মেয়েটির বাড়ি ভারতের কেরালায়। রসায়নের ছাত্রী পড়ছেন কলেজের থার্ড ইয়ারে। কিন্তু, তার জীবন অন্য দশজন মেয়ের মতো নয়। পড়ালেখার খরচ যোগাতে হানানকে বেছে নিতে হয়েছে বাজারে মাছ বিক্রির কাজ, এজন্যে ব্যাঙ্গাত্মক তীর্যক মন্তব্যও শুনতে হয়েছে তাকে।

হানান হামিদের পিতা কন্যাদায় এড়িয়ে অনেকদিন আগেই সংসারত্যাগী হয়েছেন। নেশাগ্রস্থ লোকটার ছিলো মদ্যপানের বদঅভ্যাস। নিজেকেই ঠিকঠাক সামলাতে পারতেন না, সংসার সামলাবেন কি করে! তাই সংসারত্যাগ করে সব দায় এড়িয়ে যেন বেঁচে যেতে চাইলেন। তাতেই নিঃসঙ্গ সমুদ্রে গিয়ে পড়ল হানান হামিদ। একদিকে পড়ালেখা চালিয়ে যেতে হবে, আরেকদিকে দেখতে হবে সংসার। দুটোই একসাথে কিভাবে হবে ভেবেই চিন্তাগ্রস্থ হয়ে যেত সে।

হানান হামিদের পরিবারের ট্র‍্যাজেডির শেষ এখানেই নয়। তার মা যেনো থেকেও নেই! অনেকদিন হল মানুষটা মানসিক ভারসাম্যহীন। এই অবস্থায় হানান কি করবে?

কেরালা, বন্যা, হানান হামিদ, অনুপ্রেরণার গল্প

আমাদের বাবা চাচারা গল্পের সময় কিভাবে তারা ছোট বেলায় মাইলের পর মাইল হেঁটে পড়াশুনা করতে যেত সেই কথা বলে ব্যঙ্গ করত। হানানের গল্পটা শুনলে তারা কি বলবেন? যেখানে তার কলেজ সেটি বাড়ি থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে। এতো দূরের কলেজে কিছু পথ হেঁটে কিছু পথ সে যায় লোকাল বাসে। পড়ালেখা টিকিয়ে রাখতেই তাকে প্রতিদিন এই ক্লান্তিকর যাত্রার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে সংসার কি করে চলবে সেটাও তো মাথায় রাখতে হয় তাকে। তাই সারাদিনের ধকল সামলে রাতে তিনটার দিকে সে বেরিয়ে পড়ে সাইকেল নিয়ে। চম্বক্করার পাইকারি বাজার থেকে মাছ কিনে সেসব বিক্রি করতে নিয়ে যায় রেলস্টেশনে। তারপর আবার সেই ৬০ কিলোমিটার পেরিয়ে কলেজযাত্রা।

এই খবরটি মালায়ালাম অঞ্চলে খবরে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ মেয়েটিকে পড়ালেখা ও জীবন সংগ্রামে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসে। সে অনেকের কাছ থেকেই অর্থনৈতিকভাবে সাহায্য পায়। এসব ক্ষেত্রে যা হয়, কিছু মানুষ মেয়েটির স্ট্রাগলকে হেয় করে, তারা ট্রল করে বলে এসব মিথ্যা।

তবে হানানের কলেজের প্রিন্সিপাল থেকে শুরু করে তার বন্ধুরা সবাই মেয়েটির স্ট্রাগলের কথা জানত। তাদের কেউ কেউ সাহায্য করতে চাইলেও মেয়েটি গ্রহণ করতে চায়নি সেসব। যাই হোক, হানানের গল্প ভাইরাল হওয়ার পর থেকে সে অনেকের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য পায়৷ ট্রলের শিকার হওয়া জীবনযোদ্ধা মেয়েটি কি করেছে জানেন?

কেরালা, বন্যা, হানান হামিদ, অনুপ্রেরণার গল্প

সম্প্রতি কেরালায় ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। গত এক শতাব্দীর মধ্যে এটিকে বলা হচ্ছে কেরালার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দূর্যোগ। নয়দিনেই মারা গেছে কেরালার ৩২৪ জন মানুষ। হানান তার প্রাপ্ত অর্থ থেকে দেড়লাখ রুপি বন্যার্তদের জন্য করা মুখ্যমন্ত্রীর তহবিলে দান করেছে!

তার কথা হল, “অর্থগুলো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া, আমি খুশি এই টাকাগুলো আমি তাদেরই দিতে পারছি যাদের এই মুহুর্তে এটা সবচেয়ে বেশি দরকার।”

যারা তাকে ট্রল করেছে তারা নিশ্চয়ই এখন অনুতাপে ভুগছে। কাউকে না জেনেই বিচার করা যে উচিত নয়, কাজের মধ্য দিয়ে সেই জবাবটাই দিলো হানান হামিদ।

তথ্যসূত্র-  টাইমস অফ ইন্ডিয়া

আরও পড়ুন-

Comments
Spread the love