চলুন একটা নদীর গল্প শুনি। নদীর নাম হালদা, যদিও নদীর সংজ্ঞা মেপে নিলে নদী বলা যায় না একে। কিন্তু নদীর মতই প্রমত্তা সে, নদীর মতই মায়াময়। হালদা নদীর নামটা এসেছে পাহাড়ি গ্রাম সালদা থেকে। সাপের মতো আঁকাবাঁকা প্রমত্ত হালদাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অনেক জনপদ। বাংলাদেশের মাছের সবচেয়ে বড় যোগানদাতা হালদা, চট্টগ্রাম নগরীর ৭০ লাখ মানুষের পানির চাহিদা মেটানো হালদা, এই হালদাই জীবন হাজারো জেলের। এই হালদাতেই ‘তিথি’ হলে মা মাছেরা ডিম ছাড়ে, ভরা পূর্ণিমা বা টানা অমাবস্যার সময় নদীর উজানে বৃষ্টি হলে মা মাছেরা দলবেঁধে আসে, জেলেদের ভাষায় ‘জো’ এর সময়ে খরস্রোতা পানিতে ঘূর্ণনের সৃষ্টি হয়ে কুম কিংবা কুয়ার মতো হলে মা মাছেরা নিশ্চিন্তে ডিম ছাড়তে পারে। কিন্তু সময় পরিক্রমায় প্রমত্তা হালদার রুদ্ররূপ অনেকটাই স্তিমিত হয়ে গেছে। বলা যায় করে দেয়া হয়েছে, কারণ হালদার বুক চিঁড়ে বসে গেছে দুইটি রাবার ড্যাম বা বাঁধ। মাছের ডিম প্রজনন কমে যাচ্ছে, জেলেদের ভারী দীর্ঘশ্বাসে ভারী হচ্ছে হালদা পাড়ের বাতাস। সেই মাছেদের গল্প, জেলেদের গল্প, নদীর গল্প ও এক নারীর গল্প নিয়েই তৌকীর আহমেদ আসছেন ‘হালদা’ চলচ্চিত্রটি নিয়ে। অভিনয়ে আছেন জাহিদ হাসান, নুসরাত ইমরোজ তিশা, মোশাররফ করিম, ফজলুর রহমান বাবু, রুনা খানসহ আরও অনেকে। আজ সেই ‘হালদা’র গল্পই শোনা যাক।

নদী ও নারীর গল্প- নির্দেশক তৌকীর আহমেদ এভাবেই সারমর্ম করছেন তাঁর নতুন চলচ্চিত্র হালদার। নদী অবশ্য তৌকীরের প্রিয় স্ক্রিপ্টটুলই বলা যায়। কারণ জয়জাত্রা হোক কিংবা অজ্ঞাতনামা, অথবা হালের হালদা; নদী অনুষঙ্গ ছিল সবখানেই। আবার এই নদীগুলোকে কেবল স্ক্রিপ্টটুল বললে কম হয়ে যাবে কারণ প্রতিটা নদীই তাঁর চলচ্চিত্রে একটি চরিত্রের ভূমিকাও পালন করেছে বটে। আর তাই এবার পার্শ্বচরিত্র থেকে সরাসরি প্রধান চরিত্রে এনে দাঁড় করানো হল একটি নদীকে। তাও যে সে নদী নয়, সে নদীর নাম হালদা। যে নদীর নিজস্ব আচরণ আছে, যার আছে স্বকীয়তা, অলৌকিকতা ও বাস্তবতাও। সেই হালদা নদীকে মূল ধরে তৌকীর আহমেদ সাজালেন এক গল্প। সে গল্পে হয়তো উঠে আসবে সেখানকার জেলেদের কথা, বাঁধ পরবর্তী মাছের ডিম ছাড়ার হার কমে যাবার কথা, তার ফলে সৃষ্ট ক্রাইসিসকে একটি ফ্যামিলি ড্রামার সাথে ম্যাচ করিয়ে একটা রোম্যান্টিক প্রেমিস দাঁড় করিয়ে হয়তো প্রমত্তা হালদাকেও দেখানো হতে পারে। নদীর তীরবর্তী জীবন অস্ফুট বাস্তবতায় উঠে আসবে তৌকির আহমেদের ননগ্ল্যামারাস ভিশনে।

তৌকীর আহমেদ খুবই স্মার্ট একজন নির্দেশক, একজন দুর্দান্ত পাঠকও বটে। তিনি গল্প পড়তে জানেন এবং বাছাই করতে জানেন। প্রকৃতি থেকে খুব সুন্দর গল্প বের করে এনে সেটিতে সিনেম্যাটিক এলেমেন্ট প্রবেশ করিয়ে একটা স্ক্রিনপ্লে দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারেন দারুণভাবে। এতোদিন তৌকীর যেদিক থেকে পিছিয়ে যাচ্ছিলেন সেটি হচ্ছে পরিবেশনা ও কমার্শিয়াল ইমপ্যাক্ট। এখন একজন সিনেমাপ্রেমী মানুষ হিসেবে আপনি চাইতেই পারেন যে একজন নির্দেশক এসব চিন্তা বাদ দিয়েই কেবল তার গল্প বলে যাবেন কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এরকম চিন্তা করাটা একটু কঠিনই। সিনেমা এখন প্রোডাক্টও বটে, আর প্রোডাক্টের পরিবেশনা যেমন প্রয়োজন তেমন প্রয়োজন সর্বস্তরের কঞ্জ্যুমারের কাছে তার একসেপ্টেন্সও। সেদিক থেকে হালদা তৌকীর আহমেদের অন্যান্য সিনেমাগুলোর তুলনায় এগিয়েই থাকবে। কারণ ‘হালদা’র পরিবেশনার দায়িত্ব নেয়া অভি কথাচিত্র এরই মাঝে দেশজুড়ে প্রায় ১০০ হলে হালদাকে পৌঁছে দিতে পেরেছে। আর প্রমোশনেও হালদা এবার চেষ্টা করেছে ভালো কিছু করার।

তবে তাদের পুরোপুরি সফল অবশ্যই বলা যাবে না। কারণ হালদার অফিশিয়াল ফেসবুক পেইজে মাত্র ৫ হাজার লাইক; বুস্টেড ট্রেইলার, ভার্সিটি ক্যাম্পেইন, প্রমোশনাল ভিডিও করার দিক থেকেও হালদা তেমন কোন উদ্যোগ নেই নি। বরং তরুণ অনেক সিনেমাপ্রেমী নিজ থেকে হালদার প্রচারণার কাজ করে যাচ্ছেন নিঃস্বার্থভাবে। আর এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসাটুকু এসেছে নির্দেশক তৌকীর আহমেদের দুর্দান্ত সব চলচ্চিত্র উপহার দেবার কারণেই। নির্দেশকের আগের চলচ্চিত্র ‘অজ্ঞাতনামা’ সম্প্রতি সার্ক চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের পুরষ্কার পেয়েছে, এছাড়া দর্শকদের কাছ থেকেও অনেক প্রশংসা পেয়েছিল। কিন্তু এসবই অজ্ঞাতনামা সিনেমাহল থেকে নেমে যাবার পরের ঘটনা, এক সপ্তাহেই নেমে গিয়েছিল অজ্ঞাতনামা সবগুলো হল থেকে প্রায়। তবুও নির্দেশক তৌকীর আহমেদ পিছিয়ে যান নি, একজন ড্যাম কেয়ার নির্দেশক হয়ে আবারও নিয়ে এসেছেন হালদা। তাঁর বিশ্বাস এবার দর্শকরা হতাশ করবে না।

হালদায় একঝাক গুণী অভিনেতাদের একসাথে পাওয়া যাচ্ছে। জাহিদ হাসানকে ঋণাত্মক চরিত্রে আবিষ্কার করা যাবে এখানে, তিশাকে শহুরে ধাঁচের বাইরে গিয়ে গ্রাম্য মেয়ে হিসেবে রিডিফাইন করবে দর্শক, মোশাররফ করিম তাঁর কমেডি এঙ্গেল থেকে বের হয়ে আবারও তাঁর একটিং ব্রিলিয়ান্স দিয়ে মুগ্ধ করার জন্য তৈরি, ফজলুর রহমান বাবু হয়তো আবারও অবাক করে দেবেন সবাইকে, দিলারা জামান-রুনা খান-শাহেদ আলীরা তাদের চরিত্রে প্রাণ দেবেন তা ধরে নেয়াই যায়। সঙ্গীত পরিচালনায় আসা পিন্টু ঘোষের সঙ্গীত এরই মাঝে দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে।হালদার সঙ্গীতে তাঁর আঞ্চলিকতা ও শুদ্ধতার মিশ্রণ চমৎকার লেগেছে; নদীর জলকে সুরের উৎস বানিয়ে ফেলা, নদী-জল-সমুদ্রবাচক শব্দ ও উপমা চয়ন গানগুলোকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আজাদ বুলবুলের গল্পে হালদার ইতিকথা, নৌকাবাইচ, জব্বারের বলীখেলা এসব ঐতিহ্য সুন্দরভাবে ফুটে উঠবে বলেই আশা রাখছি। ডিওপি এনামুল হক সোহেলের কাজের দিকে আলাদাভাবে খেয়াল রাখতে হবে, হালদা নদী ও হালদা পাড়ের মানুষ তাঁর ক্যামেরায় কীভাবে উঠে আসে তা দেখতে ইচ্ছুক।

হালদা মুক্তি পাচ্ছে ১ ডিসেম্বর। তৌকীর আহমেদ আবারও একটা সুন্দর গল্প নিয়ে আসছেন, তাঁর বিশ্বাস এই গল্পের টানেই দর্শক আসবে। তাঁর বিশ্বাস না ভাঙার জন্য হলেও, জাহিদ হাসান-তিশা-মোশাররফ-বাবুদের অভিনয় দেখার জন্য হলেও, হালদা নদীকে সেলুলয়েডে প্রাণ পেতে দেখতে হলেও সবাই আসুন সিনেমা হলগুলোতে। ‘হালদা’ দেখুন, মতামত দিন। বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে গর্ব করতে হলে সবচেয়ে বড় দায়িত্বটা দর্শকদেরই নিতে হবে। আর নাহলে অজ্ঞাতনামার মতো হালদা নিয়েও আফসোস করতে হবে একটা সময় গিয়ে। সে আফসোসের জন্য বেঁচে থাকা কেন, বেঁচে থাকা হোক পূর্ণতা নিয়ে। চলুন ভেসে যাই হালদার ঢেউয়ে, মিশে যাই হালদার সাথে।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-