অভিনন্দন আশরাফুল ইসলাম জোহান। চট্টগ্রামের এই তরুণ একজন ফুটবল ফ্রিস্টাইলার। বল নিয়ে তার কারিকুরি দেখে মনে হয় যেন সে এক ম্যাজিশিয়ান, বলের উপর এতটাই নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ তার। ফুটবলের ভাষা বেশ ভালই রপ্ত করেছে জোহান, তাই ফুটবলও তার ভাষাটা বেশ ভাল বোঝে।

ইউটিউব ঘুরে ঘুরে আপনি হয়ত ফ্রিস্টাইল ফুটবলের হাজার হাজার ভিডিও দেখে ফেলেছেন। কখনো মুগ্ধ হয়ে সেসব শেয়ারও দিয়ে আক্ষেপ করেছেন। আপনার আক্ষেপ একদমই যুক্তিযুক্ত, কারণ বাংলাদেশে এত কোয়ালিটি ফুটবল ফ্রিস্টাইলার সচরাচর চোখে পড়ে না। পড়লেও এই ধরণের প্রতিভারা আড়ালে থেকে যায়। কারণ, আমরা আমাদের দেশের মেধা, প্রতিভার যথাযথ মূল্যায়ন করতে শিখিনি। আমরা মেতে থাকি বিভিন্ন অসুস্থ-মস্তিষ্ক-বিকৃত তথাকথিত স্বঘোষিত সোশ্যাল মিডিয়া সেলিব্রেটিদের নিয়ে।

কিন্তু, আশরাফুল ইসলাম জোহান নিজের প্রতিভা যে স্টেজে প্রমাণ করেছেন তাতে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হয়ে গেছে এই ছেলেটির অর্জনকে ছড়িয়ে দেয়া। গিনেজ বুকে একজন বাংলাদেশির রেকর্ড, তাও আবার ফুটবল নিয়ে, কতটা গর্বের ভাবতে পারেন!

ফ্রিস্টাইল ফুটবল হলো নিজের দক্ষতা প্রকাশের উপায়। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ যেমন- মাথা, কাঁধ, বসে থেকে অথবা পায়ের সাহায্যে ফুটবল দিয়ে বিভিন্ন কলাকৌশল প্রদর্শন করা হয়ে থাকে ফ্রিস্টাইল ফুটবলে। অনেক বিখ্যাত ফুটবলার প্রফেশনাল ফুটবলের বাইরে ফ্রিস্টাইলেও অসাধারণ ছিলেন। রোনালদিনহো, মেসি, রোনালদো, নেইমারদের ফুটবল নিয়ে কসরত করতে দেখা যায় ইউটিউবের বিভিন্ন ভিডিওতে। এটা একটা বিশেষ প্রতিভা, তবে প্র‍্যাকটিস করতে করতে অনেক পরিশ্রমের পরেই কেবল একজন মানুষ এইরকম দক্ষতা অর্জন করতে পারেন।

অসাধারণ ফ্রিস্টাইলাররাই শুধু এই কলাকৌশল গুলো দেখিয়ে মানুষকে মোহগ্রস্থ করতে পারেন। কারণ, এটা যে কেউ চাইলেই করতে পারে না। ম্যাজিক দেখে আপনি যেমন হতভম্ব হয়ে ভাবেন কিভাবে সম্ভব হলো, ফ্রিস্টাইলারদের ফুটবল নিয়ে করা কসরত দেখেও আপনার সেরকম অনুভূতি হবে।

জোহান ইতিমধ্যে ফ্রিস্টাইল দেখিয়ে মানুষকে চমকে দিয়েছেন। তিনি এতোটাই সাবলীল যে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। ফুটবল পেলে যেনো তিনি অন্যজগতে প্রবেশ করেন। যে জগতের আধিপত্য শুধু তার। সম্প্রতি জোহান গিনেজ বুক রেকর্ডসের জন্য চেষ্টা করেন। সবচেয়ে বেশি ‘সাইড হেড স্টল বল কন্ট্রোল ইন ওয়ান মিনিট’ এই সেগমেন্টের জন্য। এটির আগের রেকর্ড হোল্ডার ছিলেন আর্চিস প্যাটেল নামে একজন। মে মাসের ২২ তারিখ জোহান অফিসিয়ালি এই রেকর্ডটি নিজের করে নেন। গতকাল গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস থেকে তিনি এই অনন্য কীর্তির জন্য সার্টিফিকেট পান।

এই অর্জন তাকে যেমন আরো বড় কিছু করার প্রেরণা যোগাবে, তেমনি তার এই অর্জনের খবর ছড়িয়ে পড়লে এদেশের ফুটবল নিয়ে কিশোরদের মধ্যে নতুন করে আগ্রহ জন্মাবে। ফুটবলের আসল সৌন্দর্য একবার উপভোগ করতে শিখলে সেটা দিয়েও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা যায়, ইতিবাচকভাবে দেশের নামটা বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেয়া যায় তার প্রমাণ আশরাফুল ইসলাম জোহান।

ফ্রিস্টাইলকে বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্ব দিতেই ২০১১ সালে ওয়ার্ল্ড ফিস্টাইল ফুটবল ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ফেডারেশনটির প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন ড্যানিয়েল উড়। ফেডারেশনের এম্বাসেডর হিসেবে কাজ করছেন বিশ্বখ্যাত সাবেক ব্রাজিলিয়ান তারকা রোনালদিনহো। ফেডারেশনটি সারাবছর ফিস্টাইল ফুটবলের বিভিন্ন ধরণের আয়োজন করে থাকে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বিশ্ব ফ্রিস্টাইল ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ, ওয়ার্ল্ড ট্যুর, সুপারবল, রেড বুল স্ট্রিট স্টাইল, এফ-৩ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপসহ আরো কিছু প্রতিযোগিতা।

প্রতি বছর চেক প্রজাতন্ত্রের প্রাগে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব ফ্রিস্টাইল ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ। জোহানের স্বপ্ন তিনি এই চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। গিনেজ বুক রেকর্ডসের এই অর্জনের ফলে জোহান এখন আরো বেশি অনুপ্রাণিত হবেন নিশ্চিতভাবেই। ফ্রিস্টাইলই বর্তমানে তার ধ্যানজ্ঞ্যান। ২০১৫ সাল থেকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়ে শুরু করেছিলেন এই ফ্রিস্টাইলিং!

যদিও শুরুতে হয়ে চেয়েছিলেন ফুটবলারই। এমনকি ২০১৪ সালে এয়ারটেল রাইজিং স্টার প্রোগ্রামে নির্বাচিত ১২০ জন খেলোয়াড়ের একজন ছিলেন তিনি। সেরা ১২ জনকে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হোম গ্রাউন্ডে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফুটবল স্কুলের পেশাদার কোচদের সাথে দেখা করার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। তিনি তখন সেরা ১২তে যেতে না পারলেও এখন ফ্রিস্টাইল ফুটবলের ক্যারিশমা দেখিয়ে ‘মোস্ট সাইড হেড স্টল বল কন্ট্রোল ইন ওয়ান মিনিট’- এটাতে একেবারে রেকর্ড গড়েই গিনেজ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে জায়গা করে নিয়েছেন।

সামনে তিনি আরো বহু দূর যাবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা। যেহেতু তিনিও ফ্রিস্টাইলকে মন দিয়ে ভালবাসেন, আমরাও চাই এই ভালবাসা জারি থাকুক। বাংলাদেশের নামটুকু বিশ্বদরবারে এভাবে প্রতিনিধিত্ব করতে পারা অবশ্যই বিশেষ কিছু। তিনি এমন সম্মান আরো নিয়ে আসবেন বাংলাদেশের জন্য, মানুষ আজেবাজে ভিডিও ভাইরাল না করে তার ফ্রিস্টাইল দেখে মুগ্ধ হোক, তাকে নিয়ে আলোচনা করে তাকে অনুপ্রাণিত করুক, এটাই যেন হয়। গুণের কদর করতে না পারলে তো আসলে গুণী জন্মায় না…

জোহানের ফ্রিস্টাইলের ভিডিউ দেখুন তার ইউটিউব চ্যানেলে

Comments
Spread the love