ইনসাইড বাংলাদেশ

পূজামন্ডপ থেকে ভেসে আসা গান আর এক গেলাস পানির গল্প!

মনযূরুল হক

শুরুটা শুরু থেকেই বলি।

গত রোজায় হিন্দুদের কী একটা পূজার উৎসব চলছিল। সে সময় বাড়িতে ছিলাম বেশ কয়েকদিন, চিকুনগুনিয়া জ্বর। বাসার পাশেই পূজামণ্ডপ থেকে ভেসে আসছে মাইকের চিৎকার। মন্ত্র নয়, পূজাপাঠ নয়, ভক্তিগানও নয়— স্রেফ হিন্দি সিনেমার উন্মাতাল সঙ্গীত।

রোজার দিনে কেউই এসব শোনার জন্য প্রস্তুত নয়। কাছেই মসজিদ। কয়েকবারই ‍মুসলিম যুবকদের মধ্যে হল্লা উঠছে, লাঠিসোটা নিয়ে হামলা করবে কি না! রোজার দিনে এত পাপ, কাহাঁতক সহ্য করা যায়। বলতে দ্বিধা নেই, জ্বরতপ্ত না হলে আমিও তাদের কাতারেই থাকতে পারতাম।

শেষ পর্যন্ত কিছু ঘটেনি। দু-দিনই ছিল। শেষদিন দুপুরের পরে মণ্ডপে বেশ ভোগের ব্যবস্থা হয়েছে বোধকরি। দূর-দূরান্ত থেকে নারী-পুরুষ তাদের নাতি-নাতকুর কোলে নিয়ে এসেছেন। খেয়ে-দেয়ে তারা দলবেধেঁ আমাদের ঘরের পিছনের কলপাড়ে এসেছেন হাত ধুতে ও পানি খেতে।

আমি তখন কলপাড়ে গেছি ঠাণ্ডা একজগ পানি আনতে। খাবো, যেহেতু রোজা রাখিনি এবং দুর্বল হয়ে পড়ায় একটু পর পর পানি খেতে হচ্ছে। কলপাড়ে তাদের বয়স্ক কয়েকজন এগিয়ে এলে কলে চেপে চেপে তাদের হাত-মুখ ধুতে সাহায্য করতে উদ্যত হয়েছি মাত্র, অমনি সবাই “হা হা কী করেন কী করেন” বলে হাতলটা তুলে নিতে এলেন। কয়েকজন নারীর কণ্ঠে দরদ ঝরে পড়ল— রোজাদার মানুষ আপনি, কী করে আপনাকে কষ্ট দেবো। আমাকে দেন, আমাকে দেন।

হৃদয়টা জুড়িয়ে গেলো। ভাবতে ঘেন্না হচ্ছিল, এদেরকে ঠ্যাঙাতেই কি মনে মনে সমর্থন যুগিয়ে ছিলাম আমি?

গতকালের ঘটনা বলি।

বিকেলে বেরুবার ঠিক আগ মুহূর্তে নতুন একটা কাজের ‘অর্ডার’ আসায় বেশ কয়েক মিনিট দেড়ি হয়ে গেলো। এই সময় দেড়ি করে অফিস থেকে বের হওয়া মানে বাসায় ইফতার মিস করা।

উত্তরবাড্ডায় যখন গাড়ি থেকে নামতে পেরেছি, ততক্ষণে সম্ভবত সন্ধ্যা একেবারেই ঘনিয়ে এসেছে। ছেলেটার জন্য সেরেলাক নেওয়া জরুরি, এই একটা জিনিসই বাচ্চাটা আনন্দ নিয়ে খায়। পরিচিত দোকান একটু দূরে ভেবে সামনেই টুপি-পাঞ্জাবি শোভিত পাক্কা মুসল্লি দোকানের দিকে গিয়েছি মাত্র! আমাকে দেখেই দোকানদার শাটার টেনে দিলেন। ভেতরে কর্মচারীরা ইফতার প্রস্তুত করে বসে গেছেন। অনুনয় করার পরও কিছুতেই তাক থেকে সেরেলাকের একটা প্যাকেট দিতে রাজি হলেন না।

মনক্ষুণ্ন হয়ে ফিরে এসেছি ডিমের দোকানে। চার-পাঁচজন মাদরাসা পড়ুয়া ছেলেই হবে, একসাথে দোকানের ভেতরে গল্প করছে আর মুড়ি মাখাচ্ছে। বলতে দ্বিধা নেই, মনে মনে আশা ছিল, ইফতারের সময় যেহেতু হয়ে এসেছে, সাধলে একটু পানি মুখে দিয়ে নেবো। বললাম, “ভাই, একডজন ডিম দেওয়া যাবে?” একটা ছেলে মিচকি মিচকি হেসে একটু ধমকের স্বরেই জবাব দিল, “না দেওয়া যাবে না, ইফতারের সময় হয়েছে দেখেন না।” বাকি সকলকে দেখলাম একসঙ্গে হেসে মুখ লুকাল।

বেশ অপমানিত হয়েছি। ইফতারের সময় তখন সম্ভবত এক-দুই মিনিট আছে বা নেই। অটোতে গিয়ে বসেছি, রাস্তা খালি, বাসায় পৌঁছতে ৩-৪ মিনিটের বেশি লাগবে না। অল্পক্ষণ পরেই আজান। মাথা নিচু করে আছি, সামনেই মুখোমুখী বসেছে একটা মেয়ে। বেশ স্টাইলিস্ট। আজান শুনেই মাথায় কাপড় টেনে দিল। ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে নিজে কয়েক চুমুক নিল। আড়ষ্ট কণ্ঠেই জানতে চাইল, কেউ রোজা রেখেছেন কি না।

চোখ ভিজে উঠেছিল কি না মনে নেই। শুধু মনে আছে, মেয়েটার হাত থেকে যখন বোতলটা নিয়েছি, মেয়েটা আমার অন্য হাত থেকে ব্যাগ আর বইটা নিয়ে ধরে রেখেছে, যেন আরাম করে পানিটা খেতে পারি।

ইসলাম দীপ্তিমান হয় কিসে, পোশাকে? না মানবতায়?

ফিচার্ড ও অন্যান্য ছবিগুলো প্রতীকী

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close