সিনেমায় সেন্স অব হিউমারের প্রায়োগিক ব্যবহারে সফল গুণী নির্মাতাদের মধ্যে তৌকীর আহমেদের অবস্থান সারির একেবারে প্রথমদিকেই। যার প্রমাণ তাদের পূর্বের কাজগুলো থেকে ইতিপূর্বেই আমরা দেখতে পেয়েছি। সেই সাথে বিষয়বস্তু নির্বাচনের দিক থেকেও নির্মাতা বরাবরই বৈচিত্র্য এবং অভিনবত্ব সন্ধানী। তাই তৌকীর আহমেদের সিনেমা মানেই যেন মৌলিক গল্পের বাস্তব জীবনের প্রতিচ্ছবি। সেজন্য দর্শক হিসেবে প্রত্যাশিতভাবে এবারও সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই “হালদা” দেখতে যাওয়া।

দেশের দক্ষিন পশ্চিমের নদী হালদা এবং এর তীরবর্তি জেলে জীবনের সংগ্রাম নিয়ে এই ছবির গল্প আবর্তন। আগেই উল্লেখ করেছি এ ছবির সবল দিকগুলোরর মধ্যে বিষয়বস্তু নির্বাচন অন্যতম। “পদ্মানদীর মাঝি” কিংবা “তিতাস একটি নদীর নাম” এর পর বহু বছর বাদে কোন নির্মাতা নদীকেন্দ্রিক সিনেমা নির্মাণ করলেন, যা বাহবার যোগ্য। “আজাদ বুলবুল” এর গল্প অবলম্বনে “হালদা”র কাহিনী, সংলাপ এবং চিত্রনাট্য তৈরি করেন পরিচালক তৌকীর নিজেই। “হালদা”র এ চিত্রনাট্যের বিশেষত্ব তার সরলতায়, সাবলীল আঞ্চলিক ভাষায়। সংলাপের সাথে চরিত্রের একাত্মতায়, বস্তুনিষ্ঠতায়। স্থান, কাল এবং জীবনযাত্রার প্রয়োজনে এ ভাষা প্রকাশিত হয়েছে স্বমহিমায়। যদিও ভাষার বোধগম্যতা কিংবা কাঠিন্যের মাত্রা নিয়ে ট্রেইলার প্রকাশিত হবার পর থেকে যে ‘আতঙ্ক’ বিরাজমান ছিল, তার অনেকাংশই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। হালদাতে নির্মাতা আঞ্চলিকতাকে প্রকাশ করেছেন ঠিকই, তবে তা সর্বস্তরের দর্শকদের কথা বিবেচনায় রেখে।

“হালদা”র শুরুটা বেশ রোমাঞ্চকর। একদম টান টান উত্তেজনায়পূর্ণ এক দৃশ্য দিয়ে সিনেমাটা শুরু হয়। যদিও সেই রোমাঞ্চ ধরে রাখার ব্যাপ্তি নেহায়েতই কম। তবে হুট করে আকস্মিকতায় যে দৃশ্যের শুরু তা থেকে নির্মাতা টার্নও করেছেন একদম হুটহাট। সিন টু সিন এই হুটহাট টার্ন যে পুরো সিনেমায় অডিয়েন্সকে কতবার পিলে চমকে দিয়েছে তা আর গুনে দেখা হয়নি। তবে এটিকে এডিটিংয়ের শট টু শট ট্রানজিশন হিসেবে বেশ দুর্দান্ত লেগেছে। কেননা কোথাও কোথাও তা দর্শককে একদমই ভড়কে দিয়েছে। সাউন্ড নিয়েও এসময়ে বেশ ভাল খেলে কৌতূহল সৃষ্টি করেছেন।

জেলে মনু মিয়াকে বিপদ থেকে বাঁচিয়ে আনে সম্পূর্ণ অপরিচিত বদিউজ্জামান বদি। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ অনাথ বদির আশ্রয় হয় মনুর বাড়িতে। মনু মিয়া ও তার বউ ওদের মেয়ে হাসুর জন্য বদির কথা ভাবে। তবে কিছু দিন বাদেই তাদের এই সিদ্ধান্ত বদলে যায় দারিদ্র্যতা আর ঋণের চাপে। যার ফলস্বরূপ নিঃসন্তান নাদের চৌধুরীর দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে বিয়েতে সায় জানাতে বাধ্য হয় বদির নব্য প্রেমিক হাসু। এখান থেকেই শুরু হয় হাসুর আরেক অধ্যায়। সতীন, শাশুড়ি আর কাজের মেয়ে কুলসুমকে নিয়ে আগায় হাসুর পরের এই গল্প। যে গল্প স্ত্রী নিপীড়ন, নিষ্পেষণ আর স্বামীর অপরাগতার। এ গল্পে কুসংকারাচ্ছন্ন পারিবারিক হিংসা বিদ্বেষ, লোভ লালসা যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি স্থান পেয়েছে মাতৃস্নেহের স্বার্থান্বেষীতা। নির্মাতা সিনেমা এই চরিত্রগুলোর কুশীলব হিসেবে যাদের দিয়ে কাজ করিয়েছেন তারা প্রত্যেকেই অভিনয় জগতে স্বমহিমায় আগে থেকেই উদ্ভাসিত একেকটি নাম। নিজেদের যায়গা থেকে যারা কিনা বরাবরই সেরা। ফলে নির্মাতার কাজকে অনেকটাই সহজ করে দিয়েছে এই চরিত্রগুলোর প্রাণবন্ত অভিনয়।

“হালদা”র সিনেমাটোগ্রাফি যথেষ্ট রকমের ভাল। নদী ও তার তীরবর্তি জনজীবনকে সিনেমাটোগ্রাফার তাহির আহমেদ ও এনামুল হক সোহেল ক্যামেরায় যেভাবে ধারন করেছেন তা আপনাকেও হালদা তীরবর্তী এলাকার একজন হিসেবে কল্পনা করতে বাধ্য করবে। নদী ও নদীর ধারের কাঁদাপানিতে শটগুলোর সফল টেইক নেয়া যে কতটা পরিশ্রম আর অধ্যবসায়ের কাজ তা যে কোন নির্মাণকর্মী মাত্রই স্বীকার্য।

সিনেমাটোগ্রাফিকে পুঁজি করে লো লাইট ট্রিটমেন্টে নির্মাতার চাহিদামাফিক এডিটরও বাজিমাত করে দেখিয়েছেন। তবে এডিটিং ক্রেডিটকে ছাপিয়ে এই সিনেমার আরেকটা দুর্দান্ত জিনিস হচ্ছে ভিজুয়াল ইফেক্ট। কৌশিক রায় তার ট্রিটমেন্টে হালদার অনুষঙ্গ মেঘ, বৃষ্টি, আলো ছায়া বজ্রপাতকে তুলে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। চলচ্চিত্রের সঙ্গীত খুব আহামরি চমৎকার বলব না। তবে খারাপ বলারও উপায় নেই। কারণ কোথাও ই তা মাধুর্যতা হারায়নি। বরং প্রতিটি থাপ্পরের ফলি সাউন্ড দর্শকের কাছে অধিক বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে পৌঁছেছে। পোশাক পরিচ্ছদ এবং আর্ট ডিরেকশনে দারুণ সচেতনতা লক্ষ্য করা গেছে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়গুলোও যত্নতা পেয়েছে। যেমন প্রথমদিকের গানের একটি দৃশ্যতে মাইকের তারটিও যে সর্পিলাকারে পেঁচিয়ে মাউথপিস অংশে বসানো অবস্থায় দেখে গেছে! আবার চৌধুরী বাড়ির দেয়ালে ঝোলানো ছোরাকে বিশেষভাবে হাইলাইট করে আগেই একটা শক্তপোক্ত ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। যার গুরুত্ববহতা সিনেমার শেষ অংশে প্রকাশ পায়।

গ্লামারবিহীন হালদার বড় গ্লামারই হচ্ছে এই সিনেমায় গ্লামার আরোপের কোন অহেতুক প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়নি। গল্পের সহজ সাবলীলতা চরিত্রের মাধ্যমে নির্মাতা ঠিকই বের করে এনেছেন অবলীলায়। হালদায় কোন চরিত্রের পরিধি তার পরিমিতিবোধকে কখনোই ছাপিয়ে উঠেনি। চরিত্রের উত্থান পতনে খুব চমকে দিয়ে দর্শককে অকারণ আকৃষ্ট করার মানসিকতা নির্মাতা দেখাননি। এর জন্য দর্শককে ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তা সিনেমাটির মাহাত্ম্যকে এতটুকু খাটো করেনি। 

ভাষায় বোধগম্যতা থাকা সত্ত্বেও কাঠিন্যের কথা বিবেচনায় রেখে পুরো ছবিতে ইংরেজি সাবটাইটেল রাখা হয়েছে। খুব সম্ভবত প্রয়োজন সাপেক্ষে এটিও নির্মাতার চিন্তারই অভিনবত্বের বহিঃপ্রকাশ।  

 

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-