১০০ লিচুর দাম ৬০০ টাকা। এক পিস লিচুর দাম ৬ টাকা। ফুল সিজন হলেও হয়ত ১০০ বা বড়জোর ২০০ টাকা দাম কমবে। কয়জন মানুষ এটা এফোর্ড করতে পারে? লোয়ার মিডলক্লাস, মিডলক্লাসদের ফলের লিস্ট থেকে লিচুর নাম মুছে যাচ্ছে। দেখা গেছে, এখন শুধু লিচুর সিজনে কোন আত্মীয়-স্বজনের বাসায় ঘুরতে গেলেই লিচু কিনে নিয়ে যাওয়া হয়। নিজেদের জন্য কেনাই হয় না।

হাতে গোনা দু একটা সস্তা ফল ছাড়া প্রায় সব ফলেরই একই অবস্থা। রোজার মাসে ইফতারে যে মানুষজন একটু ফল-টল খাবে সে সুযোগও কমছে দিন দিন। গরুর মাংস খুব বেশি বাড়ার পর গত ঈদের পর থেকে ৫০ টাকার মত কমেছিল দাম, তবুও এটা হিউজ। ২০ হাজার টাকা যারা বেতন পায়, মাসে তারাও গরুর মাংস কেনার কথা ভাবতে পারে না।

পারফেক্ট সাইজের বড় একটা ইলিশ মাছ একদিন দাম করলাম। ওজন মাপার পর হলো ২২০০ টাকা। সেদিন সেই মাছ কিনি নাই। ইভেন আমি মনে হয় আমার বাজার করার বয়স হওয়ার পর কখনোই এমন বড় ইলিশ কিনি নাই।

আম্মারে জিজ্ঞাসা করলাম, বড় ইলিশের স্বাদ কেমন?
আম্মা বলল, ভুইলা গেছি।

ক্যাট ফিশ গোত্রীয় মাছ যেগুলা একটু খাওয়ার মত সেসবও একই অবস্থা। বড় মাছও কেনা যায় না দামের কারণে। সস্তা খালি সেই পাঙ্গাস আর তেলাপিয়া। এখন আবার কিসব উল্টাপাল্টা ছোট সাইজের নতুন নতুন কিছু সস্তা মাছ পাওয়া যায়। এসব একদিনের পর অন্য একদিন খেতে গেলেই মুখ বন্ধ হয়ে আসে। কিন্তু উপায় নেই, খেতেই হয়।

চালের দাম একবার যে অনেক বাড়লো তারচেয়ে কিছুটা কম ছিলো শেষ কয়েক মাস। তবে সবজির বাজারে মনে হয় সারা বছর আগুন থাকে। শুধু আলু আর পুঁই শাক কিনে প্রতিনিয়ত বাসায় ফেরা লাগে। সেই আলুও ২৫/৩০ টাকা মিনিমাম দাম হয়। অথচ পেপার পত্রিকায় নিউজ দেখি, উত্তরবঙ্গে আলু চাষীরা দাম না পেয়ে আলু ক্ষেতে ফেলে রাখে। তিন চার বছর আগেও এলাকায় গেলে সবচেয়ে অনুন্নত গ্রামের দিকে বাঁধাকপি ক্ষেত থেকে ১ টাকা পিস বিক্রি করতে দেখেছি। কিন্তু আমরা বাজারে গেলে ২০/৩০ টাকার নিচে কখনোই পাওয়া যায় না।

আমাদের ওদিকেও পাহাড় আছে। পাহাড়ে প্রচুর কাঁঠাল গাছ। ফুল সিজনে সেখানের মানুষেরা কাঁঠাল বিক্রি করে ভ্যান ভাড়াও তুলতে পারে না। অথচ ঢাকায় দেড়শ টাকার নিচে কাঁঠাল পাওয়া যায় না।

রোজা শুরু হওয়ার আগেই ত্রিশ টাকার বেগুন আশি টাকা হয়ে গেল। পেঁয়াজের দাম প্রতিদিন ৫ টাকা করে বাড়ছে। এসব দেখার মানুষ নেই। কিন্তু যে কৃষক চাষ করে, সে এসব বিক্রি করে জমিতে সার দেয়ার টাকা তুলতে পারে না, পানি দেয়ার টাকা তুলতে পারে না। লোকাল এঞ্জিও থেকে লোন নিয়ে ফেরত দিতে না পেরে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে।

একদিকে দুইজনের ইনকাম ছাড়া শহরে এখন সংসার চলে না। অন্যদিকে, একজনের ইনকাম করার গ্যারান্টিই নাই। দেশের লাখ লাখ ছেলেপেলে বেকার। একদিকে প্রাইভেট সেক্টরে চাকরি যাওয়ার টেনশন, সিনিয়র পোস্টে বিদেশিদের সাথে কমপিটিশন। ছোটখাটো ব্যবসা যারা করে তারা ইনভেস্টের টাকা খুঁজে পায় না। বড় ব্যবসায়ীরা আবার ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে ফেরত দেয় না।

৬ নম্বর ছাড়া ঢাকার সব বাস সিটিং। এটা ভালো দিক। একটু আরামে যাবো। তবে ভাড়া তিন গুণ। দেশে যারা চাকরি করে তাদের খরচের হিসাব আমি মেলাতে পারি না। বাসা থেকে একটু দূরে অফিস হলেই তো যাতায়াত করতে গেলে প্রতিদিন দেড়শ, দুইশো টাকা লাগে প্রায়।

দেশের সাধারণ মানুষের খাবার-দাবারের স্ট্যান্ডার্ড অনেক কমে গেছে আগের চেয়ে। অনেক কম খেয়ে বাঁচি এখন আমরা। আমাদের মতো দেশে, রেগুলার লাইফে যেসব জিনিস আমাদের দরকার, সেসবের দাম আরও তিন গুণ কম হওয়ার উচিত। আমরা গরিব মানুষ।

আমরা একটু খেয়ে পরে, শান্তিতে বাঁচতে চাই। এসব যারা কন্ট্রোল করেন, দয়া করে সবকিছু আমাদের সাধ্যের মধ্যে রাখার জন্য কাজ করবেন। খুব কষ্টের গতর খাটা পয়সা দিয়ে আমাদের জীবন চালাতে হয়। আপনাদের মতো আমরা কোটির হিসাব বুঝি না। আমাদের টাকা অল্প, এই অল্প টাকাই আমাদের কাছে ম্যালা দামি।

আপনারা, উন্নয়নের মহাসড়কে উন্নয়নশীল বাস চালানোর ফাঁকে ফাঁকে আমাদের কথাও একটু মনে রাইখেন…

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-