ইনসাইড বাংলাদেশরাজনীতি নাকি জননীতি

আপার জন্য মৃত্যুদূতকে আলিঙ্গন করেছিলেন তাঁরা…

তাঁর নাম ছিল রফিকুল ইসলাম। তিনি নাকি সবসময় আওয়ামীলীগের সমাবেশে উপস্থিত থাকতেন আর সমাবেশের শেষে নেতাকর্মী, উপস্থিত সাংবাদিকদের ‘আদা’ খাওয়াতেন! সবাইকে দেয়া শেষ হলে তিনি আদা নিয়ে যেতেন প্রিয় আপা শেখ হাসিনার কাছে। এজন্য সবাই তাঁকে ‘আদা চাচা’ বলেই ডাকতো! সেদিনও তিনি আদা নিয়েই গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই আদা নিয়ে যখন তাঁর প্রিয় আপার কাছে যাচ্ছিলেন ঠিক তখনই গ্রেনেড বিস্ফোরণ হয়। সবার প্রিয় আদা চাচার রক্তাক্ত দেহটা মঞ্চের পাশেই পড়েছিল।

নারায়ণগঞ্জের ক্ষুদ্র কাপড় ব্যবসায়ী আব্বাসউদ্দীন শিকদার ওরফে রতন শিকদার। এই মানুষটাকে নাকি আওয়ামীলীগের মিছিল মিটিং হলে একেবারেই বেঁধে রাখা যেত না। সবসময় মিছিলের আগে থাকতেন, স্লোগান ধরতেন। সেদিন সমাবেশে যাওয়ার আগে মা মমতাজ বেগমকে বলেছিলেন, তাড়াতাড়ি ফিরবেন। কিন্তু ফিরলেন না। তাঁর রক্তাক্ত শরীর যখন হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন পথে বারবার তিনি জিজ্ঞেস করছিলেন, নেত্রী বেঁচে আছেন তো! একথা বলতে বলতে একসময় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

ঢাকায় উচ্চ মাধ্যমিক পড়তে এসেছিলেন পটুয়াখালীর মামুন মৃধা। শেখ হাসিনা নামটার প্রতি ছিলেন যুক্তিহীন দুর্বল। প্রিয় নেত্রীকে একটিবার সামনাসামনি দেখবেন, কাছ থেকে দেখবেন সেই আশায় গিয়েছিলেন সেদিনের সমাবেশে। নেত্রীকে দেখেছিলেন ঠিকই কিন্তু এটাই তাঁর শেষ দেখা ছিল।

ল্যান্স কর্পোরাল অব.মাহবুবুর রশীদ। তিনি ছিলেন শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী। একের পর গ্রেনেড বিস্ফোরণ শেষ হওয়ার পর নেত্রী নাকি বললেন, ‘আমি যাবো না’। তিনি জোর করে নেত্রীকে গাড়ির দিকে টেনে নিয়ে যান। হঠাৎ সেইসময় শুরু হল গুলিবর্ষণ! একটা গুলি এসে লাগে তাঁর মাথায়! প্রিয় নেত্রীকে গাড়িতে তুলে দেয়ার পরই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি।

আজ সেই রক্তাক্ত ২১ শে আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি কালো দিন, একটি কালো অধ্যায়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেদিন আরো একটি ১৫ আগস্ট ও তার পরবর্তী প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। গ্রেনেড হামলার পরে, গুলিবর্ষণ। সবকিছুকে উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা মানব দেয়াল তৈরি করে তাদের প্রিয় নেত্রীকে রক্ষা করেছিলেন সেদিন। আইভী রহমান, আবুল কালাম আজাদ, রেজিনা বেগম, নাসির উদ্দিন সরদারসহ আরো ২৪ জন শহীদ হয়েছিলেন সেদিন।

আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম দলের ২০ তম জাতীয় সম্মেলনে, নিজ বক্তব্য দেয়ার মুহুর্তে বারবার বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের ইতিহাস ত্যাগের ইতিহাস। এই দল এখনো দাঁড়িয়ে আছে বিশাল ত্যাগের বিনিময়ে। পৃথিবীতে আর কোনো রাজনৈতিক দল নেই, যারা আওয়ামী লীগের মতো ত্যাগ স্বীকার করেছে।’

৭৫ থেকে ৯৬ প্রায় একুশ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল না। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগকে যেভাবে নেতৃত্বশূন্য করে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, কেউ কি ভেবেছিল যে স্বাধীনতা সংগ্রামকে নেতৃত্বদানকারী এই দল একুশ বছর পরে হলেও ক্ষমতায় আসবে! এই দল মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে? হয়তো কেউ ভাবেনি। কিন্তু কি অদ্ভুত, এই দল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, সকল ষড়যন্ত্রকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে। যার মূল কারণ হল, প্রথমত আওয়ামী লীগ শুধুমাত্র সংগঠন নয়। এটি একটি আদর্শের জায়গা। দ্বিতীয়ত, এই আদর্শকে ভালোবেসে বুকে লালনকারী কিছু অন্তঃপ্রাণ সাধারণ কর্মী। দলের প্রতি কর্মীদের এই ভালোবাসা এবং আবেগের জায়গাটা এত বিশাল, যেখানে সর্বোচ্চ ত্যাগের ব্যাপারটাও অনেক ফিকে যায় তাদের কাছে। জীবনের চেয়ে তখন নেত্রী ও দলের প্রতি তাদের অবিচল আস্থা এবং ভালোবাসা, বড় হয়ে দাঁড়ায়। ২১ শে আগস্ট দিনটি যেন তারই প্রমাণ দিয়ে যায় বারবার।

অনেকে সেদিন আহত বা পঙ্গু হয়েছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে তাদের নিয়ে যাওয়ার পর, সেখানে তারা চিকিৎসা পর্যন্ত পাননি। জানি না, আওয়ামীলীগ এর নেতারা তাদের কতটুকু খোঁজ নেন। কিন্তু দলের প্রতি, নেত্রীর প্রতি ভালোবাসা নিশ্চয় আগের মতোই আছে তাদের। আওয়ামী লীগ এসব মানুষদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই দাঁড়িয়ে আছে, থাকবে। এটাই তো প্রত্যাশা!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close