খেলা ও ধুলা

দল বদলেছে, হাথুরুসিংহে বদলাননি!

চন্দ্রিকা হাথুরুসিংহে দারুণ কোচ, তাতে কোন সন্দেহ নেই। তার ক্রিকেটীয় মস্তিস্ক অত্যন্ত প্রখর, সেটা নিয়েও কোন প্রশ্ন নেই। কিন্ত আমরা যারা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে খানিকটা হলেও অনুসরণ করি, তারা জানতাম, এই লোকটা যতোটা না ক্রিকেট বোঝে তারচেয়ে বেশি বোঝে রাজনীতি। চন্দ্রিকা দলের জয় যতোটা চাইতেন, তার চেয়ে বেশি চাইতেন ক্ষমতা। বাংলাদেশ ছেড়ে হাথুরু শ্রীলঙ্কার কোচের দায়িত্ব নিয়েছেন প্রায় এক বছর হয়ে এলো। ঢেঁকি যেমন স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে, তেমনই হাথুরুসিংহে শ্রীলঙ্কাতে গিয়েও শুরু করেছেন তার সেই চিরাচরিত আচরণ। এশিয়া কাপের ব্যর্থতার পরপরই ব্যর্থতার সব দায়ভার ওয়ানডে অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউসের ওপর চাপিয়ে দিয়ে তাকে সরিয়ে দিয়েছেন অধিনায়কত্ব থেকে!

গতবছর দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের পরে হুট করেই যখন চন্দ্রিকা হাথুরুসিংহে বাংলাদেশ দলের কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন, তখন সবাই বেশ অবাক হয়েছিল। শ্রীলঙ্কার দায়িত্ব নিয়ে হাথুরুসিংহে প্রথমেই যেটা করেছিলেন, সেটা হচ্ছে ওয়ানডে অধিনায়কের পদে অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউসকে ফিরিয়ে আনা। অনেকটা অনুরোধ করেই ম্যাথিউসকে অধিনায়ক বানিয়েছিলেন হাথুরু, ২০১৯ সাল পর্যন্ত যেন ম্যাথিউস অধিনায়কত্ব করেন, এমন অনুরোধ ছিল হাথুরুসিংহের।

শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ডের প্রধানের কাছে লেখা এক চিঠিতে এসব তথ্য জানিয়ে ম্যাথিউস দাবী করেছেন, নির্বাচকমণ্ডলী এবং হাথুরুসিংহে তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন! বাজে পারফরম্যান্সের কারণে এশিয়া কাপের গ্রুপপর্ব থেকেই দল বিদায় নিয়েছে, আর সেটার পুরো দায়ভারটা হাথুরুসিংহে তার ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছেন বলেই অভিযোগ ম্যাথিউসের। 

চন্দ্রিকা হাথুরুসিংহে, বাংলাদেশ, বিসিবি, শ্রীলঙ্কা, শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ড, মাশরাফি বিন মুর্তজা, অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস

এশিয়া কাপের ব্যর্থতা যে তার নেতৃত্ব কেড়ে নেবে, এমনটা ভাবেননি ম্যাথিউস, তিনি বলেছেন- “কোচ এবং নির্বাচকেরা যদি মনে করেন আমি ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি খেলার মতো ফিট নই এবং দলে জায়গা পাওয়ার মতো যোগ্য নই, তাহলে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নিয়ে নেব। আমি কখনো দলের বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।”

পুরনো কিছু স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের কোচ হিসেবে হাথুরুসিংহে যখন দায়িত্ব পালন করেছেন, তখন নিজেকে সর্বেসর্বা হিসেবে প্রমাণ করার একটা ব্যাপার কাজ করতো তার মধ্যে। প্রথম শ্রেণীর কোন ম্যাচ দেখতে কোনদিন স্টেডিয়ামে বা বিকেএসপিতে যাননি তিনি, অথচ দল নির্বাচনে তার কথাকেই শেষ কথা হিসেবে রাখতে চাইতেন হাথুরু! দলের ড্রেসিংরুমে তখন একটা দমবদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করতো তার কারণেই।

সাবেক প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদ পদত্যাগ করেছিলেন নির্বাচক প্যানেলে কোচের অন্তর্ভূক্তির প্রতিবাদে। পাড়ার ক্রিকেটের মতো মাঠের বাইরে থেকে বোলিং-ফিল্ডিং নিয়ন্ত্রণ করতে চাইতেন হাথুরুসিংহে! এই ব্যাপারগুলো নিয়ে খেলোয়াড়দের সঙ্গে তিনি বারবার বিতর্কে জড়িয়েছেন। শ্রীলঙ্কা সফরের মাঝপথে আন্তর্জাতিক টি-২০ থেকে মাশরাফির অবসরের ঘোষণাটাও হাথুরু আর বোর্ডের চাপেই দেয়া বলেও মনে করেন অনেকেই। 

বিসিবি, মাশরাফি বিন মুর্তজা, মাশরাফির অবসর, টি-২০

হাথুরুসিংহের এই পাওয়ার প্র‍্যাকটিসের ব্যাপারটা নিয়ে অজস্রবার কথা উঠেছে। হাথুরু টেকনিক্যালি দারুণ একজন কোচ, এটা স্বীকার করে নিয়েই সিনিয়র সাংবাদিকেরা লিখেছেন। তাকে কেবল ক্রিকেট নিয়েই ভাবতে বলা হোক। খেলোয়াড়েরাও বিসিবির কাছে অভিযোগ জানিয়েছে হাথুরুর স্বেচ্ছাচারিতার ব্যাপারে, দেশের ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থা বিসিবি সেই অভিযোগে কান না দিয়ে হাথুরুকে উল্টো অসীম ক্ষমতা দিয়েছে, সেই ক্ষমতা হাতে পেয়ে হাথুরুসিংহে ফ্র‍্যাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হয়েছেন দিনকে দিন!

বিসিবি কখনও এটা ভাবেনি যে, বাংলাদেশের ক্রিকেটে একজন মাশরাফি, মুশফিক বা রিয়াদের যা অবদান, হাথুরুর অবদান তার এক শতাংশও নয়। বিসিবি হয়তো কড়া একজন হেডমাস্টার টাইপের কোচ চেয়েছিল, হাথুরুকে পেয়ে তারা বলেছে- ‘পিটিয়ে মানুষ করেন মাস্টার সা’ব, মাংস না থাকলেও চলবে, খালি হাড্ডিটা আস্ত থাকলেই হবে…’ আর আমাদের বোর্ড প্রেসিডেন্ট তো ছিলেন তার ভীষণ ভক্ত! 

সাংবাদিক এবং শুভাকাঙ্ক্ষীরা যখন দিনের পর দিন লিখেছেন যে হাথুরুসিংহে দলের ভেতরে স্বৈরাচারী আচরণ করছেন, তখন বিসিবি সেসবে কান দেয়নি। যখন তিনি নিজে সুপারিশ করে সাকিবকে নিষিদ্ধ করেছেন, মুশফিককে বাদ দিতে চেয়েছেন, মাহমুদউল্লাহ বা মুমিনুল হককে বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছেন, তখনও বিসিবি পাত্তা দেয়নি কারো কথায়। অনেক সংশয়বাদীও বিশ্বাস করেনি, গাঁজাখুরী বলে এড়িয়ে গিয়েছে। তারা শুধু ম্যাচের রেজাল্ট দেখে হাথুরুর গুণগান গেয়েছে বরাবর। অথচ বাংলাদেশ দলের বদলে যাওয়ার কারিগর যতোটা না হাথুরু, তারচেয়ে বেশি মাশরাফি বিন মুর্তজা। মাশরাফি ওয়ানডে অধিনায়ক হবার পর থেকেই কিন্ত বাংলাদেশ টানা সাফল্য পেয়েছে। অথচ অনেকেই সেই সাফল্যকে হাথুরুর একক কৃতিত্ব বলে দাবী করে এখনও! 

চন্দ্রিকা হাথুরুসিংহে, বাংলাদেশ, বিসিবি, শ্রীলঙ্কা, শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ড, মাশরাফি বিন মুর্তজা, অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস

এই মাশরাফিকেই একটা সময়ে নিজের প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করেছিলেন হাথুরুসিংহে। কারণ তার একনায়কতন্ত্রের বিপক্ষে মাশরাফিই ছিলেন সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। ২০১৫ সালে ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে হাথুরু যখন রিয়াদকে বাদ দিলেন, মাশরাফি তখন অনুরোধ করে রিয়াদকে দলে রেখেছেন, রিয়াদের জন্যে একটা সুযোগ তিনি চেয়েছেন কোচের কাছে। সেই চান্সেই হাফসেঞ্চুরি হাঁকিয়ে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়েছিলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

গত বছর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে যখন আবার রিয়াদকে বাদ দেয়া হলো, মাশরাফি তখন সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, রিয়াদ দলে না থাকলে তিনি শ্রীলঙ্কাতেই যাবেন না! ২০১৫ সালেই বাজে ফর্মের অজুহাতে মুশফিককে দল থেকে বাদ দিতে চেয়েছিলেন হাথুরুসিংহে, মাশরাফি তখন বলেছিলেন, ‘অনেক কষ্টে গোছানো সংসার আমি এভাবে ধ্বংস করতে দেবো না।’ 

চন্দ্রিকা হাথুরুসিংহে, বাংলাদেশ, বিসিবি, শ্রীলঙ্কা, শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ড, মাশরাফি বিন মুর্তজা, অ্যাঞ্জেলো ম্যাথিউস

মাশরাফি নিজের জায়গায় শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বলেই হাথুরুসিংহে খুব বেশি ক্ষতি করার সুযোগটা পাননি হয়তো। বা মাশরাফির দলে ঝামেলা করে খুব একটা সুবিধা করতে পারবেন না বুঝতে পেরেই ফিরে গিয়েছেন নিজের দেশে। যাবার আগে শেষবারের মতো ছোবল তো বসিয়ে দিয়ে গিয়েছেন, তার কারণেই টি-২০ থেকে অবসর নিয়েছেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। নইলে এই দলটাকে নিয়ে আরও অনেক পরিকল্পনা ছিল ম্যাশের।

পরিকল্পনা নিশ্চয়ই ম্যাথিউসেরও ছিল, শ্রীলঙ্কা দলকে নিয়ে। তবে সেসবে পানি ঢেলে দিচ্ছেন হাথুরুসিংহে, যেমনটা দিয়েছিলেন বাংলাদেশ দলের কোচ থাকাকালীন সময়ে। পার্থক্য হচ্ছে, ভদ্রতা দেখিয়ে মাশরাফি-সাকিব-রিয়াদরা বরাবরই চুপ ছিলেন, কখনও কিছু প্রকাশ্যে আনেননি, কষ্ট পেলেও মুখ খোলেননি। ম্যাথিউস তেমনটা নন, তাই তিনি চিঠি লিখেই জানিয়েছেন হাথুরুসিংহের স্বেচ্ছাচারীতার ব্যাপারে।

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close