সিনেমা হলের গলি

হিটলারের ছায়ায় নির্মিত হ্যারি পটারের লর্ড ভল্ডেমর্ট চরিত্রটি?

এডলফ হিটলার আর লর্ড ভল্ডেমর্ট। আপাতদৃষ্টিতে এদের মধ্যে কোন মিল খুঁজতে যাওয়া অর্থহীন। একজন বাস্তবের চরিত্র, যাকে খুঁজে পাওয়া যায় ইতিহাসের পাতায়। আরেকজন স্রেফ একটি কাল্পনিক চরিত্র, যার বিচরণ জে কে রাউলিংয়ের সৃষ্টি করা জাদুর জগতে। কিন্তু তারপরও এই দুই চরিত্রের মধ্যে খুবই স্পষ্ট কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়, যার ফলে মনে হতে বাধ্য — জে কে রাউলিং কি স্বতঃপ্রণোদিতভাবেই ভল্ডেমর্ট চরিত্রটিকে হিটলারের আদলে গড়ে তুলেছেন, নাকি দুজনের মধ্যে মিলগুলো নিছকই কাকতালীয় ব্যাপার? অবশ্য হিটলার আর ভল্ডেমর্টের মধ্যে মিলগুলো এতটাই স্থূল যে একবার তলিয়ে দেখলে সেগুলো কাকতালীয় হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিতেই ইচ্ছে করবে। চলুন পর্যালোচনা করি হিটলার আর ভল্ডেমর্টের মধ্যে সেই মিলগুলো।

ছেলেবেলা

ভল্ডেমর্ট আর হিটলার, দুজনের ছেলেবেলাই কেটেছে অত্যন্ত নিগ্রহে। ভল্ডেমর্টের বাবা ছিল একজন মাগল (যার কোন জাদুক্ষমতা নেই)। আর মা ছিল একজন ডাইনী। মাগল বাবা ভল্ডেমর্টের মাকে, এবং তাকে মেনে নিতে পারে নাই এবং তাদের দুজনকে ছেড়ে চলে যায়। এরপর ভল্ডেমর্টের মা মারা যায়। তখন থেকেই মাগলদের প্রতি ভল্ডেমর্টের মনে ঘৃণার জন্ম নেয়। এই ঘৃণার মাত্রা চরমে পৌঁছায় যখন তাকে একটি মাগল এতিমখানায় শৈশবের একটা বড় সময় কাটাতে হয়।

অপরদিকে হিটলারের বাবা ছিল ইহুদী আর মা ছিল খ্রিস্টান। হিটলারের বাবা ছিল খুবই অত্যাচারী প্রকৃতির, এবং ছোটবেলা থেকেই হিটলার তার বাবার নির্মমতার শিকার হয়েছে ও তার মাকেও হতে দেখেছে। এর ফলে হিটলারের মনে ইহুদীদের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্ম নেয়।

তবে দুজনেরই মা ছিল সন্তানের প্রতি অতি সদয়, যার ফলে দুজনই ছিল মাতৃভক্ত। সবমিলিয়ে হিটলার আর ভল্ডেমর্টের ছেলেবেলার দিকে তাকালে একটা জিনিস প্রমাণ হয়, দুজনেরই ছেলেবেলা কেটেছে দুঃখ-দুর্দশা আর বঞ্চনার শিকার হয়ে, যা পরবর্তীতে তাদের মানবতাবিরোধী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলেছে।

শিক্ষাজীবন

জীবনের এই বিশেষ সময়ে হিটলার আর ভল্ডেমর্টের পথচলা ঠিক একই রকম ছিল না তবে একটা পর্যায়ে এসে দুজনের জীবনই একই সমান্তরালে চলতে শুরু করে।

প্রথমদিকে এতিমখানায় ভল্ডেমর্টের শিক্ষাজীবন খুব একটা সুখকর ছিল না। কিন্তু হগওয়ার্টসে পা রাখার পর থেকেই সে হয়ে ওঠে সেরা ছাত্রদের একজন। বন্ধুবৎসল না হওয়ায় সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা খুব একটা ছিল না। তারপরও নিজের অগাধ জ্ঞানের সুবাদে সে অধিকাংশ শিক্ষকের পছন্দের পাত্রে পরিণত হয়। এবং একটা পর্যায়ে সে হগওয়ার্টসের শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত অন্যতম সম্মানজনক পদক Award for special service to the school-এ ভূষিত হয়। এখানে জানিয়ে রাখা ভাল, স্কুলজীবনে মাগলবর্ন শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় ভল্ডেমর্টের এবং তাদের প্রতি তার ঘৃণা আরও বেড়ে যায় এবং যেহেতু সে ছিল তার মায়ের দিক থেকে হগওয়ার্টসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও মাগলবিদ্বেষী সালাজার স্লিদারিনের বংশধর, তাই সে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় এইসব মাগলবর্ন ‘মাডব্লাড’দের উচিৎ শিক্ষা দেয়ার।

অন্যদিকে হিটলারের শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল ভিয়েনার আর্টস একাডেমিতে। কিন্তু এখানে সে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। বরং প্রফেসরদের কাছ থেকে তার শিল্পকর্ম বারবার প্রত্যাখ্যাত হতে থাকে। এরই মাঝে ডাক্তারের অবহেলায় হিটলারের ক্যান্সারে আক্রান্ত মা মারা যায়। হিটলার জানতে পারে তাকে অপমান করা প্রফেসর আর তার মায়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী ডাক্তার উভয়ই ইহুদি। আর তখনই সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে একদিন সে পৃথিবীর ইহুদীদের সমূলে ধ্বংস করবে। যাইহোক, আর্ট স্কুলে ব্যর্থ হলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মিলিটারিতে যোগ দিয়ে হিটলার সাহসিকতার পরিচয় দেয়। তার ব্যবহার খারাপ হওয়ায় এবং অতিমাত্রায় ইহুদীবিদ্বেষী হওয়ায় সাধারণ কমরেডরা তাকে পছন্দ করত না কিন্তু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা তার কাজে খুবই সন্তুষ্ট ছিল, এবং সাহসিকতার জন্য তাকে জার্মানীর সর্বোচ্চ সামরিক পদক The Iron Cross-এ ভূষিত করা হয়।

আদর্শ বিস্তার

জীবনে প্রাথমিকভাবে সফল হওয়ার পর ভল্ডেমর্ট ও হিটলার উভয়ই নিজেদের আদর্শ সাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে শুরু করে। স্কুলে থাকতে ভল্ডেমর্ট তার মত বাকিরা যারা ‘পিওরব্লাড’ তত্ব্বে বিশ্বাসী এবং মাগলবর্নদের সহ্য করতে পারে না এমনদের নিয়ে একটি দল গঠন করে। তখনই প্রথম ভল্ডেমর্টের নেতৃত্বগুণের প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে হিটলার কাজ শুরু করে মিলিটারির শিক্ষা অধিদপ্তরে। এখানেই প্রথম সে পাবলিকলি ইহুদী বিরোধী মতবাদ প্রচার শুরু করে এবং তার অনেক অনুসারীও জুটে যায়।

পরবর্তী জীবনে ভল্ডেমর্ট (যার পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল টম মারভোলো রিডল) নিজেকে লর্ড ভল্ডেমর্ট বা ডার্ক লর্ড হিসেবে পরিচিত করে এবং ডার্ক আর্টের ব্যাপক বিস্তার ঘটায়। তার অনুসারীদের নাম হয় ডেথ ইটার, পাশাপাশি গড়ে তোলে বিশেষ বাহিনী — স্ন্যাচার্স। আর হিটলার নাৎসীসিবাদের প্রচলন ঘটায়, ‘দার ফুহরার’ নাম ধারণ করে আর গেস্টাপো নামে নিজের গোপন পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলে। তার অনুসারীদের বলা হত নাৎসী।

গণহত্যা

স্ব স্ব আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ভল্ডেমর্ট ও হিটলার উভয়ই ব্যাপক গণহত্যা শুরু করে। পিওরব্লাড তত্ত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ভল্ডেমর্ট ও তার অনুসারীরা ব্যাপকহারে মাগল ও বিপক্ষশক্তির জাদুকরদের মারতে শুরু করে, যে হত্যাকান্ডের সর্বশেষ ও সবচেয়ে ভয়াবহ নিদর্শন হল ‘দ্যা ব্যাটল অফ হগওয়ার্টস’। অপরদিকে হিটলারও নাৎসীবাদ সফল করতে ইহুদীনিধন শুরু করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন হিটলারের নির্দেশে হলোকাস্টে প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদীর মৃত্যু হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, ভল্ডেমর্টের অনুসারী ডেথ ইটাররা যেমন হত্যাকান্ডের সময়সময় নিজস্ব ডার্ক মার্ক ব্যবহার করত, তেমনি হিটলারের অনুসারীরাও ‘স্বস্তিকা’ নামে হিন্দু পুরাণ হতে প্রাপ্ত বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করত।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ইতিহাসের বাস্তব চরিত্র হিটলার আর হ্যারি পটার সিরিজের কাল্পনিক চরিত্র ভল্ডেমর্টের মধ্যে খুবই পরিষ্কার কিছু সাদৃশ্য বিদ্যমান। জে কে রাউলিং নিজেও ডাচ সংবাদপত্রিকা ডি ভলক্সক্রান্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ভল্ডেমর্ট চরিত্রটি হিটলারের আদলে গড়া কথা স্বীকার করেছেন। পাশাপাশি তিনি এ-ও বলেছেন যে ভল্ডেমর্ট চরিত্রটিতে জোসেফ স্ট্যালিনেরও কিছুটা ছায়া রয়েছে।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close