অদ্ভুত,বিস্ময়,অবিশ্বাস্যএরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

দেশের ভেতর দেশ: হল্যান্ড নাকি নেদারল্যান্ডস?

হল্যান্ডের সাথে আমাদের জানাশোনার প্রায় পুরোটা জুড়েই আছে ফুটবল। ইয়োহান ক্রুইফের টোটাল ফুটবল থেকে শুরু করে মার্কো ফন বাস্তেন, রুড খুলিট, নিস্টলরয় হয়ে আজকের ফন পার্সি আর আরিয়ান রোবেন। আমাদের অধিকাংশের কাছেই হল্যান্ড দেশটির পরিচয় ২০১০ সালের বিশ্বকাপ রানার্সআপ দল হিসেবে। তবে অনেকের কাছেই দেশটি টিউলিপ ফুলের দেশ, উইন্ডমিল, চকলেটি ব্রেকফাস্ট, পরিশ্রমী মানুষ আর সাইক্লিং-এর দেশ। অথবা যে দেশটিকে সবসময় সমুদ্র ডুবিয়ে দিতে চাচ্ছে! হ্যাঁ, নেদারল্যান্ডসে আপনাকে স্বাগতম!

টোটাল ফুটবল, টিউলিপ ফুল, উইন্ডমিল, সাইকেল আর সত্যিকারের সমুদ্রজয়ী এই দেশটির নাম আসলে হল্যান্ড নয়, নেদারল্যান্ডস। ডাচ ভাষায় নেদারল্যান্ডস মানে হচ্ছে “low lands” অর্থাৎ নিচু ভূমি। দেশটির প্রায় অর্ধেকের মতন এলাকা সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়েও নিচে অথবা সামান্য একটু উপরে অবস্থিত।

একটি দেশের যে দুটি নাম থাকতে পারে সেটা আমরা “ইন্ডিয়া/ভারত” কিংবা “মিশর/ইজিপ্ট” দিয়েই জানি, এবং নিঃসন্দেহে আমাদের অনেকের কাছেই হল্যান্ড আর নেদারল্যান্ডসও একই দেশের দুটো আলাদা নাম। এমনটা ভাবার কারণ নেই যে শুধু আমরাই এমন ভুল করে থাকি, পুরো পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই এই দেশের নাম নিয়ে একরকমের বিভ্রান্তিতে থাকে।

এই বিভ্রান্তি থাকাটাও খুব স্বাভাবিক। গত হাজার বছরের ইতিহাসে দেশটির নাম অসংখ্যবার বদলেছে। কখনো দ্য ডাচ রিপাবলিক, কখনো দ্য ইউনাইটেড স্টেটস অফ বেলজিয়াম আবার কখনো দ্য কিংডম অফ হল্যান্ড। আপনি ভাবতে পারেন, একসময় দেশটির নাম হল্যান্ড ছিল দেখেই হয়তো এখনো অনেকে দেশটিকে ঐ নামেই চেনে। কথাটা আংশিক সত্য।

কারণ শুধু যে ইতিহাসই দেশটির নাম নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে তা কিন্তু নয়, বিভ্রান্তির মূল হচ্ছে দেশটির ১২টি প্রদেশ। জিল্যান্ড, ইউত্রেখট, গেল্ডারল্যান্ড, নর্ড ব্রাবান্ট, ওভারাইসেল, ফ্লেভোল্যান্ড, ড্রেন্থে, ফ্রিসল্যান্ড, গ্রনিঞ্জেন, লিম্বার্গ… এবং নর্ড হল্যান্ড (নর্থ হল্যান্ড) এবং জেইড হল্যান্ড (সাউথ হল্যান্ড)। 

বুঝতেই পারছেন, আসলে আমরা দুটো প্রভিন্সকে একটি দেশের সাথে গুলিয়ে ফেলেছি। দুই হল্যান্ড হচ্ছে নেদারল্যান্ডসের সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ। দেশটির রাজধানী এবং বিশ্বখ্যাত শহর আমস্টারডাম নর্থ হল্যান্ডেই অবস্থিত। এছাড়াও আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর, কুকেনহফ দক্ষিণ হল্যান্ডে অবস্থিত।

এমনকি দেশটির সরকারি ট্র্যাভেল ওয়েবসাইটটির নামেও নেদারল্যান্ডস নেই, আছে হল্যান্ড (Holland.com)। অফিশিয়াল কারণ হচ্ছে এটা শুনতে ভালো লাগে, ছোট এবং সহজ। তবে সত্যিকারের কারণটা হচ্ছে, সম্ভবত পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষই দেশটি খুঁজতে “Holland” শব্দটা লিখেই সার্চ করে।   

কেবল এটুকুই নয়, যারা দুই হল্যান্ডে থাকে তাদের বলে হল্যান্ডারস, কিন্তু নেদারল্যান্ডসের সব মানুষকে বলে ডাচ এবং এটাই তাদের ভাষা। ডাচ শব্দটা নিয়েও আবার ঝামেলা আছে। যেটার সূত্রপাত প্রতিবেশী দেশ জার্মানিতে। জার্মান ভাষায় জার্মানীকে সে দেশের অধিবাসীরা ডয়েচল্যান্ড বলে, আর নিজেরা অর্থাৎ জার্মানরা হচ্ছে ডয়েচ। “ডাচ” এবং “ডয়েচ” শব্দ দুটির উচ্চারণগত মিলের কারণে আমেরিকার পেনসিলভিনিয়ায় একটি ঐতিহাসিক ভুল হয়ে থাকে। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে বাস করা জার্মানভাষীদের আমেরিকানরা “পেনসিলভিনিয়া ডাচ” বলে থাকে। যদিও সত্যিতে তারা ডাচ নয় মোটেই, তারা জার্মান বা ডয়েচ।

দেশটির নাম নেদারল্যান্ড, যার মানুষেরা সব ডাচ, তাদের ভাষাও ডাচ। হল্যান্ড নামের কোন দেশ নেই, নর্থ এবং সাউথ হল্যান্ড নামের দুটো প্রভিন্স আছে। এই ছোট্ট রিভিউ দিলাম, কারণ সব কিছু আরও গোলমেলে হতে যাচ্ছে।

নেদারল্যান্ডস আসলে “কিংডম অফ দ্য নেদারল্যান্ডস” নামের সাংবিধানিক সাম্রাজ্যের অংশ, যার প্রধান ডাচ রয়্যাল ফ্যামিলি। বর্তমান রাজা হচ্ছেন উইলিয়াম-আলেক্সান্ডার অফ দ্য নেদারল্যান্ডস। কিংডম অফ দ্য নেদারল্যান্ডসে আরও তিনটি আলাদা দেশ রয়েছে এবং তাদের খুঁজে পেতে আমাদের পাড়ি দিতে হবে আটলান্টিক এবং আসতে হবে দক্ষিণ ক্যারিবিয়ান সাগরে। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের এই তিনটি দেশ হচ্ছে আরুবা, কুরাকাও এবং সিন্ট মার্টিন (Sint Marteen)। এরা কোন উপনিবেশিক অঞ্চল না, এদের নিজস্ব সরকার, রাস্ত্রব্যবস্থা এবং মুদ্রাও আছে। আবার একইসাথে কাগজ কলমে তারা কিংডম অফ দ্য নেদারল্যান্ডসের তিনটি দেশ!

আরুবা আর কুরাকাও দ্বীপ হলেও, সিন্ট মার্টিনের ভৌগলিক অবস্থান খানিকটা জটিল। সিন্ট মার্টিন হচ্ছে ক্যারিবিয়ান সাগরে অবস্থিত একটি ছোট্ট দ্বীপের দক্ষিণের অংশ, এর উত্তরের অপেক্ষাকৃত বড় অংশের নাম হচ্ছে সেইন্ট মার্টিন (Saint Martin) । এই উত্তরের সেইন্ট মার্টিন আবার দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্সের অধীনে। অর্থাৎ ইয়োরোপে নেদারল্যান্ডস আর ফ্রান্সের মাঝে বেলজিয়াম থাকায় তাদের মাঝে কোন কমন সীমানা নেই, কিন্তু হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে এসে ফ্রান্স আর নেদারল্যান্ডসের মধ্যে ১০ কিলোমিটার সীমানা আছে। সত্যিতে দ্বীপের নাম একটাই। কিন্তু ডাচ ভাষায় ইংরেজি “Saint” কে “Sint” বলে।

কিন্তু নেদারল্যান্ডসের সাম্রাজ্য এই এতদূর পৌঁছাল কী করে? উত্তরটা হচ্ছে, পনের ষোল শতকে যে শুধু ব্রিটিশরাই যে পুরো দুনিয়া চষে বেড়িয়েছে এমন কিন্তু না। পর্তুগীজ, স্প্যানিশ আর ব্রিটিশদের সাথে সাথে ডাচরাও ছড়িয়ে গিয়েছিল সারা পৃথিবীতেই, সব গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নিজেদের দখলে নেয়ার চেষ্টা করেছে। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মত ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও বিদ্যমান ছিল। তারা সেই ১৬০৫ সালেই ভারতবর্ষে বাণিজ্য শুরু করেছিল। 

এমনকি একটা সময় আমেরিকার পূর্ব উপকূলের নাম ছিল “নিউ নেদারল্যান্ডস” এবং তার রাজধানীর নাম ছিল নিউ আমস্টারডাম। জিল্যান্ড নামের প্রভিন্সের নাম আগেই বলেছি, ঐ নাম থেকেই আজকের নিউজিল্যান্ড নামের উৎপত্তি। আর নিউজিল্যান্ডের কাছেরই দেশ কিংবা মহাদেশ, পৃথিবীর সব দ্বীপের রাজা অস্ট্রেলিয়ার নামও একসময় ছিল নিউ হল্যান্ড।

যাই হোক, যদিও ডাচ উপনিবেশ এখন আর নেই, তারপরেও ক্যারিবিয়ান সেই তিনটি দ্বীপ এখনো রয়ে গেছে ডাচদের অধীনেই। একটি সাম্রাজ্যে চারটি দেশ থাকা আমাদের কাছে খুব একটা অপরিচিত নয়। তবে এখানেই শেষ নয়। কারণ ক্যারিবিয়ান সাগরের আরও তিনটা দ্বীপ নেদারল্যান্ডসের অধীনে আছে। দ্বীপ তিনটি হচ্ছে বোনায়ার, সিন্ট ইউস্টাটিয়াস এবং সাবা।

এরা সাম্রাজ্যের কোন দেশ নয়, কিন্তু নেদারল্যান্ডসের তিনটি শহর। এই অনেক দূরের তিনটি শহরের বাসিন্দারা নেদারল্যান্ডসে বসবাসরত যেকোনো ডাচ নাগরিকের মতনই নেদারল্যান্ডসের নির্বাচনে ভোট দিয়ে থাকেন। আবার তারা কেউই নেদারল্যান্ডসের কোন প্রভিন্সের অধীনে নয় এবং তারা ডাচ মুদ্রাও (ইউরো) ব্যবহার করে না। বরং তারা মুদ্রা হিসেবে ডলার ব্যবহার করে।

এটা অনেকটা এমন যে, আমাদের সেইন্ট মার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের কোন জায়গা নয়, কিন্তু পর্তুগালের অধীনে থাকা কোন একটা শহর এবং যেখানে কিনা লোকজন মুদ্রা হিসেবে রূপী ব্যবহার করে!

নেদারল্যান্ডস দেশের এই তিনটি শহর এবং দ্য কিংডম অফ নেদারল্যান্ডসের ঐ তিনটি দেশকে একসাথে ডাচ ক্যারিবিয়ান বলে। এবং এখানের সবাই ডাচ নাগরিক। যেহেতু কিংডম অফ দ্য নেদারল্যান্ডস ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ তাই সকল ডাচ ক্যারিবিয়ানও ইউরোপিয়ান।

তো একেবারে শেষে, ছয়টা ক্যারিবিয়ান দ্বীপ, চারটা দেশ, বারোটা প্রভিন্স, দুটো হল্যান্ড, দুটো নেদারল্যান্ডস এবং একটি সাম্রাজ্য; সবই ডাচ!

(‘দেশ নিয়ে যত জট’ একটি ধারাবাহিক সিরিজ, এর তৃতীয় পর্ব প্রকাশিত হবে দু’দিন বাদেই।)

প্রথম পর্ব- দেশের ভেতর দেশ: ইউ.কে, গ্রেট ব্রিটেন নাকি ইংল্যান্ড?

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close