গুগল একই ধরণের কাজের জন্য এই কোম্পানীতে কর্মরত পুরুষদের চেয়ে নারীদের কম বেতন-ভাতা এবং সুযোগ-সুবিধা দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে গুগলের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, গুগলে কর্মরত নারীদের যথেষ্ঠ যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি এবং পেশাগত অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে পুরুষদের চেয়ে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। টেকনোলোজিতে শীর্ষস্থানীয় এই কোম্পনীটিতে নারীদের তুলনামূলক কম বেতনের ছোট পদগুলোতেই আটকে রাখা হয়। এর আগে, ২০১৫ সালে প্রথম গুগলের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছিল।

১৪ সেপ্টেম্বর কালিফোর্নিয়ার আদালতে গুগলের হেটকোয়ার্টারে গত চার বছর ধরে কর্মরত সকল মহিলাদের পক্ষ থেকে তিনজন নারী এ অভিযোগটি দায়ের করেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত সকল তথ্যাদি আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতে পেশ করা হয়। এর আগে কয়েকমাস ধরেই গুগলের এই লিঙ্গ বৈষম্য ও বেতন-ভাতার অসমতার ব্যাপারটি সেখানে কর্মরত নারীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়ে আসছিল। দ্যা গার্ডিয়ান পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ মামলার প্রধান বাদীদের একজন এবং গুগলের সাবেক কর্মী কেলি এলিস বলেন, আমরা অনেকদিন থেকেই এ ব্যাপারে কথা বলছি, কিন্তু এ অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। তিনি ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, অনেক চেষ্টা করা হয়েছে এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য, কিন্তু…শেষ পর্যন্ত মামলা দায়ের করা ছাড়া আর কোন পথ খোলা ছিল না এই কোম্পানির নীতিতে পরিবর্তন আনার জন্য। তারা মহিলাদের সাথে যে ধরণের বৈষম্য করে তা বদলানো দরকার।

গুগলের বিরুদ্ধে এমন একটা সময় শ্রম আইন লঙ্ঘনের এই অভিযোগটি উঠল যখন পুরো পুরুষশাসিত টেকনোলোজি সেক্টরটাই যৌন হয়রানি, বৈষম্য আর বৈচিত্রহীনতার অভিযোগে জর্জরিত। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম বিভাগ গুগলকে গত এপ্রিলে প্রথমবারের মত, শ্রম আইন ভঙ্গ করার অভিযোগে অভিযুক্ত করে এবং একটি সরকারি তদন্তের প্রয়োজনে গুগলকে বেতন-ভাতার লিখিত বিবরণী পেশ করার জন্য নির্দেশ জারি করে।

অনেকের পক্ষ থেকে গুগলে কর্মরত যে তিনজন নারী কোম্পানীটির বিরুদ্ধে  মামলা দায়ের করেছেন তাদের তিনজনেরই গুগলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। নিজেদের অভিজ্ঞতার আলোকে তারা গুগলের নারী বৈষম্য নীতির চিত্র তুলে ধরেন।

একজন সফট্ওয়ার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ‘গুগল ফটোস’-এ এলিস তার পেশাজীবন শুরু করেন ২০১০ সালে। কোম্পানি তাকে ‘লেভেল-৩’ পজিশনে নিয়োগ দেয়, সাধারণত যে পজিশনে নতুন কলেজ গ্রাজুয়েটস্ দের গুগল নিয়োগ দিয়ে থাকে। কিন্তু, তাকে নিয়োগ দেয়ার কয়েক সপ্তাহ পর গুগল একজন পুরুষ সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ারকে নিয়োগ দেয় ‘লেভেল-৪’ পজিশনে যিনি এলিসের সাথে একই বছর গ্রাজুয়েশন শেষ করেন। লেভেল-৪ এর ইঞ্জিনিয়াররা উল্লেখযোগ্যহারে বেশি বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য সুযোগসুবিধা পেয়ে থাকেন। এলিসের মতে, তিনি প্রথমদিকে গুগলে চাকরি পেয়েই খুশি ছিলেন। গুগলের এসব বৈষম্যমূলক আচরণের কিছুই তিনি জানতেন না। সময় যেতে থাকলে তিনি লক্ষ্য করেন, তার চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পূর্ণ সফট্ওয়ার ইঞ্জিনিয়াররা যারা শুরুতে তার সাথে একই লেভেলে ছিল শুধুমাত্র পুরুষ হওয়ার কারণে তারা লেভেল-৪ এ প্রমোশন পায়। কিন্তু এলিসের চমৎকার পারফরমেন্সের রেকর্ড থাকে সত্ত্বেও গুগল তাকে পদোন্নতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়।  মামলার জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন তিনি। এলিস দাবি করেন, তিনি ২০১৪ সালে গুগলের চাকরি ছেড়ে দেন সেখানকার এই বৈষম্যমূলক সংস্কৃতির কারণে।

গুগল, নারী বৈষম্য

মামলার দ্বিতীয় বাদী হলি পিস, গুগলে কর্মজীবন শুরু করেন ২০০৫ সালে। তিনি সেখানে সিনিয়র ম্যানেজার পদে কাজ করেছিলেন যেখানে বিভিন্ন টিমের ৫০ জন সফট্ওয়ার ইঞ্জিনিয়ার ও প্রোডাক্ট ম্যানেজারকে দেখাশোনার ভার ছিল তার উপর। গুগলে জয়েন করার আগে তার নেটওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা ছিল। তারপরও গুগল তাকে একটি নন-টেকনিকাল পদে আটকে রাখে বলে তিনি দাবী করেন। অথচ যে পুরুষ ইঞ্জিনিয়াররা তার অধীনে ছিল এবং তার গ্রুপের অন্যান্য সিনিয়র ম্যানেজাররা সবাই টেকনিক্যাল পদে উন্নতি পায়, যেখানে সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি।

মামলায় পিস দাবি করেন, তিনি নন টেকনিক্যাল অনেককেই টেকনিক্যাল পদে ইন্টারভিউ তে কি করে পাস করতে হবে সে ব্যাপারে সাহায্য করেছেন। তার নিচের পদের অনেক পুরুষ কর্মীকেও তিনি সাহায্য করেছেন যাদের পারফরমেন্স অনেক খারাপ ছিল। সবাই পদোন্নতি পেয়েছে। শুধু তার পদোন্নতি হয়নি বলে পিস জানান। অভিযোগ করলে গুগলের পক্ষ থেকে হলি পিসকে জানানো হয়, অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তার টেকনিক্যাল যোগ্যতার কমতি রয়েছে। শেষ পর্যন্ত, গুগলে টেকনিক্যাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং কাজের সুযোগ না পেয়ে পিস ২০১৬ সালে গুগলের চাকরি ছেড়ে দেন।

গুগলের বিরুদ্ধে করা এই মামলার আইনজীবী জেমস ফিনবার্গ দ্যা গার্ডিয়ান পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, গুগলের সাবেক এবং বর্তমান কর্মজীবী মহিলাদের মধ্যে কমপক্ষে ৯০ জন এ মামলার ব্যাপারে তার সাথে যোগাযোগ করেছেন এবং সমর্থন জানিয়েছেন। নারীদের প্রতি এধরণের বৈষম্য খুবই হতাশাজনক এবং নীতিবিরুদ্ধ বলে তিনি জানান।

মামলার তৃতীয় বাদী, কেলি উইসুরি, ২০১২ সালে গুগলে কাজ করা শুরু করেন। যদিও সেলসে তার তিন বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা ছিল তবু গুগল তাকে ‘লেভেল-২’ এ নিয়োগ দেয়। নিয়োগের ক্ষেত্রে এটিই স্থায়ী এবং ফুলটাইম কর্মকর্তাদের জন্য সবচেয়ে নিচু লেভেল। অথচ উইসুরির মত সমান যোগ্যতার একজন পুরুষ কর্মকর্তাকে গুগল ‘লেভেল-৩’ এ নিয়োগ দিয়ে থাকে। উইসুরি দাবি করেন, তার মত ‘লেভেল-২’ এ কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে অর্ধেকই নারী এবং সেলসে কর্মরত ব্যক্তিদের মধ্যে যারা ‘লেভেল-৩’ এ কাজ করেন তাদের অধিকাংশই পুরুষ। তিনিও ২০১৫ সালে চাকরি ছেড়ে দেন গুগলের এই বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে।

গুগল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অবশ্য এ সম্পর্কে বিস্তারিত কোন মন্তব্য এখনো আসেনি। তবে গুগলের একজন মুখপাত্র, জিনা সেগ্লিয়ানো এই অভিযোগের ব্যাপারে আপত্তি জানান। তিনি দ্যা গার্ডিয়ানকে জানান, নিয়োগের লেভেল এবং পদোন্নতি নির্ধারিত হয় কঠোর শৃঙ্খলার মাধ্যমে। এর জন্য আলাদা একটা কমিটি রয়েছে এবং অনেকগুলো ধাপে যাচাই-বাছাইয়ের পর এ কোম্পানিতে কর্মী নিয়োগ দেয়া হয়। সেখানে এটাও দেখা হয় যে কারও প্রতি যেন কোন বৈষম্য না হয়। তারপরও যদি কোন সমস্যা বা বৈষম্য থেকে থাকে তাহলে সেগুলো ঠিক করার জন্যে তারা কাজ করে যাচ্ছে। কারণ, গুগল সবসময় সকল কর্মীদের কাছে একটি কর্মীবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হতে বদ্ধ পরিকর।

যুক্তরাষ্ট্রের লেবার ডিপার্টমেন্টের একজন অফিসিয়াল, যিনি গুগলের এক অডিটে জড়িত ছিলেন তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, সরকারি বিশ্লেষণ অনুসারে গুগলে নারীদের প্রতি বৈষম্য চরম। পুরো টেকনোলোজি ইন্ডাস্ট্রিতেই রয়েছে এই বৈষম্য। বর্তমানে, গুগলের ৮০% টেকনিক্যাল পদে পুরুষরা কর্মরত রয়েছে।

এ মাসেই দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে গুগলের অভ্যন্তরীণ একটি স্প্রেডশিট প্রকাশিত হয় যাতে দেখা যায় সেখানে কর্মরত একই লেভেলের চাকরিতে নারীরা পুরুষদের চেয়ে কম বেতন-ভাতা পেয়ে থাকে। যদিও গুগলের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রকাশিত স্প্রেডশিটটি থেকে সামগ্রিক কোন চিত্র পাওয়া যায় না। সেখানে চাকরিতে পারফরমেন্স বা কি ধরণের কাজে কর্মীরা নিযুক্ত রয়েছে এ ধরণের কোন তথ্য নেই।

গুগলের বিরুদ্ধে করা এই মামলা ও অভিযোগটি যদি সত্যি হয় তবে তা খুবই হতাশাজনক। বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল দেশে নারীর প্রতি বৈষম্য রয়েছে অনেক ক্ষেত্রেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মত উন্নত দেশে গুগলের মত শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক কোম্পানীতেও যদি সে ধরণের বৈষম্য থেকে থাকে তবে নারী-পুরুষের সমতা ও সহযাত্রার ক্ষেত্রে তা বড় ধরণের বাধা। যে বাধা, নারী-পুরুষ সমতার মাধ্যমে একটি উন্নততর পৃথিবী গড়ে তোলার কল্পনাকে শুধু কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ করে ফেলে।

Comments
Spread the love