বামনত্ব হলো এমন একটি মেডিকেল কন্ডিশন যার ফলে মানুষের স্বাভাবিক দৈহিক বৃদ্ধি নির্দিষ্ট সময়ের আগেই বন্ধ হয়ে যায়, আর তার ফলে একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির দৈহিক গড়ন হয় শিশুদের মত। এটি একটি বিরল মেডিকেল কন্ডিশন, যা ২৫০০০ জন মানুষের মধ্যে মাত্র একজন সম্মুখীন হয়। কিন্তু বামনদের নিয়ে অনেকের মনেই একটি ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে শারীরিক আকৃতির মত হয়ত তাদের বুদ্ধিবিবেচনার ক্ষমতাও অতি সীমিত। এমন ধারণার বশবর্তী হওয়া খুবই হাস্যকর একটি বিষয়। কেননা বামনদের সমস্যাটি মূলত শারীরিক। তারা মোটেই মানসিক প্রতিবন্ধকতার শিকার নয়। আর তাই শারীরিক দুই-একটি বিষয় বাদ দিলে তাদের জীবনাচরণের অধিকাংশই সাধারণ মানুষের মত। এবং একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব, এমন বেশিরভাগ কাজই একজন বামন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও খুবই সম্ভব। আজ আপনাদেরকে বলব এমনই এক বামন ব্যক্তির কথা, যিনি তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে তুচ্ছজ্ঞান করে নিজের জীবনটাকে নিজের মত করে ঢেলে সাজাতে পেরেছেন, বিশ্বটাকে জয়ও করতে পেরেছেন।

যার কথা বলছি, তিনি ৩০ বছর বয়সী হিমাংশু বক্সী। অন্যান্য আর দশটা বামনের মত তার জীবনটিও ছিল অনেক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। এ ধরণের মানুষের ক্ষেত্রে যেমনটা হয়, তাদের নিজেদের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যতটা না, তারচেয়েও শতগুণ বেশি প্রতিবন্ধকতার দেয়াল তাদের সামনে এনে হাজির করে সমাজের অন্যান্য মানুষজন। এবং সমাজের সেইসব মানুষের চাপেই মূলত হার মেনে নেয় অনেক বামন। কিন্তু হিমাংশু তেমন মানুষ নয়। দৈহিক উচ্চতা মাত্র ৩ ফুট ৮ ইঞ্চি হওয়ায় তাকে অনেক টিটকারি হজম করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি সেসবে পাত্তা দেননি। বরং তিনি চেষ্টা চালিয়ে গেছেন শারীরিক প্রতিবন্ধকতাটিকেই নিজের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদে রূপায়িত করতে।

‘আমার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব আর প্রবল ইচ্ছাশক্তিই আমাকে সাহায্য করেছে সকল বাধা ডিঙিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলতে,’ নিজের ব্যাপারে এমনটিই বলেন হিমাংশু। কিন্তু তারপরও তার এগিয়ে চলার পথ বরাবরই ছিল বন্ধুর। জীবনে বেশ কয়েকবারই সেই পথের সর্বনিম্ন বিন্দুর দেখা পেয়েছেন তিনি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য হলো তার বাবার মৃত্যু। তার বাবা যে শুধু তার জীবনের সবচেয়ে বড় অবলম্বন ও অনুপ্রেরণার উৎসই ছিলেন তা নয়। বাবা ছিলেন তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুও। তার আর কোন ভাই বা বোন না থাকায়, বাবার কাছ থেকেই তিনি সবধরণের ইমোশনাল সাপোর্ট পেতেন। আর তাই বাবার মৃত্যুর পর মোটামুটি দিশেহারা অবস্থা হয় তার। কিন্তু সেই সময়ে এগিয়ে আসেন তার মা। এতদিন বাবা যেভাবে তাকে আগলে রাখতেন, এবার সেই দায়িত্বটিই সুনিপুণভাবে পালন করতে থাকেন তার মা।

মায়ের সাহায্যে জীবনের চরম দুরাবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হন তিনি। চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেনসের পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে পাস করেন তিনি। কিন্তু এখানেই থেমে না থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যান একজন আইনজীবী হওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে। কেননা এটিই ছিল তার বাবার ইচ্ছা। আর বাবার ইচ্ছাকে বাস্তব রূপদানের উদ্দেশ্যে জানপ্রাণ বাজি রেখে পড়াশোনা করতে থাকেন তিনি। এবং এক পর্যায়ে সেখানেও সফলতার দেখা পান তিনি।

জীবনযুদ্ধে জয়ী হতে তাকে যেসকল কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয়েছে, সেগুলোকে গুণে শেষ করা যাবে না। যেমন একটি অতি সামান্য উদাহরণ দেয়া যাক। স্বাভাবিকভাবেই আইনজীবী হওয়ার জন্য তাকে যে সকল পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছিল, সেগুলোর প্রতিটিই ছিল তিন ঘন্টার। এবং সেসব পরীক্ষা দিতে গিয়ে একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী হিসেবে কোন বাড়তি সুবিধাই দেয়া হয়নি তাকে। অথচ পরীক্ষার হলের বেঞ্চগুলো থাকত খুবই উঁচু, যার নাগাল পাওয়া তার পক্ষে ছিল একদমই অসম্ভব। তাই প্রতিটি পরীক্ষাই তাকে দিতে হয়েছে পুরো তিন ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে!

এমন শত শত কঠিন চ্যালেঞ্জ জয় করে আজকের অবস্থানে এসে পৌঁছেছেন হিমাংশু। এবং আজ তিনি তার মত লক্ষ লক্ষ মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা স্মারক। ম্যাক্সিম ম্যাগাজিনে তাকে নিয়ে কভার স্টোরি পর্যন্ত হয়েছে। তিনি একজন খুবই ভালো বিতার্কিক। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয়ের কারণে নয়, স্রেফ একজন সুবক্তা হিসেবেই তিনি অংশগ্রহণ করেছেন অগণিত টিভি অনুষ্ঠানে। তিনি একজন টেড স্পিকারও। কোটি কোটি মানুষ দেখেছে ও শুনেছে তার মোটিভেশনাল স্পিচ। এবং বর্তমানে তিনি একজন সমাজকর্মীও বটে। কাজ করে চলেছেন তার মত শারীরিক প্রতিবন্ধীদের নিয়ে। আর এই সবকিছুর পাশাপাশি বাবার স্বপ্ন পূরণ করে সফলতার সাথে একজন আইনজীবী হিসেবেও পেশাগত জীবনে আলোকদীপ্তি ছড়িয়ে চলেছেন তিনি।

হিমাংশুর জীবনকাহিনী থেকে উদ্বুদ্ধ হতে পারি আমরা সকলেই। আমাদের সবার জীবনেই হয়ত অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। যেমনটি ছিল হিমাংশুরও। কিন্তু হিমাংশু পেরেছেন সেইসব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে জীবনে সাফল্যের চূড়ায় আহরণ করতে। এখন আমাদেরও পালা আত্মজিজ্ঞাসার। হিমাংশু যদি পারেন, তবে আমরা পারব না কেন?

Comments
Spread the love