ফিচারটি যতবার পড়া হয়েছেঃ 208

শুভ জন্মদিন ডেঞ্জেল ওয়াশিংটন!

Ad

ছোটবেলা থেকে তিনি শিক্ষা পেয়েছিলেন- সৃষ্টিকর্তার তৈরি মানুষ দুই প্রকার- মন্দ আর ভালো।

কিন্তু কিছুটা জ্ঞান হওয়ার পর তিনি আবিষ্কার করলেন, মানুষ আসলে দুই প্রকার- সাদা আর কালো।

বলা বাহুল্য, নিজের গায়ের চামড়ার রঙ কালো হওয়ার কারণেই তিনি এই বিষয়টা আস্তে আস্তে আবিষ্কার করছিলেন। ছোট মানুষ ছিলেন, কালো হওয়ার কারণে যে মানুষগুলো তাকে কিছুটা অন্য দৃষ্টিতে দেখত বা টিটকিরি মারত, কিছু বলতেন না তাদের। শুধু নীরবে চার্চে গিয়ে ঈশ্বরের কাছে বিচার দিতেন।

ঈশ্বর একদিন তার প্রার্থনা শুনলেন। তার মায়ের একটি বিউটি পার্লার ছিল, যেখানে তিনি তার মাকে সাহায্য করতেন। একদিন এক মহিলা সেই পার্লারে সাজগোজের জন্য আসলেন। মহিলা তার দিকে এক পলক তাকিয়েই একটুখানি কাগজ চাইলেন- তাকে কাগজ দেয়া হল। কাগজে তিনি ছেলেটির সম্পর্কে লিখলেন- এই ছেলে একদিন লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে কথা বলবে। লিখেই তিনি চলে গেলেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেল এই মহিলা স্থানীয় চার্চে কাজ করতেন আর তিনি যার সম্পর্কে ভবিষ্যতবাণী- সেটা নাকি সত্যি হত! ছোট ছেলেটি অপরিসীম আনন্দে আন্দোলিত হল। সেই কাগজের টুকরোটি সযত্নে সে নিজের কাছে রেখে দিল।

ছোটবেলায় যে ঈশ্বর তার প্রার্থনা শুনেছিলেন, কৈশোরে সেই ঈশ্বর তার সাথে অদ্ভুত এক খেলা খেললেন। মাত্র ১৪ বছর বয়সে নিজের বাবা মাকে তিনি চোখের সামনে আলাদা হয়ে যেতে দেখলেন। তবে মানুষের এই বিচ্ছেদ থেকে মানবতার উপরে তিনি বিশ্বাস হারাননি, বরং মানুষকে সেবা করার ইচ্ছাটা আরও বাড়ল তার। জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করলেন ডক্টর হওয়ার জন্য। কিন্তু মানুষের সেবা করা শুনতে মহৎ লাগলেও, সেবা করার জন্য যে পড়াশুনাটা করতে হয় বিশেষ করে ডাক্তারির- সেটা যে খুব একটা সোজা নয়- সেটা বুঝতে তার খুব বেশি সময় লাগলো না। পথ চেঞ্জ করলেন- পলিটিকাল সাইন্স নিয়ে পড়াশুনা করলেন বেশ কিছুদিন। এখানেও কিছুদিন পর সেই “ভাল্লাগে না” রোগ। কলেজ থেকে বের করে দেয়া হল তাকে তার খারাপ রেজাল্টের কারণে, তার সিজিপিএ ছিল তখন মাত্র 1.7!  এই সময় সামার ক্যাম্পে গিয়ে একটি নাটকের দলের সাথে কাজ করে তিনি এই বিষয়ে আগ্রহী হলেন। ক্যামেরার সামনে প্রথমে কাজ করেন নি, কিন্তু হুট করে একদিন অভিনয়ের চেষ্টা করলে বন্ধুরা খুব বাহবা দিতে থাকলেন। পৃথিবীর আর কারো বাহবা ভাল না লাগলেও, বন্ধুদের যেকোনো কিছুতে বাহবা যে কারোরই যে ভাল্লাগে- তার প্রমাণ হিসেবে তিনি ড্রামা আর জার্নালিজম থেকে গ্রেজুয়েশন শেষ করলেন এবং ততদিনে তিনি বুঝে গেলেন যে তিনি কাজ করলে “অভিনয়”ই করবেন, অন্য কিছু নয়।

মঞ্চ করতে থাকলেন। সেখান থেকে ডাক পেলেন টিভি তে। Wilma নামের এক টিভি মুভির মাধ্যমে তার যাত্রা শুরু, তবে সেখানে তাকে কেও সেভাবে খেয়াল করেননি একজন বাদে- তিনি একজন নারী। যে নারী তাকে এখানে খেয়াল করেছিলেন, তাকে সারাজীবন খেয়াল রাখার দায়িত্ব নিয়ে দুইজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন কিছু বছর পরেই।

A soldier’s story সিনেমা দিয়ে সবার নজরে আসেন প্রথমে। তবে তাকে নিয়ে প্রধানত আলোচনা শুরু হয় ১৯৮৭ সালে মুক্তি পাওয়া cry freedom সিনেমার মধ্য দিয়ে। এই সিনেমার জন্য প্রথমবারের মত অস্কারের নমিনেশন পেলেন, কিন্তু অস্কার পেলেন না। ধৈর্য না হারিয়ে নিজের মত কাজ করে গেলেন আর ফলটা পেলেন ঠিক দুই বছর পরে। Glory সিনেমাতে best supporting role এর জন্য নিজের প্রথম অস্কারটি পান। এই সিনেমাতে একটি দৃশ্যে খালি গায়ে তার পিঠে চাবুক মারা হয় আর তিনি কোন শব্দ মুখে উচ্চারণ না করে শুধু নীরবে কাঁদতে থাকেন- এমন গায়ে কাঁটা দেয়া দৃশ্যে এরকম দুর্দান্ত অভিনয় দেখার পর অস্কার না দেয়াটা অনেক বেশি অমানুষিক হয়ে যায়! অস্কার পাওয়া পরে নিজের পারিশ্রমিক বাড়ানোর সাথে সাথে নিজের দায়িত্বকেও বাড়িয়েছিলেন তিনি। তার প্রমাণ হিসেবে ১৯৯২ সালে আফ্রো- আমেরিকান নেতা ম্যালকম এক্স এর চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেন ম্যালকম এক্স নামক ছবিতে। অনেকের মতে এত তার ক্যারিয়ারের সেরা কাজ, কিন্তু এই কাজের জন্য অস্কার নমিনেশন পেলেও অস্কার হাতছাড়া হয়ে যায় তার। যদিও এই সিনেমাতে তার সমালোচনা করার জন্য অনেকে একদম হাত ধুয়ে তার পিছে লেগেছিল। কারণ বাস্তবের ম্যালকম এক্সের উচ্চতা ছিল ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি আর তার উচ্চতা ছিল ৬ ফুট এক ইঞ্চি। বাস্তবের ম্যালকম এক্স অতটাও কালো ছিলেন না, কিন্তু তিনি একটু বেশিই (!) কালো ছিলেন- এগুলো ছিল সমালোচনার কারণ। কিন্তু লাভ হয়নি। নিজের প্রতিটি ক্যারেক্টারের জন্য অদ্ভুত রকমের হোমওয়ার্ক করে মাঠে নামা মানুষটির অভিনয়ের কাছে সব সমালোচনা তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল।

হোমওয়ার্ক এর আরও কিছু নমুনা শোনা যাক। ফিলাডেলফিয়া সিনেমাতে উকিলের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি দুইজন উকিলের সাথে সময় কাটিয়েছেন আদালতের বিষয়সমূহ বুঝতে। এই সিনেমাতে তার সাথে ছিলেন টম হেঙ্কস। টম কে এই সিনেমার জন্য ওজন কমাতে হত আর তাকে ওজন বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। টম বেশিরভাগ সময় না খেয়ে থাকতেন আর তিনি এই সুযোগে তমের সামনে এসে ইচ্ছে করে টম কে দেখিয়ে দেখিয়ে চকলেট খেতেন। কিন্তু টম এই কারণে কখনো অভিযোগ করেননি উল্টো বলেছেন- তার সাথে অভিনয় করা মানে কোন অভিনয়ের স্কুলের মাঝে অবস্থান করা।

পেলিক্যান ব্রিফ সিনেমাতে রিপোর্টারের ভূমিকাতে অভিনয়ের জন্য নিজের একটি সংবাদপত্রে বেশ কিছুদিনের জন্য কাজ করেছিলেন। সাথে অভিজ্ঞতা হিসেবে ছিল নিজের সাংবাদিকতার পড়াশুনা।

চরিত্রের জন্য এরকম খাটনি করা মানুষটার নাম ডেঞ্জেল ওয়াশিংটন। শরীরের চামড়ার রঙ, কম সিজিপিএ- কোনোকিছুই তাকে আটকে রাখতে পারেনি। দ্যা হ্যারিকেন সিনেমার জন্য এক বছরের মত বক্সিং এর ট্রেনিং নিয়েছিলেন। আর অভিনয়? সেটা শব্দে বর্ণনা করা কঠিন।

তবে অভিনয়ের আসল খেলাটা সম্ভবত দেখিয়েছিলেন ২০০১ সালে, সিনেমার নাম ট্রেনিং ডে। পুরো সিনেমা দেখলে যে কারো মনে হবে- ঠিক আছে ভাল অভিনয়, কিন্তু তাই বলে এই সিনেমার জন্য অস্কার? কিন্তু এই সিনেমার শেষ দোষ মিনিটে তার অভিনয় দেখলে যে কেও বলতে বাধ্য হবে- তাকে অস্কার দেয়াটাই সবার আগে দরকার! হ্যাঁ, অভিনয় জীবনের দ্বিতীয় অস্কার আর লিড রোলে প্রথম অস্কার তিনি এই সিনেমার জন্যই পান।

তবে তার অন্যতম জনপ্রিয় সিনেমা সম্ভবত ম্যান অন ফায়ার। এই সিনেমাতে তার করা রোলটি যেন শুধুমাত্র তাকে মাথায় রেখেই লেখা হয়েছিল। এছাড়া জন কিউ, আমেরিকান গ্যাংস্টার, ফ্লাইট, ডেজাভু, আন্সটপেবল, ইনসাইড ম্যান, ইকুয়ালাইজার হচ্ছে তার করা আলোচিত সিনেমার মধ্যে অন্যতম। তবে ব্যক্তিগত মতে তার করা অন্যতম পছন্দের একটি সিনেমা হচ্ছে- দ্যা গ্রেট ডিবেটরস।

পর্দায় বেশিরভাগ সময় দুর্ধর্ষ বা badass ক্যারেক্টার প্লে করলেও, বাস্তবে মানুষটি একেবারেই উল্টো। নিজের স্ত্রী আর চার সন্তানকে নিয়ে তার সুখের সংসার। বছরের যেকোনো একটি সময় পুরো ফ্যামিলিকে নিয়ে ইতালিতে বেড়াতে যান। নিজের শেকড় যেখানে সেই আফ্রিকাতে ১ মিলিয়ন ডলার দান করেছিলেন একবার। ছোটবেলায় একবার বাস্কেটবল খেলতে গিয়ে ডান হাতের কনিষ্ঠ আঙুলটি একদম ৪৫ ডিগ্রী কোণে বেঁকে দিয়েছিল, সেটি এখনও এই অবস্থায়ই আছে আর এই অবস্থায়ই তিনি নিজের সমস্ত স্টান্ট নিজে করতে পছন্দ করেন। বুক অফ এলি সিনেমার সময় সকল হ্যান্ড টু হ্যান্ড কমব্যাট তিনি নিজের হাতেই করেছেন। উচ্চতাভীতি থাকার পরেও আন্সটপেবল সিনেমার বেশিরভাগ দৃশ্য নিজেই করেছেন। এত দারুণ এক একটি সিনেমা করার সাথে অনেক দারুণ সিনেমা ছেড়েও দিয়েছেন তিনি, তবে সবচেয়ে বেশি আফসোস করেন সেভেন সিনেমার ক্যারেক্টার ছেড়ে দেয়ার জন্য যেটি পরে করেন ব্রাড পিট।

অনেকের সাথে এক বা একাধিকবার কাজ করার পরেও তার প্রচণ্ড ইচ্ছা মার্টিন স্করসিসের সাথে একবার হলেও কাজ করার। আর একটি ইচ্ছা আছে তার- রবার্ট ডি নিরো আর আল পাচিনোর সাথে কাজ করার।

“ট্রেনিং ডে এর জন্য অস্কার পাওয়ার পর অনেকে আমাকে বলেছিল- প্রথম অস্কারের জন্য অভিনন্দন! আমি বললাম- এটা তো প্রথম না, এর আগেও পেয়েছি একবার। তারা আমাকে বলল- আরে লিড রোলের জন্য তো এটাই প্রথম। তাদেরকে আমি বলি- তো? লিড রোল, সাইড রোল বলে কিছু নাই- আমার কাছে রোল হচ্ছে রোল। সব রোলের গুরুত্ব আমার কাছে সমান।’’ এই হচ্ছে আমাদের ওয়াশিংটন। সিনেমা জিনিসটা তার মতে একটি ম্যাজিকের মত আর অভিনেতাদের তার কাছে ম্যাজিশিয়ান লাগে- এই ম্যাজিকে আনন্দ পান বলেই তিনি ম্যাজিক করেন। আপনার কাছে অ্যাওয়ার্ড এর মূল্য কেমন? এর উত্তরে তিনি বলেন- অ্যাওয়ার্ড তো মানুষ দেয়, আর রিওয়ার্ড দেয় ঈশ্বর। আমি ভাগ্যবান- আমি দুটোই পেয়েছি। আমার জা আছে সবকিছুর কারণে আমি ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞ।

আমি জীবনের অনেক হতাশার সময়ে তাকে ছাড়লেও, তিনি আমাকে ছাড়েননি। এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমার জানা নাই। glory সিনেমার সেই বিশেষ সিন করার আগে আমি বারবার প্রার্থনা করছিলাম, তিনি সম্ভবত আমার প্রার্থনা শুনেছিলেন। আমার পিঠের আঘাত আমার একদম সত্যিকারের মনে হচ্ছিল, আর আমার চোখের পানিটা সেখানে একদম সত্যিকারের ছিল। এখানে কোন লজিক নেই, সাইন্স নেই, এটা শুধুই অনুভবের বিষয়।”

অসংখ্য অ্যাওয়ার্ড আর রিওয়ার্ড পাওয়া এই মানুষটার আজকে জন্মদিন। জন্মদিনের তাকে জানাই অনেক শুভেচ্ছা।

পুনশ্চ- হলিউডে মিলিটারি ইউনিফর্মে আর কাউকে সম্ভবত এতটা মানায় না, যতটা তাকে মানায়। এর প্রমাণ হিসেবেই সম্ভবত ইউনিফর্ম পড়া অবস্থায় ছয়টি সিনেমাতে কাজ করেছেন তিনি!   

আপনার কাছে কেমন লেগেছে এই ফিচারটি?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid
1 Star2 Stars3 Stars4 Stars5 Stars (1 votes, average: 5.00 out of 5)
Loading...
Ad

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য লেখাগুলো

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-

Ad