব নেমে আসবে যারা সমকামিতায় বিশ্বাসী। পাপ পুণ্যের হিসাব মানুষকে কেন নিতে হয় যখন মানুষ নিজেই মিনিটে মিনিটে নিজেই একশটা পাপ করে? খোদার বিচার সবার জন্যেই সমান হবে। সিরিয়ায় যারা মানুষ মারে তাদেরও বিচার হবে, সৌদিতে যারা নারী নির্যাতন করে দেশে ফেরত পাঠায় তাদেরও বিচার হবে। যারা সকাল-বিকাল ধর্ষণ করে তাদেরও বিচার হবে।

সমকামিতা বৈধতার দাবিতে ভারতীয়দের মিছিল।

গজবের কথাই যখন যুক্তি হিসেবে ঘুরেফিরে আসে, তখন বলতে হয় মাদ্রাসার কতিপয় ভণ্ড শিক্ষকদের কথা। যারা ছাত্রদের পড়ানোর নামে বলাৎকার করে জোরপূর্বক। এই অভিযোগ বিগত কয়েকবছর যাবত বেশ কয়েকটি মাদ্রাসার শিক্ষকের ব্যাপারেই এসেছে গণমাধ্যমে। বাংলাদেশে ছোটবেলায় অনেক ছেলেশিশুকেও কাছের আত্মীয় স্বজনের দ্বারা মলেস্ট হতে হয়। এগুলোর বেশিরভাগই প্রকাশিত হয় না। কিন্তু, এই ধরণের মানসিকতা কিন্তু আছে, সেটা মিথ্যা নয়। আমার ধারণা এগুলো খুঁজে পেতে খুব বেশি দূরে যেতে হবে না। অনেকের নিজের জীবনেই এমন দুঃসহ অভিজ্ঞতা থাকতে পারে। এসব যারা করে পরে সুশীল সাজে, গজব আসলে তাদের উপরই আসা উচিত সবার আগে।

কার উপর গজব আসবে সেটা না ভেবে নিজের উপর আসা গজবটাই কেনো আমরা ঠেকাতে পারি না? আমরা কেন চাই সব মানুষকে আমাদের ইচ্ছেমতো চলতে হবে? কিংবা কেনো অন্যের ইচ্ছা অনিচ্ছার ব্যাপারকে আমরা নিজেদের সেট আপ করা মাইন্ড দিয়ে বিবেচনা করি? ভারতের সুপ্রিমকোর্টের রায়ে বিচারকদের বক্তব্যের সারমর্মও এটাই।

আরও পড়ুন-

Comments
Spread the love