গর্ডন গ্রিনিজ আমাদের ক্রিকেটের প্রথম বিদেশী কোচ, এর চেয়েও বড় পরিচয় হচ্ছে এই মানুষটিই প্রথম আমাদের সত্যিকারের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে শিখিয়েছিলেন।

তার তত্ত্বাবধানেই আমরা প্রথম ওয়ানডে জয় পেয়েছিলাম কেনিয়ার বিপক্ষে, ১৯৯৭ সালে কুয়ালালামপুরে আইসিসি ট্রফি জিতে প্রথমবারের মত ১৯৯৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পেয়েছিলাম। এই মহান দিকনির্দেশককে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিয়ে সম্মানিত করেছিল। সেই গর্ডন গ্রিনিজের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের অন্যতম আনন্দময় ঘটনাটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল সবচেয়ে আপনজন হারানোর কষ্টে!

১৯৮৩ সাল। অ্যান্টিগার সেন্ট জোন্সে ভারতের বিপক্ষে পঞ্চম টেস্টে সমানে সমান পাল্লা দিচ্ছে ওয়েস্টইন্ডিজ। যে টেস্টে এমন এক বেদনাদায়ক ট্রাজেডী ঘটেছিল যে আজো তা তাড়িয়ে বেড়ায় এক সন্তানহারা বাবাকে!

প্রথম ইনিংসে ভারতের সংগ্রহ করা ৪৫৭ রানের জবাবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওপেনিং জুটি দুর্দান্ত খেলছে। ডেসমন্ড হেইন্স আর গর্ডন গ্রিনিজ ভারতের বোলারদের হতাশ করে যাচ্ছেন সেশনের পর সেশন। ২৯৬ রানের ওপেনিং জুটি গড়ে শেষ পর্যন্ত ১০ চার ও ১ ছয়ে ব্যাক্তিগত ১৩৬ রানে আউট হলেন হেইন্স।

কিন্তু তাতে কি? গর্ডন গ্রিনিজ যে কোনভাবেই থামছেন না! আবারো শুরু করলেন তিনি, চারের মার দিয়ে। কিন্তু হঠাৎ করেই থেমে গেল খেলা। গ্রিনিজ তখন ১৫৪ রানে অপরাজিত, তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ স্কোর এটি তখন পর্যন্ত। এমন অবস্থায় খেলা থেমে গেল, কারণ ড্রেসিংরুম থেকে অতিরিক্ত খেলোয়াড় মারফত গ্রিনিজের কাছে খবর এসেছে, তার আদরের মেয়েটা খুবই অসুস্থ, সঙ্কটাপন্ন অবস্থা।

কি বিচিত্র বিচার স্রষ্টার! ঠিক যে মুহুর্তে একজন ব্যাটসম্যান তার পরম আকাঙ্ক্ষিত টেস্ট শতক পেয়েছেন, অপরাজিত ইনিংসে আরো প্রবল হয়ে তার ক্যারিয়ারের এক স্মরণীয় ইনিংসকে আরো এগিয়ে নিতে চলেছেন, ঠিক সেই মুহুর্তে হরিষে বিষাদের মত খবর এলো, তার প্রাণের চেয়েও প্রিয় সন্তান সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এমন এক ভয়াবহ মুহুর্তে ঠিক কি করতে পারেন একজন বাবা?

হ্যা, ঠিক সেটাই করেছিলেন তিনি, যেটা এক বাবা করবে। সেঞ্চুরি কিংবা ডাবল সেঞ্চুরি হয়তো অনেক বড় অর্জন তার ক্যারিয়ারের জন্য, কিন্তু তার মেয়ের অসুস্থতার কাছে যে পুরো পৃথিবীও তুচ্ছ! তৎক্ষণাৎ মাঠ থেকে উঠে গেলেন গ্রিনিজ, একটু পরেই মাঠ ছেড়েই চলে গেলেন। অ্যান্টিগা থেকে সরাসরি চলে গেলেন তার জন্মভূমি বার্বাডোজে, দুরু দুরু বুকে একটা দুর্ভাবনা, মেয়েটা আমার কেমন আছে!

মাঝে মাঝে বাস্তব গল্পের চেয়েও যন্ত্রণাদায়ক হয়। মাঠে অসাধারণ এক সেঞ্চুরি ফেলে বার্বাডোজ ছুটে গেলেন গ্রিনিজ যে মেয়েকে দেখতে, ঠিক দুদিন পড়ে খবর এলো গ্রিনিজের সেই আদরের মেয়েটা মারা গেছে। কি বিচিত্র, কি অদ্ভুত এই পৃথিবী! স্কোরবোর্ডে সেই যে লেখা হয়েছিল গর্ডন গ্রিনিজ- রিটায়ার্ড হার্ট ১৫৪”, স্কোরবোর্ডের সেই লাইনটা পাল্টালো না। অনুচ্চারে শুধু আরো কিছু শব্দ অদৃশ্য অক্ষরে লেখা হয়েছিল সেই লাইনের পাশে, গর্ডন গ্রিনিজ- ১৫৪* রিটায়ার্ড হার্ট অ্যান্ড লুজিং হিজ ডটার ফরেভার! পৃথিবীর ইতিহাসে এই একটাই উদাহরণ তৈরি হয়ে আছে আজ পর্যন্ত যেখানে একজন বাবা সেঞ্চুরির পরেই হারিয়েছিলেন তার আদরের সন্তানকে!

পরে আইসিসি সেই ইনিংসটিকে ‘অবসর-অপরাজিত’ ঘোষণা করেছিল ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানের মেয়ের প্রতি ভালোবাসা জানিয়ে। ক্রিকেট ইতিহাসে এখনো পর্যন্ত একমাত্র ‘অবসর-নট আউট’ ব্যাটসম্যান গ্রিনিজই। বাংলাদেশের সাবেক কোচ। একজন সন্তানহারা বাবা!

১০৮ টেস্টে ৪৪.৭২ গড়ে ১৯টি সেঞ্চুরি আর ৩৪টি হাফসেঞ্চুরিতে ৭ হাজার ৫৫৮ রান করা ক্যারিবিয় কিংবদন্তি গর্ডন গ্রিনিজ এরপরেও অসাধারণ সব ইনিংস খেলেছেন, হাঁকিয়েছেন ডাবল সেঞ্চুরি, তার ক্যারিয়ার সর্বোচ্চ সংগ্রহ ২২৬ রান। ডেসমন্ড হেইন্স নামের আরেক পাগলাটে ওপেনারের সাথে মিলে ম্যাচের পর ম্যাচ অসামান্য ব্যাটিং করে সর্বকালের অন্যতম সেরা উদ্বোধনী উইকেট জুটি গড়েছেন। দুজন মিলে ভেঙেছেন অসংখ্য রেকর্ড, গড়েছেন তারচেয়েও বেশি। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে ওপেনিং উইকেট পার্টনারশিপে আজো ধরাছোঁয়ার বাইরে হেইন্স এবং গ্রিনিজের রেকর্ড পার্টনারশিপ। ১৪৮ ইনিংসে ৪৭.৩১ ব্যাটিং গড়ে দুজন মিলে ৬,৪৮২ রান তুলেছেন তারা। এর মধ্যে ১৬টি সেঞ্চুরি পার্টনারশিপ এবং ২৬টি হাফসেঞ্চুরি পার্টনারশিপ! আজ থেকে প্রায় ৩০-৩৫ বছর আগের সেই সময়েও ভয়ংকর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং-এ হাঁকিয়েছিলেন ৬৭টি ছয়, যা টেস্ট ক্রিকেটে এখনো অসাধারণ এক কীর্তি!

১৯৮৪ সালেই ব্ল্যাকওয়াশ সিরিজে অসাধারণ দুটো ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন গ্রিনিজ, যার একটি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, লর্ডসে, টেস্টের শেষদিনে! লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডে তার অপরাজিত ২১৪ রানের ইনিংসে ইংল্যান্ডের ছুঁড়ে দেওয়া ৩৪২ রানের জয়ের লক্ষ্য পেরিয়ে গিয়েছিল দুর্দমনীয় ওয়েস্ট ইন্ডিজ, যা আজো লর্ডস গ্রাউন্ডে সর্বোচ্চ রান করে জেতার রেকর্ড। সেই সিরিজেই চতুর্থ টেস্টে ম্যানচেস্টারেও ২২৩ রানের এক ইনিংস খেলেছিলেন গ্রিনিজ, ইংল্যান্ড হেরেছিল ইনিংস ব্যবধানে। কিন্তু ১৯৮৩ সালের ২৮শে এপ্রিল থেকে ৩রা মে অ্যান্টিগার সেই পঞ্চম টেস্টের স্কোরবোর্ডে গ্রিনিজের রানটা থেমে আছে সেই ১৫৪ রানেই, ক্রিকেট ইতিহাসে একমাত্র অবসর নট আউট হয়ে!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-