হাসান মাহবুব। লেখালেখি করছেন বেশ অনেক দিন হলো। বইমেলায় এর আগে গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হলেও এবারই প্রথম উপন্যাস বেরিয়েছে, মন্মথের মেলানকোলিয়া। চৈতন্যের স্টল নং ৬০৪-৬০৫ (উদ্যান চত্বর) এবং ৫৬ (লিটল ম্যাগ চত্বর)-এ পাওয়া যাচ্ছে বইটি।

* বাংলাদেশের ব্লগ কমিউনিটিতে আপনি একদম প্রথম দিককার মানুষ। দীর্ঘ দিন ধরে ব্লগিং করে চলেছেন, এবার প্রথমবারের মতো উপন্যাস বইমেলায়। ব্লগ থেকে বইমেলা- জার্নিটা কেমন ছিল?

– এবার প্রথমবারের মত উপন্যাস এলেও বই তো এর আগেও এসেছে। ৩টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। শুরুটা সেই ২০১২ সালেই। ২০১১ এর শেষের দিকে যখন কাঠপেন্সিল প্রকাশনীর বাকি বিল্লাহ ভাই আমার গল্পগ্রন্থ প্রকাশ করার প্রস্তাব দিলেন, তখন অভাবনীয় আনন্দের অনুভূতি হয়েছিলো। ঠিক তার আগের বছরই বই করতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হই একজন নামকরা প্রকাশকের কাছে, যার এডিটর প্যানেল মতামত দিয়েছিলেন যে আমার গল্প তখনও প্রকাশ উপযোগী হয় নি। ব্লগে গল্প লিখে এবং প্রচুর প্রশংসা পেয়ে হাওয়ায় উড়ছিলাম। তাই সেই ধাক্কাটা মনে হয় দরকার ছিলো। ২০১২-তে আমার প্রথম বইয়ের প্রচারে বড়ই বিব্রত থাকতাম। মানুষকে মুখ ফুটে বলতে কষ্ট হতো যে আমার বই বের হয়েছে, তোমরা কেনো। ফলে ব্লগে প্রচুর ফলোয়ার থাকলেও বেচাকেনা হয়েছিলো খুব কম। এই আড়ষ্টতা থেকেই মাঝখানের ৩ বছর আর বই বের করা হয় নি। শুধু লিখে গেছি। এখন লিখি, বই বের করার চিন্তা করি, বেচাবিক্রি করার চেষ্টাও করি ভালোভাবেই। এই যা বদল!

* ‘মন্মথের মেলানকোলিয়া’- উপন্যাসটি লেখার কোন পর্যায়ে এর নামকরণ করেছেন? বা, এমন কি হয়েছে যে এর আগে অন্য কোনো নাম ভেবেছিলেন? নামকরণের পেছনের গল্প যদি আমাদের সাথে শেয়ার করতেন!

– নামকরণের পেছনে আসলে তেমন কোন গল্প নেই। এমনি ভাবতে ভাবতেই চলে এসেছে। তবে এই নামটি একটি জার্মান নিহিলিস্ট মুভির দ্বারা প্রবলভাবেই প্রভাবিত। সিনেমাটির নাম হলো Melancholie der Engel (ইংরেজিতে The Angels’ Melancholia)। সিনেমাটির সাথে অবশ্য এই উপন্যাসের কাহিনীর কোনো মিল নেই। কিন্তু হঠাৎ করে এই নামটি আমাকে ইংগিত দিলো যে উপন্যাসের জন্যে এমন একটি নামই প্রয়োজন। এরপর আর বেশি ভাবি নি। এর আগে অন্য কোন নাম ভাবি নি। তবে এর পরে আরেকটি নাম ভেবেছিলাম। ‘ঝিনুকতারা’। নামটি আমার খুব পছন্দের হলেও কাছের অনেকের তীব্র বিরোধীতায় আমি পিছু সরে আসি। এই নামটি অন্য কোথাও অবশ্যই ব্যবহার করবো।

উপন্যাসের তৃতীয় অধ্যায় লেখার পর সম্ভবত নামকরণের ব্যাপারটি মাথায় আসে।

* আপনি ‘অন্যরকম গ্রুপ’-এ কর্মরত আছেন। আরও স্পেসিফিকভাবে বললে অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্সের সাথে। চাকরি, সংসার সামলে বই লেখার পেছনে সময় কীভাবে বের করতেন?

– অন্যরকম গ্রুপ এবং অন্যরকম বিজ্ঞানবাক্সের মাঝে একটি মিসিং লিংক আছে। সেটি হলো- অন্যরকম ইলেকট্রনিক্স। অন্যরকম ইলেকট্রনিক্স হল অন্যরকম গ্রুপের একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। আর বিজ্ঞানবাক্স হল অন্যরকম ইলেক্ট্রনিক্সের একটি প্রোডাক্ট।

উপন্যাসের জন্যে সময় বের করা আসলেই কঠিন ছিলো। আমি প্রথমে একটি লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করি, ৩০,০০০ শব্দ লিখবো ১০০ দিনে। প্রতিদিন ৩০০টি শব্দ। মানে ১ পৃষ্ঠার মত। খুব বেশি না। তবে মাঝখানে প্রচুর সময় লেগেছিলো একটি ক্যারেকটার নিয়ে পড়াশোনা করতে গিয়ে। খোলাসা করেই বলি, আমার উপন্যাসে একটি কুকুরের চরিত্র আছে। তার মনের ভেতরটা কেমন এটা জানার জন্যে স্টাডি করেছি, মানুষের সাথে কথা বলেছি, নিজের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেছি। ফলে ডেডলাইন অতিক্রম হয়ে যায়।

আমার লেখার সময় ছিলো মূলত অফিসের পরে, মানে সন্ধ্যা ৬টার পরের কিছু সময়। মাঝে মাঝে বৃহস্পতিবার রাতেও লিখেছি। তবে সেটা খুব ক্লান্তিকর ছিলো। আমাদের প্রত্যেকেরই প্রতিদিন কিছু না কিছু অবসর সময় থাকে। সে সময় হয়তো আপনি সিনেমা দেখেন, বা বই পড়েন, বা গান শোনেন, বা ফেসবুকিং করেন। সেই সময়গুলো থেকেই কিছু সময় বই লেখার পেছনে দিয়েছি। তারপরেও প্রচুর সময় অপচয় হয়েছে বলবো। আমরা আসলে নিজেদের যতটা ব্যস্ত ভাবি, ততটা ব্যস্ত না। উপন্যাস লিখতে গিয়ে এবং না লিখে সময় নষ্ট করার মুহূর্তে এটি অনুভব করেছি।

* কোন গল্প/উপন্যাস আপনার সবচেয়ে বেশি পছন্দের?

– উপন্যাস- হুমায়ূন আহমেদের বহুব্রীহি, মন্দ্রসপ্তক, সুনীলের সেই সময়, স্বপ্ন লজ্জাহীন, এরিক মারিয়া রেমার্কের যা পড়েছি সব, মারিও পুজোর দ্যা গডফাদার, জেরোম কে জেরোমের থ্রি মেন ইন আ বোট, পিজি ওডহাউজের সব উপন্যাস, জ্যাক লন্ডনের হোয়াইট ফ্যাং, গৌরকিশোর ঘোষের কমলা কেমন আছে, হুমায়ূন আজাদের মানুষ হিসেবে আমার অপরাধসমূহ এবং ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল, আহমদ ছফার গাভী বিত্তান্ত। প্রিয় গল্প- হুমায়ূন আহমেদ, আন্তন চেখভ, মানিক বন্দোপাধ্যায়, বিমল মিত্র, শহিদুল জহির, মোস্তাফিজ রিপন, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং শাহাদুজ্জামানের অনেক গল্প। এই মুহূর্তে মনে পড়ছে শাহাদুজ্জামানের ক্যালাইডোস্কোপ এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের দোজখের ওম আর অন্যঘরে অন্যস্বরের কথা।

* বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লেখালেখিকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া কি সম্ভব বলে মনে করেন?

– না।

* একটু ভিন্ন প্রশ্ন। আপনার ওয়ার্কস্টেশনের মূল টার্গেট অডিয়েন্সই হচ্ছে বাচ্চারা এবং তাদের বাবা-মা। তো প্যারেন্টিংকে আপনি আপনার দিক থেকে কেমন করে ভাবেন?

– এটা তো আসলে ব্যাপক আলোচনার দাবী রাখে! এখন শৈশবকাল যাচ্ছে ক্রান্তিলগ্নের ভেতর দিয়ে। শিক্ষা ব্যবস্থার নাজুক অবস্থা, হাতের নাগালে প্রযুক্তি, যার সীমাহীন ক্ষমতা! প্রযুক্তিকে এড়িয়ে যাবার উপায় নেই, দরকারও নেই। তবে সেটা যেন সে ভালো কাজে ব্যবহার করে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। বাচ্চা আপনার ইচ্ছাপূরণের আশ্চর্য প্রদীপ না। আপনার ইচ্ছাকে তার ওপর চাপিয়ে দেবেন না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার হাল করুণ। কবে কোন মহামানব আলোকর্তিকা হাতে নিয়ে এসে সিস্টেম পালটে দেবে, সেই অপেক্ষায় থাকলে আর হয়েছে! আপনি নিজেই হাল ধরুন। সিলেবাসের পড়ার বাইরেও আরো অনেক পড়া আছে, সেগুলো শেখান। প্রযুক্তির প্রতি অতি নির্ভরতা কমান। বাচ্চা খুব কাঁদছে বা জেদ করছে, তাই হাতে একটা মোবাইল বা ট্যাব ধরিয়ে নিজে ফেসবুকিংয়ে বসে গেলেন, এরকম করলে হবে না! টিভি দেখার সময় বেঁধে দিন। তাকে ঘুরতে নিয়ে যান, তাকে সময় দিন। পিস্তল-বন্দুক খেলনা হিসেবে দেবেন না। আমাদের বাচ্চারা যেভাবে সময় কাটাচ্ছে, তার কতটুকুকে “কোয়ালিটি টাইম” বলা যায় সেটা নিয়ে ভাবুন, তাহলেই অনেক কিছুর উত্তর পেয়ে যাবেন।

* সাধারণত দিনে কিংবা রাতের কখন লিখতে বসলে একের পর এক শব্দের গাঁথুনি খুব পোক্ত হয়?

– আমার অধিকাংশ লেখাই গভীর রাতে লেখা। কিন্তু এখন রাতে খুব কমই লেখা হয়। কানে হেডফোন গুঁজে নিজের ডেস্কে যেকোন সময় লিখতে পারি। শুধু যদি কেউ বিরক্ত না করে অন্য কাজে!

* সর্বশেষ সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী কাজুও ইশিগুরো মাত্র চার সপ্তাহেই উপন্যাস লিখতে পেরেছিলেন। আপনাকে যদি একদম মুক্তভাবে লেখার স্বাধীনতা দেওয়া হয় চাকরি থেকে ছুটি নিয়ে, আপনি কত দিনে একটি উপন্যাস লিখতে পারবেন?

– আমি আসলে খুব ডি-ফোকাসড মানুষ। একসাথে অনেককিছু করতে আমার ভালো লাগে। লেখালেখির ক্ষেত্রেও আমি এমনই। লেখার জন্যে এক মাস ছুটি নিলে আমি সম্ভবত বেশিরভাগ সময় ঘুমিয়েই কাটাবো। তবে হ্যাঁ, একটু বাড়তি স্পেস তো অবশ্যই দরকার! তা পেলে মাস তিনেকের মধ্যে উপন্যাস লেখা যেতে পারে।

* বাংলাদেশে সবচাইতে পছন্দের লেখক কে? বাংলা ভাষার সেরা লেখক কাকে মনে হয়?

– বাংলাদেশে হুমায়ূন আহমেদ। বাংলা ভাষার সেরা লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।

* শেষ প্রশ্ন- যদি কোনো কারণে এবার পাঠকদের প্রত্যাশিত সাড়া না পান, বই লেখা কি ছেড়ে দেবেন?

– প্রশ্নই ওঠে না! তবে হতাশ হবো কিছুটা। খুব বেশি হতাশ হবো যে তাও না, কারণ আমি জানি পাঠক আমার কাছে এর চেয়ে অনেক ভালো ডিজার্ভ করতেই পারে। গল্পের ক্ষেত্রে আমি মনে করি পাঠককে যথেষ্টই দিয়েছি, উপন্যাস নিয়ে নতুন প্লট ইতিমধ্যেই চলে এসেছে। আর গল্প তো লিখবোই! আর লিখলে তা পাঠককে না পড়ালে হবে কীভাবে! লিখতে তো আমাকে হবেই!

Comments
Spread the love