ঢাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের দেয়ালে শিক্ষাঙ্গণে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে শহীদ রাজুর গ্রাফিতি মুছে নাকি বঙ্গবন্ধুর গ্রাফিতি আঁকা হচ্ছে। প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি, কারণ, কাজটা হচ্ছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতার প্রত্যক্ষ উদ্যোগে। আমি জানি না এ কেমন উদ্যোগ বা কেনই এই উদ্যোগ। বঙ্গবন্ধুর গ্রাফিতি আঁকার জন্য কারো গ্রাফিতি মুছে ফেলার তো প্রয়োজন নেই! যত্রতত্র বঙ্গবন্ধুর নামের ব্যবহার করে বঙ্গবন্ধুকে ছোটো করার তো প্রয়োজন নেই। এই বাজে সংস্কৃতি যদি বঙ্গবন্ধুর নামধারী সৈনিকরাই তৈরী করে দেয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এদেশে বঙ্গবন্ধুর সমস্ত গ্রাফিতি মুছে দিয়ে জিয়াউর রহমানের গ্রাফিতি আঁকা হবে না? ‘জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর’-এর নামে পালটে শেখ হাসিনা কি পারতেন না বঙ্গবন্ধুর নামটা চালিয়ে দিতে? জিয়ার নাম মুছতে বঙ্গবন্ধুকে লাগবে কেন? এই সিম্পল রাজনীতি যদি নেত্রী বুঝেন, তাহলে ছাত্রলীগের সমস্যাটা কোথায় আসলে? মুখে জয় বাংলা বললেই বঙ্গবন্ধুর চেতনা ধারণ করা হয়ে যায়? এতই সোজা? যদি তেমনই হতো তাহলে তো বাংলার ঘরে ঘরে আজ তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, খালেদ মোশাররফরা বেড়ে উঠতো। কই এমন নেতারা যারা নেতৃস্থানীয় গদি ছেড়ে মানুষের কাছে পৌঁছে গেছেন?

১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর কোথায় ছিলো এইসব গ্রাফিতি, জয় বাংলা স্লোগান? আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে কে কবে কোথায় কয়টা বঙ্গবন্ধুর গ্রাফিতি এঁকেছিল? কয়টা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৭ই মার্চের ভাষণ প্রচারিত হতো? দেশের কয়টা অলিগলিতে বঙ্গবন্ধুর নামে মিছিল হতো?

আচ্ছা, এদেশে যদি বঙ্গবন্ধুর কোনো ভাস্কর্য না থাকে, কোনো গ্রাফিতি না থাকে, যদি ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ উচ্চারিত না হয়, তাহলে কি বঙ্গবন্ধু মুছে যাবে এদেশের ইতিহাস থেকে? এতই সোজা? এদেশের জন্ম ইতিহাস লিখতে হলে বঙ্গবন্ধুর নাম বাদ দেয়া সম্ভব? বঙ্গবন্ধুর ঘোরতর শত্রুরাও কি এই কাজ করতে পারবে? আমরা যারা নিজেদের বঙ্গবন্ধুর সৈনিক দাবী করি, তারাই যদি বঙ্গবন্ধুকে জোর করে চাপিয়ে দিই, ফুটপাথে রাস্তার অলিতে গলিতে যেখানে সেখানে বঙ্গবন্ধুর নাম বিক্রি করে নিজের আখের গুছিয়ে নিই, তাহলে অন্যরা কি করবে? খালেদা জিয়া ১৫ই আগস্টে জন্মদিন পালন করে, এ নিয়ে আমাদের ক্ষোভের শেষ নেই, তো আমরা কি করছি আসলে? একজন দুর্নীতিবাজের মুখে বঙ্গবন্ধুর নাম মানায় না, একজন সাম্প্রদায়িক হায়েনার মুখে বঙ্গবন্ধুর নাম মানায় না, যার কাছে দেশের চাইতে নিজের স্বার্থ বড় তার মুখে বঙ্গবন্ধুর নাম মানায় না।

এদেশের একজন মানুষও যদি বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে না আনে, বঙ্গবন্ধুর কিচ্ছু যায় আসে না। একটি স্বাধীন দেশ উপহার দেয়া, একজন জননন্দিত নেতা উপহার দেয়া যে শেখ মুজিবের ডেসটিনি, আপনার আমার মতো একজন স্বার্থবাদী নিচু মানসিকতার লোকের মুখে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ না হলে কিচ্ছু আসে যায় না। বঙ্গবন্ধু নিজেও চাইতেন না যদি তিনি বেঁচে থাকতেন।

যত্রতত্র বাজারের ব্যাগে, বিরিয়ানির প্যাকেটে, গলির দেয়ালে বঙ্গবন্ধুর নাম লিখে তাঁকে ছোটো করার দরকার আছে বলে তো মনে হয় না। আর মঈন হোসেন রাজু যেখানে শিক্ষাঙ্গণে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একজন প্রতিবাদী আইকন, তাঁকেও বঙ্গবন্ধুর মুখোমুখি দাঁড় করানো আকাঠ নির্বুদ্ধিতা। আমি নিজেও ছাত্রলীগের ব্যানারধারী, স্লোগানধারী, বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। কিন্তু কখনো যদি এমন কিছু করতে হয় যা বঙ্গবন্ধুকে ছোটো করে নিজের স্বার্থ উদ্ধার করবে, তাহলে সেদিন অবশ্যই সসম্মানে নেমে দাঁড়াবো।

ক্ষমতা বা নেতৃত্বের লোভ করি না। নিজের আদর্শকে যেখানে বিক্রি করতে হয় সেখানে দুই মিনিট দাঁড়িয়ে থাকাটাও মেরুদণ্ডহীনতা। আর মেরুদণ্ড সোজা করে নিজের আদর্শ নিয়ে লড়াই করাটা বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকেই শিখেছি। আমার মনে হয়, ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দেয়ার জন্য এর চেয়ে বেশি যোগ্যতা প্রয়োজন নেই। 

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-