ইনসাইড বাংলাদেশযা ঘটছে

মাইরের উপর কোন ওষুধ নাই!

সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, আবহাওয়া অফিস জানাচ্ছে, ধেয়ে আসছে ঘূর্ণিঝড় তিতলি। সেটা বাংলাদেশে আসবে নাকি ভারতেই থেকে যাবে, এটা নিয়েও হচ্ছে গবেষণা। দিনের আলো নেই পুরোপুরি, খানিকটা অন্ধকার আভা চারদিকে। এমন সকালগুলোকে ‘শুভ’ বলার কোন কারণ নেই। তবে সকালটা শুভ হয়ে গেল হুট করেই, ফেসবুকে ঢোকার পরে। কিংবা বলা যায়, ফেসবুকে আপলোড করা একটা ভিডিও দেখে। 

সকালে আপলোড করা সেই ভিডিওতে বিচিত্র একটা দৃশ্য দেখা গেল। মানুষভর্তি একটা বাসের মধ্যে একজন লোককে কষে পেটাচ্ছে এক কিশোরী! চড়-থাপ্পড়-কিল-ধমক সবকিছুই সেখানে আছে। বাসে থাকা লোকজনের মধ্যেও কেউ কেউ হাত লাগাচ্ছে সেখানে, কেউ আবার মাফ চেয়ে ছেড়ে দিতে বলছে! শেষমেশ মোটামুটি ঘাড় ধাক্কা দিয়েই লোকটাকে নামিয়ে দেয়া হলো বাস থেকে। কিন্ত কি ঘটেছিল বাসের ভেতরে? কলেজপড়ুয়া মেয়েটি কেন এমন রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছিল বাসের ভেতরে? 

ফেসবুকে যিনি এই ভিডিওটা আপলোড দিয়েছেন, সেই জেবা সাজিদা মৌ তার ভিডিওর ক্যাপশনে প্রথমে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা না লিখলেও, পরে সেটা যোগ করে দিয়েছেন। বাসের ভেতরে যে ঘটনাটা ঘটেছিল, সেটা জেবা সাজিদা মৌ’য়ের ভাষাতেই তুলে ধরা হলো- 

সবুজ শার্ট পরিহিত এই (অ)ভদ্রলোকই বাসে পিটুনী খেয়েছেন কলেজছাত্রীকে হেনস্থা করতে গিয়ে

“ঘটনাটি ঘটে আজ সকাল ঠিক ১০টার দিকে দিশারী বাসে – শ্যামলী থেকে লক্ষ্য করছিলাম আমার থেকে দুই সিট সামনের কলেজ ড্রেস পড়া মেয়েটা রাগান্বিতভাবে বার বার পেছন ফিরে আমার সামনের লোকটাকে কিছু বলছে, একবার শুনলাম “হাত সরান”। আমি মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলাম কোন প্রবলেম কিনা, সে জানালো পরে বলবে। তারপর বাস ফার্মগেটে তার কলেজের সামনে আসার পর মেয়েটা ঘুরে লোকটাকে ধমকানো শুরু করলো, তখন তার কথায় বোঝা গেল যে লোকটা নাকি ৫/৬ বার সিটের ফাঁকা গলে তার গায়ে হাত দেবার চেষ্টা করেছে। সে এতক্ষণ অপেক্ষা করছিল তার কলেজের এরিয়াতে আসার, তারপর সে রিয়েক্ট করেছে। লোকটা সর‍্যি বলা শুরু করলো।”

“বাসের পাবলিক যথারীতি “ছেড়ে দাও মা”, “সর‍্যি বলসে তো” বলে তাদের ট্রাডিশনাল ঘ্যান ঘ্যান শুরু করে দিল। তখন বাসে আমি মেয়েটার হয়ে প্রতিবাদ করলাম এবং তাদেরকে বললাম মেয়েটা যা করছে তাকে করতে দেন। আমার সাথে আরো কিছু আংকেলের বয়সী লোক তাল মেলালেন , “হ্যা সর‍্যি বললেই তো হবে না, বাস থেকে নামেন।” তারপর মেয়েটা কাউকে তোয়াক্কা না করে লোকটাকে মারতে লাগল, এবং সাথে সাথে পুরো বাস ঠান্ডা।”

“তারপর দেখলাম সবাই বেশ মেয়েটার পক্ষে কথা বলছে আর লোকটাকেও চড় থাপ্পড় দিচ্ছে। বলতেই হবে শুরুতে দুর্বলচিত্তের কিছু লোক বাধা দিলেও আসলে বাস ভর্তি “মানুষ” ছিল, ওই জানোয়ারটার মত পটেনশিয়াল রেপিস্ট ছিল না। আর লোকটা দুর্বল গলায় একটা কথাই বলছিল, “আপু আপনি আমাকে বলতে পারতেন আমি হাত সরাই নিতাম।” এ কথা বলার পর মাইর আরো কয়টা বেশি খাইসে সে। তারপর আবার এটাও বলার ট্রাই করেছে যে সে নাকি ঘুমিয়ে ছিল, কই হাত গেসে টের পায়নি, যেটা ভিডিওতেও আপনারা দেখছেন বা শুনতে পাচ্ছেন।” 

প্রতিবাদকারী সেই ছাত্রীকে শান্ত হবার অনুরোধ করছেন অন্যান্য যাত্রীরা

জেবা সাজিদা আরও লিখেছেন- “লোকটাকে বাস থেকে নামিয়ে দেবার পর সে ফার্মগেটের ফুটপাতে যে আমড়া ওয়ালা থাকে সেখানে গিয়ে আমড়া খেতে শুরু করলো, এত বড় পাবলিক শেইম, পাবলিকের মার খেয়ে বাস থেকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়া এসব যেন কিছুই ঘটেনি। সে নির্দোষ হয়ে থাকলে এত স্বাভাবিকভাবে নিতে পারতো কি পুরো ঘটনাটা? নির্বিকার ভাবে আমড়া চিবুতে পারতো? এই দৃশ্য দেখে বাসের সবাই লোকটাকে ড্রাগ এডিক্ট বলে মন্তব্য করছিল। যারা লোকটাকে ইনোসেন্ট ভাবছেন তাদের কাছে প্রশ্ন, এই পার্ভার্টটা তো আপনার বোনের গায়েও হাত দিতে পারত। আপনি পারতেন আপনার বোনের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলতে? পারতেন ওই বিকৃত মস্তিষ্কের লোকের হয়ে বিনা স্যালারিতে সাফাই গাইতে?” 

অবাক করার মতো বিষয় কি জানেন? সকালে যখন ফেসবুকে এই ভিডিওটা আপলোড করা হলো, সেটা ভাইরাল হতে সময় লাগেনি। অনেকেই তখন ঘটনার সত্যতা নিয়ে সন্দেহ করেছিলেন, অযথা লোকটাকে ফাঁসিয়ে দেয়া হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্নও তুলেছিল কেউ কেউ! কি অদ্ভুত ব্যাপার, তাই না? জঘন্য রকমের খারাপ কিছু না ঘটলে একটা ষোল-সতেরো বছর বয়েসী কিশোরী, যে কিনা ইউনিফর্ম পরে কলেজে যাচ্ছিল, সে কোন যুক্তিতে কারো গায়ে হাত তুলবে? এই সামান্য ব্যাপারটুকুও অনেকের মাথায় ঢোকে না, কারণ তারা সব ব্যাপারে, সব ঘটনায় মেয়েদের দোষ খুঁজতেই ব্যস্ত থাকে। 

এই বিশাল লেখাটার পরে আর বেশি কিছু যোগ করার থাকে না। চলন্ত বাসে টাঙ্গাইলের রূপাকে ধর্ষণের পরে হত্যা করা হয়েছিল। এরপরেও বাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, ভবিষ্যতেও যে ঘটবে না এরকম কোন নিশ্চয়তাই নেই। এদেশের গণপরিবহনগুলোতে প্রতিদিনই নারী যাত্রীদের চরম হেনস্থার শিকার হতে হয়, ঢাকা শহরে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে চড়েছেন, অথচ শরীরে অবাঞ্ছিত স্পর্শ পাননি, এমন নারী বোধহয় একজনও নেই। এর আগে ঢাকায় বাসের ভেতরে প্রকাশ্যে হস্তমৈথুন করতেও দেখেছি আমরা, শুনেছি কাঁচি দিয়ে মেয়েদের পরনের কাপড় কেটে দেয়ার মতো বিকৃতমনস্ক কিছু অমানুষের অদ্ভুত কীর্তির কথাও। 

এরপরেও তিনি হাসার চেষ্টা করছেন!

একটা কথা প্রচলিত আছে, মাইরের ওপরে নাকি আর কোন ঔষধ নাই। মানুষের পোষাক পরে আমাদের চারপাশে ঘুরে বেড়ানো এই পশুগুলোকে থামানোর একটাই উপায়, যেখানে এদের ধরা হবে, সেখানেই যেন উচিত শিক্ষা দিয়ে দেয়া হয়। আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার কথা বলা হচ্ছে না, কিন্ত প্রতিরোধটা গড়ে তুলতে হবে। এই অমানুষগুলোকে বুঝিয়ে দিতে হবে যে, এটা কোন মগের মুল্লুক নয়। তাতেও হয়তো তাদের বোধদয় হবে না। এই বীরপুঙ্গবটিই যেমন মার খেয়ে বাস থেকে নেমে আমড়া চিবিয়ে খেতে ব্যস্ত হয়ে গেল! এদের আসলে কোন কিছুতেই শিক্ষা হয় না, লাজলজ্জা বলে কোন বস্তু তো নেই এদের মধ্যে! 

পাদটীকাঃ যে বোনটি বাসের ভেতরে আজ এই দুঃসাহসিক কাজটি করেছেন, তার জন্যে ‘এগিয়ে চলো’র পক্ষ থেকে অগুনতি ভালোবাসা। যে সাহসটা তিনি আজ দেখিয়েছেন, সেট এদেশের প্রত্যেক নারী, প্রত্যেক তরুণী কিংবা কিশোরীর বুকের ভেতরে থাকাটা খুব জরুরী। সবাই যখন ‘মান-সম্মানের’ ভয়ে চেপে যায় সবকিছু, কিংবা চেপে যেতে বাধ্য করা হয় তাদের, সেখানে তিনি সাহস করে গর্জে উঠেছেন, ধরে উত্তম-মধ্যম দিয়েছেন উত্যক্তকারীকে। এই সাহসটার জন্যে হলেও রাস্তাঘাটে কিংবা চলন্ত বাসে মেয়েদের গায়ে হাত দেয়ার আগে কাপুরুষেরা দুইবার হলেও ভাববে, একটু ভয় পাবে। 

আরও পড়ুন- 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close