আজকের গুগল ডুডলটা কেউ খেয়াল করলে দেখতে পেতেন চোখে চশমা পরা একজন বিজ্ঞানী নিবিষ্টমনে গবেষণাগারে গবেষণা করে যাচ্ছেন। সেই বিজ্ঞানীর জন্মদিনেই আজকে শ্রদ্ধা জানিয়ে গুগল ডুডলটি প্রকাশ করেছে।

তিনি ছিলেন একজন নোবেল বিজয়ী প্রাণরসায়নবিদ। এই রত্নগর্ভা উপমহাদেশের কোলে জন্মেছেন প্রাচীনকালের আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত থেকে শুরু করে বর্তমানকালের সি.ভি.রমণ, সুব্রহ্মণ্যন চন্দ্রশেখর, আব্দুস সালাম, কুদরাত-ই-খুদা, সত্যেন্দ্র নাথ বোস, শ্রীনিবাস রামানুজন, স্যার জগদীশ চন্দ্র বোস সহ আরো অনেক কিংবদন্তীরা! ড. হরগোবিন্দ খোরানা তেমনি এই উপমহাদেশের এক সুযোগ্য সন্তান। ১৯২২ সালের আজকের এই দিনে তিনি ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্গত পাঞ্জাবের রায়পুর গ্রামে জন্ম নেন ।

তিনিই সর্বপ্রথম কোষের কার্যসম্পাদনকারী প্রোটিন কিভাবে জেনেটিক সংকেত (genetic code) থেকে প্রস্তুত হয়ে থাকে তা প্রদর্শন করেন। এমিনো এসিড সংশ্লেষণের সাথে কোডনের সম্পর্ক নির্ণয় বেশ বড় একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছিল তখনকার বিজ্ঞানীদের কাছে। কিন্তু এই সমাধান পূর্ণাংগ রূপে দিতে সমর্থ হন হরগোবিন্দ খোরানা। তিনিই প্রথম সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করলেন যে সব জেনেটিক কোডন তিনটি নাইট্রোজেন ক্ষার দ্বারা গঠিত এবং আমাদের আর এন এ তে থাকা চার ধরণের নাইট্রোজেন ক্ষারকে নিয়ে বিভিন্নভাবে সাজালে এরকম মোট ৬৪ টি বিন্যাস পাওয়া সম্ভব। এরই মধ্য দিয়ে তিনি বিজ্ঞানীদের জন্য তিনি তৈরি করে ফেললেন একটি জেনেটিক কোড বা সংকেতের একটি পুর্নাঙ্গ “অভিধান” (“dictionary” ) যাতে প্রতিটি এমাইনো এসিডকে সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা আছে। তিনি নিরেনবার্গকে সাথে নিয়ে এও আবিষ্কার করলেন যে প্রাপ্ত এই শব্দগুলোই নির্ধারন করে সঙ্কেতের কোথা থেকে শুরু করতে হবে এবং কোথায়ই বা তা পড়া শেষ হবে। ১৯৬৮ সালে মার্শাল ডব্লিউ নিরেনবার্গ ও রবার্ট ডব্লিউ হোলির সঙ্গে ফিজিওলজি ও মে়ডিসিনে নোবেল পান খোরানা।

আরও পড়ুন- একজন নোবডি থেকে সাত হাজার কোটি টাকার মালিক হবার গল্প!

১৯৭২ সালে তিনি আরেক বিস্ময়ের সূচনা করেন। হাতের কাছে পাওয়া বিভিন্ন সহজলভ্য জিনিস থেকে তিনি কৃত্রিম জিন তৈরি করার কৃতিত্ব দেখান এবং সেই জিনের কার্যকারিতা ব্যাক্টেরিয়ায় উপর কিরূপে প্রভাব ফেলে তাঁর বিশদ ব্যখ্যা উপস্থাপন করেন। এরপরে তিনি মেরুদণ্ডী প্রাণীদের চোখের আণবিক গঠন নিয়ে গবেষণা করেন। রড কোষের জিনগত পরিবর্তন কিভাবে রেটিনার প্রদাহ কিংবা রাতকানার মত রোগের সৃষ্টি করে সেটি নিয়ে তিনি গবেষণা করেন। ১৯৬৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল মেডেল অব সায়েন্স পান তিনি। এর দু’বছর পর ১৯৬৮ সালে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লুইসা গ্রস হরউতজ পুরস্কার জেতেন খুরানা। ১৯৭৮ সালে তিনি রয়্যাল আকাদেমির “ফরেন মেম্বার” হিসেবে নির্বাচিত হন।

তিনি লাহোরের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৩ সালে স্নাতক এবং ১৯৪৫ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ড. খোরানা ১৯৫১ সালে যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যার আলেকজান্ডার টড এর তত্ত্বাবধানে নিউক্লিক এসিড বিষয়ে গবেষণা করেন। তারপর পোস্ট ডক্টরেট অর্জনের জন্য সুইজারল্যান্ডের জুরিখে অবস্থিত সুইচ ফেডারেল ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজিতে গমন এবং ১৯৫২ সালে ভ্যাঙ্কুভারের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় যোগদান। ১৯৬০ সালে ম্যাডিসনের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে তিনি ম্যাসাচুসেট্‌স ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজিতে যোগদান করেন এবং ২০০৭ সাল পর্যন্ত সেখানে শিক্ষকতা করেন। ২০১১ সালের ৯ নভেম্বর ৮৯ বছর বয়সে তিনি ম্যাসাচুসেটস এ মৃত্যুবরণ করেন। এই মহান বিজ্ঞানীর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা!

সহায়িকা-

১. http://news.mit.edu/2011/obit-khorana-1110
২. http://www.nytimes.com/2011/11/14/us/h-gobind-khorana-1968-nobel-winner-for-rna-research-dies.html?_r=0
৩. https://www.google.com/doodles/har-gobind-khoranas-96th-birthday

লেখক-

অতনু চক্রবর্ত্তী
শিক্ষার্থী
অণুজীববিজ্ঞান বিভাগ, পুসান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
দক্ষিণ কোরিয়া

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-