গত এক সপ্তাহ ধরে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সয়লাব একটাই হট টপিকে, সেটা হচ্ছে আসাদগেটের কোন একটা রেস্টুরেন্টে রোবট নাকি খাবার সার্ভ করছে। এই নিয়ে জনমনে উত্তেজনা, বিভ্রান্তি সহ মিশ্র অনুভূতি গড়ে উঠেছে। দলে দলে মানুষ যাচ্ছে দেখার জন্য, ৫০০ টাকার কাচ্চি বিরিয়ানী কিংবা ৩০০ টাকার এক স্লাইস পিজ্জার অর্ডার করার বিনিময়ে এক নজর প্রযুক্তির এক নতুন আবিষ্কারকে দেখার জন্য সেই রেস্টুরেন্ট এখন লোকে লোকারণ্য। কেউ ফেইসবুকে চেক ইন দিচ্ছে, কেউ আবার ভিডিও করে সেই রোবটের হাসিমুখে খাবার নিয়ে আসার দৃশ্য নিজের ব্যক্তিগত ওয়ালে পোস্ট করছেন।

আমি মানুষটা বরাবরই কম কৌতূহলী সমসাময়িক বিষয় নিয়ে। কিন্তু এই ব্যাপারটা এত বেশি আমার ফেসবুক এর নিউজ ফিডে এসেছে বাধ্য হয়ে একবার নজর দিলাম। আসল ডাক্তার যেমন রোগী দেখলেই ঘটনা বুঝতে পারে, তেমনি একজন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েট হয়ে দুই মিনিটের একটা ভিডিও দেখেই কাহিনীটা ধরে ফেললাম।

অনেক লম্বা সময় ধরেই চায়না ও জাপানিজ রেস্টুরেন্টে রোবটিক ওয়েইটার সার্ভিস চালু আছে। এমনকি জাপানের ফুকুশিমা তে কিছু রেস্টুরেন্ট এ গত ৪/৫ বছর ধরেই রোবট নিয়ন্ত্রিত ফুড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু রয়েছে যেখানে আপনার অর্ডার নেয়া থেকে শুরু করে খাবার সার্ভ করা, ক্যাশ রেজিস্টার সব জায়গাতেই রোবট কাজ করছে। সুতরাং বাংলাদেশে রোবট ওয়েইটার আসার নিউজ টা দেখে আমি একটু নড়ে চড়ে বসলাম। কম কৌতূহলী হলেও আমি যথেষ্ট উচ্চাভিলাষী তাই ভাবছিলাম হয়তো একটা রোবট হেঁটে হেঁটে আসছে, পরিচয় দিচ্ছে হাত পা নেড়ে, রোবোকপের মত শরীরের একটা কম্পার্টমেন্ট থেকে অটোমেটিক্যালি বের করে আনছে নোট প্যাড ও কলম, কিংবা শরীরের সাথে লাগানো ইলেক্ট্রিক স্ক্রিনে অর্ডার লিখে নিচ্ছে এমন কিছু দেখবো ভিডিও তে। কিন্তু আমার উচ্চাভিলাষ কে বোধ করি বুড়ো আঙ্গুল দেখানোর জন্যই ভিডিওটি তে দেখা গেলো নতুন বউয়ের মত হাতে একটা খাবারের ট্রে নিয়ে একটা হিউম্যানয়েড রোবট চাকার উপর গড়িয়ে গড়িয়ে আসছে, আর ধানমন্ডিতে এক হাঁটা বাবা ছিলেন মনে আছে? তার মুরিদরা যেমন তার পেছনে হাঁটতেন, ঠিক রোবটটার পেছনেও হেঁটে হেঁটে আসছে আরও ৫/১০ জন (আমি আসলেই জানিনা তার কেন রোবটটার পেছন পেছন হাঁটছেন)।

আরেকটু ভালো করে খেয়াল করতেই বোঝা গেলো এটা একটা লাইন ফলোয়িং রোবট, যেটা একটা লাইন ফলো করে। যার মানে হচ্ছে, রেল লাইন ফলো করে যেমন তার উপর ট্রেন চলাচল করে ঠিক তেমনি এই রোবটগুলোও তার সেন্সর ব্যবহার করে লাইন ফলো করে। লাইন যেদিকে যায়, রোবট ও সেদিকে যায়। সেই লাইনটি আসলে একটি ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ, এবং রোবটগুলোর পায়ের নিচে একটা অপটিক্যাল সেন্সর আছে। সেন্সর সেই লাইন স্ট্রিপটার দিক বুঝে সেদিকে চাকা ঘোরায়, রোবট সেদিকে মুভ করে। যার মানে হচ্ছে, ধরুন আপনি অর্ডারের জন্য অপেক্ষা করছেন। এখন দেখলেন আপনার পাশ দিয়ে ফাঁকা একটা রোবট যাচ্ছে। আপনি তাকে ডাকুন, চিৎকার করুন, ধমক দিন, পায়ে জড়িয়ে ধরে কাকুতি মিনতি করুন, আপনার ডাক শোনার ক্ষমতা তার নেই। সে সুন্দর মত লাইন ফলো করে আবার কিচেন এ যাবে অন্য খাবার আনার জন্য। আপনার খিদে বোঝার, খাবার জন্য আপনার আকুল আকুতি বোঝার ক্ষমতা তার নেই।

গুগল করে দেখলাম এই রোবটটার আবার অনেক দাম। বেসিক লাইন ফলোয়িং রোবট গুলো ২০০ থেকে ২৫০ মার্কিন ডলারে পাওয়া গেলেও এই ১ মিটার লম্বা মানুষের সাইজের রোবটের দাম আবার ৬০০০ থেকে ৮০০০ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি টাকায় ৫ থেকে ৭ লক্ষ টাকার মত। পাঠক যারা আছেন তার হয়তো পরিষ্কার সব টেকনিক্যাল টার্ম বুঝবেন না, তাই সহজ ভাষায় বলি এই রোবট বানাতে লেগেছে একটা Arduino UNO কন্ট্রোলার বোর্ড (যেটা অনেকটা রোবটটার মাদারবোর্ড এর কাজ করে), কয়েকটা মোটর, সেন্সরের সিগন্যাল গ্রহণ ও পাঠানোর জন্য রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি মডিউল, ম্যাগনেটিক স্ট্রিপ ফলো করার জন্য অপটিক সেন্সর, কিছু ব্যালেন্সিং ওয়েইট আর রোবটিক ফিগার। সেই সাথে ব্যাটারী এবং সাজ সজ্জার জন্য যা যা লাগে।

টেকনিক্যাল টার্ম বুঝিয়ে আমার কাজ নেই। বাট একটা জিনিস বলতে চাই যদিও এটাকে আমরা রোবট বলি, বাট এটা আসলে এখনকার বিচারে রোবটের পর্যায়ে পড়ে না। লাইন ফলোয়িং টেকনোলজি এখন এত পুরনো যে ক্লাস ফাইভের একটা বাচ্চাকে এক সপ্তাহ সময় দিলে সে দুইবার ম্যানুয়াল পড়ে এই রোবট বানাতে পারবে। রোবট বলতে আমরা যেই প্রযুক্তির যেই জেনারেশনটা কে বুঝি সেটা তে এখন সবকিছু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, এফিশিয়েন্ট বডি স্ট্রাকচার আর হাই কোয়ালিটি বিল্ডিংটাকেই বুঝি। যেখানে মানুষের মত চিন্তা করতে পারার মত রোবট ইতোমধ্যে আমরা বানিয়ে ফেলেছি সেখানে এই রোবট নিয়ে উচ্ছ্বাস করার মানে টা আমার সহজ মাথায় ঢুকলো না। সোফিয়া নামের একটা রোবট আছে, তাকে আপনি যাই জিজ্ঞেস করুননা কেন, সে নিজে নিজে চিন্তা করে উত্তর দেবে। মানুষের চিন্তা করার যে লজিক্যাল ম্যাথমেটিক্স আর্গুমেন্ট আছে, সবই তার মাঝে দেয়া আছে। সুতরাং মানুষ যা চিন্তা করে, সোফিয়াও তা চিন্তা করে। ইন ফ্যাক্ট সে নিজের অস্তিত্ব, নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যা যা করা প্রয়োজন সব করতে পারবে। এমনকি প্রয়োজন নিজের সিদ্ধান্তে মানুষ খুনও! কিন্তু এই যে খাবার সার্ভ করছে রোবটগুলো, তাদের তো কোন আর্টিফিশিয়াল ব্রেইনও নেই! একটা মাদারবোর্ড এ কিছু লজিক ইনপুট করা আছে। সেটা হলো লাইন ফলো করো, টেবিলের সামনে গিয়ে থামো, লাইন ফলো করো, কিচেনে ফিরে আসো। তার লাইফ সাইকেল এতেই সীমাবদ্ধ। এর বেশি কিছু করার ক্ষমতা অন্তত এই “রোবট” এর নেই।

এই সময়ে আসলে আমার দৃষ্টিকোণ থেকে এই রোবট গুলিকে “রোবট” না বলে আমি বড় সাইজের খেলনা বলতেই স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করবো। আমার সাথে এক পরিচিত বড় ভাই আছেন, বুয়েটের। তিনি আমাকে বললেন, “বুঝলি, আজ থেকে ৮ বছর আগে লাইন ফলোয়িং রোবটের কনসেপ্টটা ইউনিভার্সিটিতে সাবমিট করেছিলাম প্রজেক্ট এবং থিসিস এর জন্য। ফান্ড বেশি লাগবে বলে সেইটা এপ্রুভ হলো না, আর আজকে মানুষ পাগল হয়ে চায়না থেকে আসা সেই রোবট দেখতে যায়!”
সেদিন যদি উনি সেই প্রজেক্টটা নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেতেন, তাহলে এই বড় সাইজের খেলনাগুলো যে আমরাই বানাতে পারতাম না তার গ্যারান্টিটা কোথায়? একটা জিনিস আমি মানি যে আমরা বাঙ্গালী জাতি অল্পেই তুষ্ট হয়ে যাই অনেক সময়। গাছের গোড়ার অতি পাকা, পোকায় ধরা ফল খেয়ে আমরা খুশি, কিন্তু উপরে যে আর স্বাস্থ্যবান সুস্বাদু ফল থাকতে পারে, সেটা কেবলমাত্র কষ্ট করে উঠে পাড়তে হবে বলে আমরা এড়িয়ে যাই।

খুব বেশিদিন কি হয়েছে? কয়দিন আগেই না ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্টদের তৈরী ন্যানোবট নাসার হাত ধরে মহাকাশে গেলো? আমরা কয়জন তাদেরকে মনে রেখেছি? আমাদের মাথার চিন্তা ওই রেস্টুরেন্টে খাবার সার্ভ করা রোবট পর্যন্তই। এবং আমরা যত যাই করি, যত যাই বলিনা কেন আমাদের চিন্তা ওই অথর্ব, বুদ্ধিহীন রোবটগুলোর চারিপাশেই ঘুরপাক খাবে।

এতদূর এসে পাঠক হয়তো ভাবছেন লেখার শিরোনামে হালালীকরণ শব্দটা কেন ব্যবহার করেছি। কারণ একটাই, এখানে রোবটটাকে হালাল করার একটা চেষ্টাও কিন্তু রেস্টুরেন্ট ম্যানেজমেন্ট করার চেষ্টা করেছে।

বুঝিয়ে বলি। আজকে সকালে আরেকটা ছবি দেখলাম, রেস্টুরেন্ট এর সেই রোবট গুলোকে বিভিন্ন ধরণের ওড়না পরিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ? এই রোবটগুলো বডি ফিগারটা নারীদেহের সাথে মিল রেখে করা হয়েছে, সুতরাং ডিজাইনটাও করা হয়েছে একজন নারীর আদলে। যার কারণে রোবটটির বুকের জায়গায় উন্নত স্তনের ডিজাইন রাখা হয়েছে। এমনও না যে পরিষ্কার অশ্লীলভাবে স্তন বোঝানো হচ্ছে। কেবল রোবটের বুকের অংশটি স্তন বোঝানোর জন্য উঁচু করে দেয়া হয়েছে। এতেও খুব সম্ভবত আমাদের বাঙ্গালী জাতির যথেষ্ট আপত্তি লেগেছে। সম্ভবত খুবই ধার্মিক দুই একজন রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে রোবটের উন্নত বক্ষ দেখে বিচলিত হয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, যারই পরিণতিতে ম্যানেজমেন্ট বাধ্য হয়েছে রোবটকে ওড়না পরিয়ে তার উন্নত বক্ষ ঢেকে দিতে, যাতে অন্তত দেখতে “শ্লীল” মনে হয়।

নারীদেহ নিয়ে আমাদের মধ্যে ট্যাবুটা কোন জায়গায় বুঝতে পারছেন? একটা রোবট, একটা পুতুল। তার উন্নত বক্ষ দেখেও আমরা অস্বস্তি বোধ করি, আমরা বিচলিত হয়ে যাই। ইসলাম ধর্মে নারীদেরকে শ্লীল কাপড় পরিধান করতে বলা হয়েছে। খুবই ভালো বিষয়। কিন্তু সমস্যাটা তো আমাদের। আমরা ধর্মীয় বিধানকে লেবুর মত চিপতে চিপতে এত তিতা বানিয়ে ফেলি যে পরবর্তীতে সেই বিধানটার মূল ব্যবহার না হয়ে বরং অপব্যবহারই অধিক হয়। যার কারণেই বেচারা রোবটটাও রেহাই পায় নি। জীবিত কোন কিছু না হয়েও তাকে জোর করে ধর্মীয় বিধান মেনে নিতে হয়েছে।

আমি চাইলে এখন ধর্মীয় বিধানের অপব্যবহার নিয়ে আরো বিশাল দুটো প্যারাগ্রাফ লিখে ফেলতে পারি। কিন্তু সেদিকে যেয়ে আসলে লাভ নেই। এইসব জিনিস আমাদের রক্তে মিশে আছে। মঙ্গোলিয়া, ডাচ, পর্তুগিজ, ব্রিটিশ সহ এমন সব রক্ত আমাদের শরীরে এসে মিশেছে যে একটা জগাখিচুড়ি বিচ্ছিরি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের জাতি তৈরী হয়েছি আমরা। এইসব জঘন্য চিন্তাভাবনা, অস্বস্তিকর মনোভাব ও পরিবেশ সৃষ্টি, সমাজে ব্যবধান তৈরী – এইসব অসভ্য কাজ কর্মের মূলে ওই মিশ্র রক্তই!

আমরা পশ্চাদ্দেশের মত বিভক্ত হতে জানি, কিন্তু একমত হয়ে প্রযুক্তিকে স্বাগত জানাতে জানি না। বাইরের বিশ্ব যখন দশ পা এগিয়ে যায় তখন বাধ্য হয়ে আমরা এক পা আগাই। মৌলবাদ, ধর্মের অপব্যবহার দিয়ে আমরা আমাদের চারপাশটাকে বিষাক্ত করে রাখি। এবং সেই বিষটা এতই ভয়ংকর যে, একটা প্রাণহীন রোবটও সেই বিষের জ্বালা থেকে রেহাই পায় না। আজ থেকে কয়েক প্রজন্ম পর সায়েন্স ফিকশন ধর্মী সিনেমা টার্মিনেটর এর মত রোবটরা যদি সত্যিই বিদ্রোহ করে বসে, আমি নিশ্চিত এর পেছনে দায়ী থাকবো আমরা, বাঙ্গালী জাতি।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-