ডিসকভারিং বাংলাদেশতারুণ্য

হালাল ট্যুরিজমের রাজধানী হিসেবে ঢাকা কতটা যোগ্য?

এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে একটি কনফারেন্স হয়। সেখানে ওআইসির তালিকাভুক্ত ৫৭টি দেশের পর্যটন মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীরা আসেন। সেই কনফারেন্সে ২০১৯ সালের জন্য ঢাকাকে ওআইসির “সিটি অফ ট্যুরিজম” হিসেবে ঘোষণা করে হয়েছিল। অর্থাৎ, ঢাকা হবে ইসলামিক পর্যটন বা হালাল ট্যুরিজমের রাজধানী।

ওআইসি প্রতিবছর একটি মুসলিম দেশকে এভাবে প্রচার করে থাকে যেন দেশটি পর্যটকদের বিশেষত যারা হালাল ট্যুরিজম খোঁজেন তাদের আকৃষ্ট করতে পারে। এবছর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত কনফারেন্সে ঢাকাকে আগামী বছরের জন্য “সিটি অফ ট্যুরিজম” হিসেবে ঘোষণা করা হয় যেটি একই সাথে আমাদের জন্য গর্বের এবং একটি সুযোগও বটে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশই নতুন নতুন ক্ষেত্র বের করছে যার মাধ্যমে পর্যটকদের আকৃষ্ট করা যায়। মুসলিম পর্যটকরা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অর্থ খরচ করছেন ঘোরাফেরার জন্য। তবে তাদের কিছু চাহিদা থাকে বা বিধিনিষেধ থাকে। ফলে তাদের জন্যই বিশেষ করে নতুন এক ধরণের ট্যুরিজম প্রচার করা হচ্ছে যেটিকে বলা হয় হালাল ট্যুরিজম। এই ধারণাটি এমন- একজন মুসলিম পর্যটক ঘুরতে বের হবেন, আনন্দ করবেন, প্রকৃতি উপভোগ করবেন, নতুন নতুন খাবার খাবেন; কিন্তু এইসব কার্যক্রম ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক হবে না সেটি নিশ্চিত থাকতে হবে। সব কিছু যেন হালালভাবেই হয় সেটাই চাহিদা থাকে ট্যুরিস্টদের।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ হালাল ট্যুরিজমকে ভীষণ ভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রচারণায়, প্ররোচনায়। ইরান, মরক্কো, তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এসব দেশে হালাল ট্যুরিজমের বিশেষ প্যাকেজ থাকে। সৌদি আরব তো হালাল ট্যুরিজমকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে। পবিত্র হজ্জ্ব পালনে বিশ্বের অসংখ্য দেশ থেকে মানুষ সৌদিতে যান। তারা হজ্জ্ব পালনের পাশাপাশি সৌদি ঘুরে দেখেন, ধর্মীয় স্থাপনা দেখেন। বিভিন্ন হালাল পণ্য কেনাকাটা করেন দেশের প্রিয়জনদের জন্য। হালাল খাবার কেনেন। তারা মানসিক একটা তৃপ্তি অনুভব করেন সৌদি আরব থেকে কিছু কিনবার পর। ফলে, একজন মানুষ হজ্জ্ব করতে গেলেও সেটা নিছক সেখানেই সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষ প্রচুর অর্থ খরচ করেন সেখানে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, অপরিশোধিত তেল বিক্রি করে সৌদি আরবের যা রোজগার হতো, এখন তার থেকেও বেশি আয় করে তারা হজ্জ্ব থেকে! মক্কার চেম্বার অব কমার্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাইরের দেশ থেকে আসা মুসলমানরা মাথাপিছু ব্যয় করেন ৪৬০০ ডলার, আর স্থানীয়রা মাথাপিছু প্রায় ১৫০০ ডলার ব্যয় করেন!

বাংলাদেশ ভৌগলিক অবস্থানের কারণেই অদ্ভুত ভাগ্যবান একটি দেশ। আমাদের ষড়ঋতু আছে, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য আছে। এগুলো আমাদের পর্যটনকে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তবে এও ঠিক, পাশে ভারত, নেপাল, ভূটানের মতো দেশ থাকায় আমরা অনেক সম্ভাবনাময় পর্যটক হারাচ্ছি। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যটক বাড়াতে হালাল ট্যুরিজম কিছুটা সহায়ক হতে পারে। যেহেতু, ওআইসি ঢাকা শহরকে ইতিমধ্যে ২০১৯ সালের জন্য হালাল ট্যুরিজমের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেছে, এটাকে কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের পাশ্ববর্তী মুসলিম দেশগুলোর ট্যুরিস্টদের আকৃষ্ট করতে পারি। শুধু ওআইসির তালিকাভুক্ত ৫৭টি দেশের মানুষদের কাছেও যদি আকর্ষণীয়ভাবে ঢাকাকে উপস্থাপন করা যায় তাহলে আমরা কি বিপুল সংখ্যক সম্ভাবনাময় আন্তর্জাতিক পর্যটক পেতে পারি, তাই না!

কিন্তু, ২০১৯ সালকে নিয়ে এবং “সিটি অফ ট্যুরিজম” নিয়ে খুব বেশি পরিকল্পনা চোখে পড়ছে না। এর আগে ২০১৬ সালে আমাদের পর্যটনবর্ষ ছিল, যেটি খুব বেশি সফল, সেই অর্থে বলা যাবে না যদিও যথেষ্ট সম্ভাবনাময় প্রচেষ্টা ছিল, বিউটিফুল বাংলাদেশ ক্যাম্পেইনের প্রচারণার ভিডিওচিত্রও বেশ সুন্দর হয়েছিল তবে সেটা নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যকে কেন্দ্রীভূত করেনি বলেই হয়ত ততটা সফল হয়নি।

আমরা চাইলে কিন্তু সামনের ২০১৯ সালের হালাল ট্যুরিজম বর্ষকে সফল করতে পারি। যেহেতু, আমাদের দেশেও একটি বড় ধর্মীয় সম্মেলন অর্থাৎ বিশ্ব ইজতেমা হয়, এই ঢাকাতেই, তুরাগ নদীর তীরে, আমরা চাইলে ইজতেমায় আগত মুসলিমদের জন্য বিশেষ প্রচারণা কৌশল রাখতে পারি। যেন এই মানুষগুলো দেশে কিছুদিন বেশি কাটায়, হালাল খাবারের স্বাদ উপভোগ করে এবং কেনাকাটা করে বেশি বেশি৷

ইজতেমায় গত বছর ভিসা জটিলতায় পড়েছিলেন বেশ কিছু বিদেশী মেহমান। এ বছর ইজতেমার ভিসা প্রাপ্তি যেন সহজ হয় সেটির দিকে লক্ষ্য রাখা গেলে দেশের পর্যটনের জন্য মঙ্গল। এছাড়া, ইজতেমায় আগত সকল বিদেশী মেহমানের জন্য ঢাকা শহরের গাইড সরবরাহ করা যেতে পারে। যেখানে ঢাকার বৈচিত্র্য, অসাধারণ টেস্টি হালাল খাবারের রেস্টুরেন্টের নাম, ঢাকা শহরের ঐতিহাসিক মুসলিম স্থাপনা, ঢাকার সুদৃশ্য মসজিদের ঠিকানা, ঢাকায় কম খরচে পাঞ্জাবি সহ মুসলিমদের ট্র‍্যাডিশনাল পোষাক কেনার শো-রুম সহ বিভিন্ন তথ্য থাকতে পারে।

২০১৮ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবসের স্লোগান হচ্ছে, “Tourism & The Digital Transformation”। সারা বিশ্বই এখন বদলে গেছে ডিজিটাল দুনিয়ার নিত্য নতুন সুযোগ সুবিধায়। পর্যটনও তার বাইরে নয়। পর্যটন এমন একটি জায়গা যেখানে আপনাকে সবসময় আধুনিক থাকতে হবে, সময়ের সাথে,প্রযুক্তির পরিবর্তনের সাথে, মানুষের চিন্তাভাবনার পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। কখনো কখনো সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে।

বাংলাদেশ ডিজিটালি অনেক এগিয়েছে গত দশ বছরে। তবে পর্যটন কতটা প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে তালি মিলিয়েছে সেটা একটা প্রশ্নই বটে। আমাদের এখনো একটা পূর্ণাঙ্গ ভালো ওয়েবসাইট নেই যেখানে আমাদের বাংলাদেশকে, বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে সকল ধরণের তথ্য থাকবে। এবারের বিশ্ব পর্যটন দিবসে হয়ত এই বিষয়টির উপর জোর দেয়া হবে। যদি তাই হয়, তাহলে সামনের বছর যে ওআইসির “সিটি অফ ট্যুরিজম” হিসেবে ঢাকাকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে সেটার ডিজিটাল ব্র‍্যান্ডিং ভালোভাবে করতে হবে। আপাতত, শুধু এই ব্র‍্যান্ডিং এর জন্যই কোনো ওয়েবসাইট করা যায় কিনা, যেখানে ঢাকার হালাল ট্যুরিজম সম্পর্কে বিস্তারিত সব তথ্য উল্লেখ করা থাকবে।

তাছাড়া, বর্তমানে বাংলাদেশে বসেই বাংলাদেশের কোনো কিছুকে আপনি বাইরের কোনো দেশের মানুষের কাছে দেখাতে পারবেন ফেসবুক কিংবা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ার সাহায্যে, অর্থের বিনিময়ে ফেসবুক এরকম প্রচারণার সুযোগ দিয়ে থাকে। ধরা যাক, আমি চাই ইন্দোনেশিয়ার একজন মুসলিম যেন হালাল ট্যুরিজম উপভোগ করতে বাংলাদেশে আসে। এখন সে কিভাবে জানবে বাংলাদেশ সম্পর্কে? যদি আমি আমার শহর নিয়ে, আমার শহরের ঐতিহ্য, খাবার এসব নিয়ে একটা ভিডিও বানাই এবং ফেসবুকের সাহায্যে ঠিক করি ভিডিওটির দর্শক হোক, ইন্দোনেশিয়ার মানুষ, তাহলে ফেসবুক নির্দিষ্ট ভাবে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেবে সেদেশেই! অসাধারণ একটি সুবিধা, আর এই ডিজিটাল সুবিধা কাজে লাগিয়ে আমরা ওআইসির ৫৭টি দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারি আমাদের দেশের পর্যটনকে, দেখাতে পারি আমাদের মসজিদের শহর, বিচিত্র মজাদার খাবারের শহর, প্রাণের শহর ঢাকাকে!

এভাবে যদি ২০১৯ সালের জন্য ওআইসির ঘোষিত “সিটি অফ ট্যুরিজম” ব্র‍্যান্ডিংটাকে কাজে লাগানো যায়, পর্যটন খাত নতুনভাবে জেগে উঠবে বলেই আমার বিশ্বাস। আন্তর্জাতিক পর্যটক আসতে শুরু করলে পর্যটন খাত বদলাবেই। কারণ, পর্যটন একই সাথে অনেকগুলো সেক্টরের ভাল মন্দ নিয়ে কাজ করে যার কেন্দ্রে থাকে পর্যটক। যখন পর্যটক বাড়বে তখন সবাই উপকৃত হবে, সবচেয়ে বেশি লাভবান আমার প্রিয় স্বদেশ। 

আরও পড়ুন-

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close