– সাগর ছাড়ি আইলে সাগরের কথা মনে পড়ে, নদী ছাড়ি আইলে নদীর কথা…
– আর মানুষ! মানুষের কথা ন ভাব?

হ্যাঁ, মানুষের কথা ভাবতে হয় মানুষের। ভাবতে হয় পরিবারের কথা, পেটের দায়ের কথা। হালদা পাড়ের জেলেপল্লীর মানুষরাও ভিন্ন কিছু নয়। যে হালদা তাদের অন্ন যোগায়, যে হালদার বুকে তারা বসত করে, সে হালদাই যখন নগরায়নের থাবায় বিপন্ন তখন তাদের বিকল্প পথ খুঁজতে হয়। যে হালদার সংস্কার তাদের নিজেদেরই সৃষ্টি করা সে সংস্কার বাধ্য হয়েই তাদের ভাঙতে হয় অভাবের টানে। সে নদী ও নদীপাড়ের মানুষদেরকে নিয়েই তৌকীর আহমেদের ‘হালদা’।

‘হালদা’ সিনেমায় তৌকির আহমেদ দুটি গল্প বলতে চেয়েছেন। একটা হালদা নদীর গল্প ও অন্যটি জেলেপাড়ার মেয়ে হাসুর। হালদা নদীর বর্তমান ক্রাইসিসকে একটা জেলে পরিবারের জীবনের ক্রাইসিসের সাথে মিলিয়ে দিয়ে তৌকির একটা ছবি আঁকতে চেয়েছেন। হালদায় প্রতি বছর মা মাছের ডিম ছাড়ার হার কমছে, সে কমার কারণ হালদায় থাকা রবার ড্যামের বর্জ্য ও ইটভাঁটার দূষিত বাতাস। প্রমত্তা হালদার প্রাকৃতিক প্রজননক্ষেত্রকে মা মাছ আর ডিম ছাড়ার উপযুক্ত মনে করছে না। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে জেলেদের ওপর, তারা ‘জো’ (ডিম পাড়ার সময়) তে মাছ ধরতে যাচ্ছে সমুদ্রে, কিন্তু খালি হাতেই ফিরতে হচ্ছে। যে কারণে অনেক জেলে অভাবের দায় সইতে না পেরে মা মাছ শিকার করছে, যেটি সেখানকার জেলেদের সংস্কারে খুবই পাপের কাজ বলে মানা হয়। সে পাপের দায় দিয়েই শুরু হয় ‘হালদা’।

একদিকে জেলে মনু মিয়া ও তার মেয়ে হাসুর গল্প টানে তো অন্যদিকে নাদের চৌধুরীর ইটের ভাটা আর হালদা নদীর দূষণের গল্প। সেই গল্পদুটো মিলে একটি গল্প হবার অনেক চেষ্টা করে কিন্তু হয়ে ওঠে না। মোশাররফ করিম ওরফে বদি কাহিনীর বাঁকবদলে মনু মিয়ার সাথে তার ঘরে ওঠে ও হাসুর মন জয় করে নেয় কিন্তু তাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না। মনু মিয়ার অভাব, নাদের চৌধুরীর প্রতিপত্তি আর বদির অসহায়ত্ব একটি ক্লিশেড স্টোরিলাইনে আমাদের টেনে নেয়। একই গল্প আমরা চন্দ্রকথায় কিংবা মনপুরায় ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বহুবার দেখেছি। কিন্তু ‘হালদা’য় এই গল্প স্বকীয়তা পায় অভিনেতাদের অভিনয়ে আর হালদার অনুষঙ্গে।

আমার দর্শক মন মা মাছ মারার মেটাফোর বারবার দেখে বারবার দেখে একটা অল্টারনেটিভ স্টোরি ক্লাইম্যাক্স ভেবে রাখলেও নির্দেশক সেটার পে অফ করেন নি, হয়তোবা মা মাছ মারার দুঃস্বপ্ন দিয়ে নির্দেশক ভিন্ন কিছু বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু তিশার চরিত্র এমন একটা পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে হালদায় মারা মা মাছের মেটাফোরের সাথে তার ক্যারেক্টারের পরিণতি মিলিয়ে একটা দুর্দান্ত পে অফ দেয়া যেত। সেটা তৌকির দেন নি এবং ক্লিশেড ধাঁচেই গল্পের ক্লাইম্যাক্স টেনেছেন। নদীর গল্প মাঝপথে খেই হারিয়ে ফেললেও শেষে একটা সমাপ্তি দেবার চেষ্টা করেছেন নির্দেশক। হালদাকে গল্পে এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যে তাকে আলাদা একটা চরিত্র বলেই মনে হয়। এই ডায়ন্যামিক প্রেজেন্টেশন তাই ক্লিশেড গল্পকেও একটি নতুন আঙ্গিক দিয়েছে।

হালদা, বাংলা সিনেমা, তৌকির আহমেদ, ফজলুর রহমান বাবু, জাহিদ হাসান, মোশাররফ করিম

অভিনেতাদের নিয়ে আলাদা কিছু বলার নেই কারণ প্রত্যেকটি চরিত্রই সুঅভিনেতাদের দেয়া হয়েছে। আর আঞ্চলিক ভাষা ধারনে সব অভিনেতাই পূর্ণ নম্বর পাবেন। তবে সবচেয়ে ভালো কাজ করেছেন নুসরাত ইমরোজ তিশাই। ব্যাঙের বিয়ে দেয়ার বালখিল্যতা হোক বা বদির সাথে প্রেমে লাজুকতা, চৌধুরী বাড়িতে দেখানো তার ড্যামকেয়ার মনোভাব হোক কিংবা তীব্র প্রতিশোধপরায়ণতা; তিশা মাতিয়েছেন সবটুকু আবেগ দিয়েই। জাহিদ হাসানকে অভিনয় করতে দেখা সবসময়ই চোখের জন্য উপাদেয়। তাঁর ঋণাত্মক চরিত্রে তিনি রীতিমত ভয় পাইয়ে দিয়েছেন, সৌম্য শীতলতা ছিল তাঁর চোখজুড়ে। ফজলুর রহমান বাবুর চেয়ে ভালো কেউ বোধহয় এখন আর দুর্দশা দেখাতে পারে না, আবারও টাইপকাস্ট বাবু এবং আবারও দুর্দান্ত। তবুও তাকে বের হতে হবে এমনসব চরিত্র থেকে।

দিলারা জামান যখনই ডায়লগ ডেলিভারি দিয়েছেন, মুগ্ধ করেছেন। রুনা খানের ঈর্ষা তার চোখে, মুখে ও ভঙ্গিমায় স্পষ্ট ছিল। মোশাররফ করিম তৌকিরের সবগুলো চলচ্চিত্রে ছিলেন কিন্তু এসময়ের অন্যতম গুণী অভিনেতা হওয়া সত্ত্বেও তৌকিরের চলচ্চিত্রে তাকে কেন যেন দুর্বল মনে হয়। একটা কারণ হতে পারে যে প্রতিবারই তার সামনে দুর্দান্ত সব অভিনেতা থাকেন, কিন্তু এ সিনেমায় বদি চরিত্রটিই অপেক্ষাকৃত দুর্বল বলে মনে হয়েছে। কেমন যেন আড়ষ্টতা তার অভিনয়জুড়ে। নিরঞ্জন শাহেদ আলী ও শঙ্করের বাবার চরিত্রে অভিনয় করা অভিনেতা নজর কেড়েছেন।

হালদা, বাংলা সিনেমা, তৌকির আহমেদ, ফজলুর রহমান বাবু, জাহিদ হাসান, মোশাররফ করিম

‘হালদা’র পুরোটা জুড়েই পানি। কখনো সে প্রমত্তা আবার কখনো শান্ত বহমান। কখনো আকাশ চিঁড়ে বৃষ্টি হয়ে ঝরে তো আবার কখনো ভিজিয়ে দিয়ে যায় ভালোবাসার মানুষদেরকে। কখনো সে বর্জ্য জমে থকথকে ভারী কালো, কখনো আবার মাছের ডিমে ছড়ায় ক্ষণিক আলো। আবহ সঙ্গীত, সিনেম্যাটোগ্রাফি সবই সিক্ত হালদার জলে। এনামুল হক সোহেলের ক্যামেরায় দুর্দান্ত কাজ মুগ্ধ করেছে পুরো সিনেমাজুড়ে। এতো সুন্দরভাবে হালদাকে, হালদাপাড়ের মানুষদেরকে ক্যাপচার আর কেউ করতে পারতো না বোধহয়।

পিন্টু ঘোষের সঙ্গীত খুবই শ্রুতিমধুর ছিল, আবহসঙ্গীত ছিল সিক্ত সুন্দর। এডিটিং এ অমিত দেবনাথ আরও কাজ করতে পারতেন বলে মনে হয়েছে। স্লো পেসে সমস্যা হতো না যদি তিনি আরেকটু ক্রিস্প করতে পারতেন। আরও দশ মিনিট খুব সহজেই কমানো যেত বলে আমার ধারণা। তৌকির আহমেদের নির্দেশনা নিয়ে যদি বলতে হয় তাহলে একবাক্যে এটি মেনে নিতে হবেই যে- তিনি বর্তমান বাংলাদেশের অন্যতম সেরা নির্দেশক। একজন দুর্দান্ত অভিনেতা থেকে আরও দুর্দান্ত একজন নির্দেশক হবার যে এভ্যুলুশন সেটি জানতে খুব ইচ্ছে করে। হালদাকে, হালদাপাড়ের জেলেপল্লীকে, সেখানকার সংস্কার ও সংস্কৃতিকে তৌকির আহমেদ উপস্থাপন করেছেন অনন্য নিপুণতায়।

‘হালদা’ তৌকির আহমেদ নির্মিত সেরা চলচ্চিত্র নয়, তবে নিঃসন্দেহে এটি এ বছরের অন্যতম সেরা বাংলা চলচ্চিত্র। অভিনেতাদের অভিনয়ে, হালদার কান্নায় ও তৌকির আহমেদের নন গ্ল্যামারাস ভিশনে হালদা দর্শকদের মুগ্ধ করবে নিশ্চিত। সিনেমা শেষেও একটা ছলাৎ ছলাৎ শব্দ কানে বেজে যাবে বহুক্ষণ, একটা নোনা স্বাদ লেগে থাকবে মনে…

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-