মাহরীন ফেরদৌস, একটি নাম। কারো জন্য ‘মায়ায়’ মোড়ানো এক মানবী। ‘একুয়া রেজিয়া’ নামের আড়ালে লিখেছেন দীর্ঘ সময়। এবার ফিরেছেন স্বনামে। বর্তমানে প্রিয় দেশ ছেড়ে আছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যানসাসে। তার ‘গল্পগুলো বাড়ি গেছে’র গল্প জানতে হয়ে গেলো আরো নানান গল্প।

: ওই শহরের আকাশে মেঘেরা কেমন? কেমন কাটছে সংসার ও প্রবাস জীবন?

মাহরীন ফেরদৌস: এই শহরের নাম ‘উইচিতা’। এখানের আকাশ খুব নীল। যাকে বলা যায়, একদম রবীন্দ্রনাথের গানের মতো আকাশ। অবশ্য আমার শহর (ঢাকা) -র সাথে এর কোন মিল নেই। এই আকাশকে খুব সহজেই আলাদা করতে পারা যায়। তবে এখানের বৃষ্টি একদম আমার দেশের মত। বৃষ্টি হলে মনে হয় দেশেই আছি। দুজনের ছোট্ট সংসার ভালো চলছে। বেশ ভালো। এখানের জীবনযাত্রায় কষ্ট আছে তবে একসাথে রান্না করা, পাল্লা দিয়ে বই পড়া, গান শোনা, হুট করে কোথাও ঘুরতে চলে যাওয়া সব মিলিয়ে অন্যরকম সময় কাটছে।

: অবসরের সবচেয়ে প্রিয় কাজ কোনটি?

মাহরীন ফেরদৌস : উমম…অবসরে আসলে আমি সিনেমা দেখতে ভালোবাসি। এছাড়া গ্লাস পেইন্টিং করাও আমার খুব পছন্দের একটি কাজ। যেমন, বেশ কিছুদিন আগে ‘The Mountain Between Us’ দেখতে দেখতে একটি মগ পেইন্ট করেছিলাম। সেই সময়টুকুকে আমি অবসরই বলব। একটা সময় ছিল বলতাম, অবসরে বই পড়ি। এখন আর সেটা বলি না, কারণ, বই পড়ার জন্য আমার অবসর খুঁজতে হয় না। এটা এখন প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে।

: প্রিয় লেখকদের তালিকায় কাকে রাখেন প্রথম স্থানে? প্রিয় বই কোনটি?

মাহরীন ফেরদৌস : প্রিয় লেখকদের তালিকার আসলে কোন শেষ নেই। কাউকে প্রথম স্থানে রাখা আসলে কষ্টসাধ্য। যেমন, গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের লেখা ভালোলাগে জাদুবাস্তবতার জন্য। আবার ফ্রান্‌ৎস কাফকা এর লেখা ভালো লাগে কারণ তাঁর লেখায় সাহিত্যকর্মের মাঝেই প্রচুর আত্মজীবনীমূলক উপাদান থাকে। এছাড়া আমার কিশোরীকাল দখল করে রেখেছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, ডঃ মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা বইগুলো। তবে বর্তমানে হরিশংকর জলদাস এবং সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এর লেখা আমি খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ি।

প্রিয় বইয়ের তালিকা অনেক দীর্ঘ। সেভাবে আলাদা করে বলতে পারবো না। তবে কিছুদিন আগে পড়েছিলাম নির্ঝর নৈঃশব্দ্য এর লেখা ছোটগল্পের বই ‘রাজহাঁস যেভাবে মাছ হয়’। সেই বইটি পড়া মাত্রই আমার প্রিয় বইয়ের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

: লেখিকার লেখা জুড়ে একটা গুমোট বিষণ্ণতা খুঁজে পাওয়া যায়। বিষণ্ণতা ছড়িয়ে থাকে নামে, প্রচ্ছদে। বিশেষ কোনো কারণ?

মাহরীন ফেরদৌস : আসলে বিষণ্ণতা একটা গোপন ব্যাধির মত। এই ব্যাধি সবার মাঝেই আছে। কেউ প্রকাশ করে, কেউ করে না। ব্যক্তি আমি খুব হাসিখুশি মানুষ। বিষাদকে পোশাক হিসেবে মুখে ঝুলিয়ে রাখতে আমার ভালো লাগে না। তবে বিষণ্ণতা আমার ব্যাধি এবং একই সাথে বন্ধুর মত। তার সাথে বসবাস করতে আমার ভালো লাগে। সে কারণেই হয়ত নামে, লেখায়, প্রচ্ছদে সেটার ছাপ পড়ে যায়।

: ছোট গল্প থেকে আপনার শুরু। বিশাল ক্যানভাসের উপন্যাসে কখনো আপনার দেখা পাবো?

মাহরীন ফেরদৌস : হ্যাঁ। ছোটগল্প থেকে শুরু আর এবার বইমেলাতেও ছোটগল্পের বই এসেছে। উপন্যাস আমি লিখেছি তবে বিশাল ক্যানভাসে নয়। তবে ইচ্ছে আছে, লিখতে লিখতে যদি শব্দগুলো ডালপালা ছড়িয়ে আগাতে থাকে তাহলে বিস্তৃত পরিসরে লিখব। আমার কোন তাড়া নেই। কোন না কোন সময় হয়ত আমার লেখাই কোন এক উপন্যাসকে অন্য এক গন্তব্যে নিয়ে যাবে।

: নতুন লেখকদের নতুন পাঠক সৃষ্টি করার একটা তাগিদ থাকে, সেদিক থেকে প্রায় দুই বছরের বিরতি কি আপনাকে পাঠকদের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় নি?

মাহরীন ফেরদৌস : তাগিদ ব্যাপারটা আসলে কী? আমার মনে হয় লেখকের তাগিদ থাকবে লেখার জন্য। তৃষ্ণা থাকবে লেখার জন্য। এই তৃষ্ণা অনন্তকালের। ‘নতুন পাঠক বানাতে হবে’ এই তাগিদ শুনলে খুব বেশি বাণিজ্যিক মনে হয়। আর ফরমায়েশিও মনে হয়। সাহিত্যকে অতি উচ্চমানে নিয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখা যেমন ঠিক নয়, তেমনি করে এত বেশি ফরমায়েশি করাও ঠিক নয় যে পাঠক, পাঠক করে নিজের লেখা বা নিজস্বতা জলাঞ্জলি দিতে হবে।

আর ‘বিরতি’ কথাটা খুব নেতিবাচকভাবে বললেন। অথচ বিরতি কিন্তু মাঝে মাঝে বেশ ভালো ব্যাপার। একই খাবার বার বার খেতে আপনার ভালো লাগবে? নিশ্চয় না। তাই বিরতি প্রয়োজন। একই পোশাক রোজ রোজ পরতে ভালো লাগবে? উত্তরটি যদি ‘না’ হয় তাহলে আসলে বিরতি প্রয়োজন। পাওলো কোয়েলহো দুইটি বই প্রকাশ করে প্রায় আট বছর কোন বই প্রকাশ করেন নি। হুমায়ূন আহমেদ শঙ্খনীল কারাগার প্রকাশের প্রায় বারো বছর পর তৃতীয় উপন্যাস প্রকাশ করেছিলেন। তাই সৃষ্টি, ভ্রমণ, বিরতি এ সব কিছুই আসলে জীবনের অংশ। আর পাঠক দূরে যাবে কাছে আসবে, এমন হতেই থাকবে। আর কেউ যদি সত্যিকারের ভালোলাগা থেকে আমার লেখা পড়ে দুই বছর পর হলেও সে ঠিকই বই সংগ্রহ করবে। আর এটাই দিনশেষে প্রাপ্তি।

: অনেক বিখ্যাত লেখক-সাহিত্যিকই ছদ্মনামে লিখে জনপ্রিয় হয়েছেন, আপনার শুরুটাও ছদ্মনাম ‘একুয়া রেজিয়া’ দিয়ে। এই নাম ও নামের খ্যাতিকে সরিয়ে নিজের নামে নতুন করে পরিচিত হবার সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে কারণ কী ছিল?

মাহরীন ফেরদৌস : অনেক বিখ্যাত লেখক-সাহিত্যিকই ছদ্মনামে লিখে জনপ্রিয় হয়েছেন, অনেকে আবার হন নি। যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘নীললোহিত’ নামে লিখলেও তেমন প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন নি, কিন্তু বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায় আবার ‘বনফুল’ নামেই বেশি পরিচিতি পেয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ, শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তো নারীদের নামেও লিখেছেন একসময়। তাদের সবাই আবার স্বনামে ফিরে এসেছেন পরবর্তী সময়ে।

আমার লেখালেখির সূচনা মূলত ব্লগিং এর মাধ্যমে। সে সময় ব্লগে সবাই নিজের প্রকৃত নামের বদলে একটি ছদ্মনাম বা পেন-নেম নিয়ে লেখালেখি করত। আমিও তাই শুরু করেছিলাম। আমি গল্প, রিভিউ এবং দিনিলিপি লিখতাম। সেখান থেকে একটু একটু করে গল্প গুছিয়ে ২০১৩ সালে ‘একুয়া রেজিয়া’ নামে অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম বই “নগরের বৃস্মিত আঁধারে”। পরবর্তীতে সেই নামের আরও বেশ কিছু গল্প, উপন্যাস প্রকাশিত হয়। পাঠকপ্রিয়তাও পায়। বিগত দুই বছরে নতুন বই ‘গল্পগুলো বাড়ি গেছে’ এর জন্য লিখতে লিখতে আমার মনে হয়েছে আমি স্বনামে আসতে চাই। নিজের নাম ও লেখার নাম এর ব্যবধান আর রাখতে ইচ্ছে করে নি সে কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া। ব্যাপারটা আসলে যাহা বাহান্ন তাহাই, তাহাই তিপ্পান্ন টাইপের। যে একুয়া রেজিয়া, সে-ই মাহরীন ফেরদৌস। তারা একই হৃদয়ের, একই কল্পনার ও অনুভূতির অধিকারী।

: বই লেখা ও পড়ার যে সংস্কৃতি সেখানে বইমেলাকেন্দ্রিকতার প্রভাব আপনার মতে কতোটুকু? এবং এই বইমেলাকেন্দ্রিকতা থেকে উত্তরণের পথ কী কী বলে আপনার মনে হয়?

মাহরীন ফেরদৌস : সবকিছুর আসলে ভালো ও মন্দ উভয় দিক আছে। বইমেলা আমার খুব ভালো লাগে তবে বইমেলাকেন্দ্রিক বই প্রকাশ আমার ভালো লাগে না। সারা বছর কোন খবর নেই শুধু ফেব্রুয়ারি মাসের আগে সবাই হুমড়ি খেয়ে বই প্রকাশ করতে থাকল এই বিষয়টি আমার ভালো লাগে না। অনেক প্রকাশকই বলেন, “পাণ্ডুলিপি জমা নেব জুন-জুলাই মাসে। তবে বই আসবে ফেব্রুয়ারিতেই।” এই ব্যাপারটি আমার পছন্দ নয়। বছরজুড়ে নতুন বই প্রকাশ করে, পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়ে বইমেলার সময় মেলাতে বই রাখার উদ্যোগ নিলে মনে হয় বেশি ভালো হবে। যেমন, এই প্রচলিত ধারা ভাঙতে বেঙ্গল পাবলিকেশন ও বাতিঘর এর প্রকাশক ও লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন সারা বছর ব্যাপী বই প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। এমন উদ্যোগ আগে সেবা প্রকাশনী বাদে খুব কম প্রকাশনীই নিয়েছিল। এই কাজগুলো বাকি প্রকাশনীগুলোও নিতে থাকলে আরও ভালো হবে।

আর উত্তরণের পথ কিন্তু খুলে গিয়েছে। পাঠক সমাবেশ, জাগৃতি প্রকাশনীর রাজিয়া রহমান জলি এর দীপনপুর, দীপঙ্কর দাস এর বাতিঘর, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের পাঠাগার, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের বইয়ের দোকানগুলো মূলত একেকটি উত্তরণের পথ। আলোর পথ। দেশে খাবারের দোকান আর ফ্যাশন হাউজের চেয়ে যত বইয়ের দোকান হবে, যত মানুষ বই পড়বে, কিনবে, অন্যকে উপহার দিবে তত বেশি উন্নতি হবে। পরিবর্তন আসবে।

: দেখা যায় বিয়ের পর প্রত্যেকের জীবনেই বড় রকমের একটা পরিবর্তন আসে। দায়িত্বও বেড়ে যায়। আপনার জীবনের এই পরিবর্তন আপনার লেখালেখির জীবনে কতটুকু পরিবর্তন আনতে পারে বা পেরেছে?

মাহরীন ফেরদৌস : জীবনের প্রতিটি পরিবর্তন আসলে ব্যক্তিজীবনে প্রভাব ফেলে। তা বিয়ে হোক, দেশ বদল হোক, নতুন চাকরি হোক, সন্তানের জন্ম হোক, দুর্ঘটনা হোক কিংবা অন্যকিছুই হোক। হ্যাঁ, আমি আমার অবিবাহিত জীবনকে মাঝে মাঝেই অনুভব করি। সেই বাঁধনছাড়া জীবন। ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়ানো। বাড়ি ফেরার তারা নেই। এই বিষয়গুলো আসলেই দারুণ ছিল। আবার একই সাথে এও সত্যি বিবাহিত জীবনের রঙ অন্যরকম। রাত তিনটায় যখন গল্প লিখে আমার সাথের মানুষটিকে ঘুম থেকে জাগিয়ে গল্প পড়তে দেই। আর সে যখন মহা বিদ্বানের পাঠকের মতো মাথা নেড়ে নেড়ে গল্পের নানা ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দিতে থাকে কিংবা আমার শাশুড়ি যখন নতুন গল্প প্রকাশিত হবার সাথে সাথেই পড়ার জন্য মুখিয়ে থাকেন তখন এইসব অনুভূতি দেখতে ভালো লাগে। এই আনন্দগুলো অনেক ভিন্নস্বাদের। আরেকটি ব্যাপার হল, আমি লিখতে বসলে আমার সাথের মানুষটি কিংবা শ্বশুরবাড়ির কেউ আমাকে ঘাঁটাতে আসে না। আমার লেখা পরিবেশ অক্ষুন্ন রাখতে তারা সবাই খুব সচেতন। এই সহায়তাটুকু, সচেতনতাটুকু আমি খুব অনুভব করি। আর সম্পর্কের দায়িত্ব আসলে মানুষকে বেশ পরিণত করে। আমার অন্তত তাই মনে হয়েছে। সে কারণে সেই দায়িত্ববোধ আমার সাহিত্যচর্চার জন্য সহায়ক বলেই আমার মনে হয়।

: শেষ প্রশ্ন- ‘গল্পগুলো বাড়ি গেছে’ যদি কোনো কারণে এবার গল্পগুলো পাঠকদের মনের বাড়ি না যায়, যদি প্রত্যাশিত সাড়া না পান, বই লেখা কি ছেড়ে দেবেন?

মাহরীন ফেরদৌস : একদম না। সব বই লিখেই পাঠকের দুর্দান্ত সাড়া পাওয়া যাবে এমন ভাবাটা বোকামি। পাঠকরা স্বাধীন। গল্প ভালো লাগলে মনের বাড়িতে ঠাই দেবে। ভালো না লাগলে সরাসরি জানিয়ে দেবে। এর সাথে লেখা থামানো বা বই প্রকাশের সম্পর্ক আমি বাঁধতে যাবো না। পৃথিবীতে কেউ বাড়ি যায়, কেউ বা হারিয়ে যায়। পাঠকের মনে না হলেও গল্পগুলো কোন না কোন গন্তব্য ঠিক ঠিক খুঁজে নিবে।

Comments
Spread the love