আধুনিক যুগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। অন্য যেকোন সময়ের চেয়ে সাম্প্রতিককালে বিজ্ঞান সবচেয়ে বেশি উন্নতি সাধন করেছে, আর তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে প্রযুক্তিক্ষেত্রেও। নিত্যনতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানবজাতি প্রবেশ করছে এক নতুন মাত্রায়।

প্রযুক্তির কাজই হলো মানুষের জীবনকে আরও বেশি সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করে তোলা। অর্থাৎ প্রযুক্তি মানুষের উপকার করবে, জীবনকে গতিশীল করে তুলবে এবং সব ধরণের সংকট নিরসন করবে, এমনটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু কখনও কখনও এর উলটো চিত্রও দেখা যায়। প্রযুক্তি মানুষের জন্য শুধু অপকারী ও ক্ষতিকরই না, তার জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপও হয়ে উঠতে পারে।

সম্প্রতি এমনই একটা দৃষ্টান্ত দেখা গিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। দুই বন্ধুসহ গাড়ি চালাতে চালাতে এক ব্যক্তি তুষার জমা লেকের উপর গাড়ি তুলে দিয়েছে, এবং শেষ পর্যন্ত গাড়িটি ডুবে গেলেও কোন রকমে প্রাণে বেঁচেছে তারা। শুরুতে মনে হয়েছিল তারা বোধহয় গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল বা মাদকের নেশায় বুঁদ হয়ে ছিল, যেখানে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে গাড়ির চালক নিয়ন্ত্রণও হারায়নি, নেশার ঘোরেও ছিল না। সে একদম জেনেবুঝে কাজটা করেছে। আর এ কাজ করেছে সে অন্ধভাবে জিপিএস অনুসরণ করতে গিয়ে!

পুলিশি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভারমন্টের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে এ ঘটনাটা ঘটেছে। এসইউভি গাড়ি চালানোর সময় চালক একটা জিপিএস অ্যাপস অনুসরণ করছিল, এবং সেখানেই সে মূল রাস্তা থেকে বেরিয়ে এসে শর্ট কাটে যাওয়ার একটা বিকল্প পথের হদিস পায়। এবং সেই শর্ট কাট পথকেই ওই ব্যক্তি সঠিক ভেবে নেয়, আর বেশি চিন্তাভাবনা না করেই সে অনুযায়ী গাড়ি এগিয়ে নিয়ে যায়। আর তার ফলে গাড়িটা পতিত হয় একটা লেকে।

আরও জানা যায়, ওই চালক ব্যক্তি ‘অয়েজ’ নামক জিপিএস অ্যাপ ব্যবহার করছিল, যেটা ব্যবহারকারীদের কাছ থেকেই ডেটা সংগ্রহ করে অন্য ব্যবহারকারীদেরকে ট্রাফিক জ্যাম বা স্পিড ক্যামেরা এড়িয়ে চলার পথ বাতলে দেয়। এবং অন্যান্য আরও অনেক জিপিএস অ্যাপের মত এটার মালিকানাও স্বয়ং গুগলের হাতেই।

তিনজন ব্যক্তি যে ওয়েজ অ্যাপ অনুযায়ী চলাচল করতে গিয়ে মরতে মরতে বেঁচেছে, এর দায় কিছুটা হলেও গুগলের উপর বর্তায়। এ প্রসঙ্গে গুগলের মুখপাত্র জুলি মোসলার ইউএসএ টুডে-কে জানান, ‘প্রতিদিনকার রাস্তার অবস্থা অনুযায়ী ওয়েজ অ্যাপটি দৈনিক লক্ষাধিকবার এডিট করা হয়ে থাকে। তাই এটাকেই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে দাবি করি আমরা। তারপরেও রাস্তায় চলাচলের সময় চালকদের উচিৎ দৃষ্টি পথের ওপর রাখা।’

গুগলের মুখপাত্র যে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু তিনি তার কথার শেষে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বার্তাও দিয়েছেন। মানুষ তার প্রয়োজনে প্রযুক্তির জন্ম দিয়েছে। অথচ আজকাল মানুষই প্রযুক্তির দাস হয়ে উঠছে, যা একদমই উচিৎ নয়। যতদিন মানুষ অন্ধভাবে প্রযুক্তিকে বিশ্বাস না করে নিজেদের ইন্দ্রিয়শক্তিরও সঠিক প্রয়োগ করবে, সেদিনই তারা প্রযুক্তির সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার করতে পারবে ও সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে। আর যদি প্রযুক্তিকেই একচেটিয়াভাবে সবকিছুর সমাধান বা শেষ কথা হিসেবে মানতে চাওয়া হয়, তাহলে জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে গিয়ে বিপদ অনিবার্য।

তাই পাঠকের প্রতি অনুরোধ, জীবনের নানা ক্ষেত্রে প্রযুক্তিকে কাজে লাগান অবশ্যই। কিন্তু তাই বলে নিজেদের জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেককে একেবারে বাক্সবন্দি করে রাখবেন না যেন!

তথ্যসূত্র- www.ndtv.com

Comments
Spread the love