খেলা ও ধুলারাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮

সোনালী প্রজন্ম, স্বর্ণালী সময়!

দলটাকে বলা হয় প্রতিভার খনি। হ্যাজার্ড-লুকাকু-ডি ব্রুইন-কোর্তোয়া-ফেলাইনি-চ্যাডলিদের নিয়ে গড়া একাদশ উড়িয়ে দিতে পারে বিশ্বের যেকোন দলকে। বেলজিয়ামের ফুটবল ঐতিহ্য ততটা সমৃদ্ধ নয়, বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলাটাই তাদের ইতিহাসের সেরা সাফল্য। সেই দেশের মানুষ এই দলটাকে নিয়ে আশায় বুক বেঁধেছিলেন, মিডিয়া তাদের নাম দিয়েছিল বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্ম। সোনালী প্রজন্মের প্রতিনিধিরা তো এখন সোনালী সময়ই পার করছে ফুটবলে! বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে শেষ চারে জায়গা করে নেয়ার পরে এমনটা বললে কি অত্যুক্তি হবে?

বেলজিয়ামের ফুটবল ইতিহাসে একই দলে এত তারকা, এত প্রতিভা আগে কখনও আসেনি। প্রতিভা, তারকা, এগুলো দিয়ে আসলে কিছুই হয় না। দিনশেষে আপনি ম্যাচ জিততে পারছেন কিনা, আপনার ভাণ্ডারে বলার মতো অর্জন আছে কিনা, সেটাই মূখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বেলজিয়ামের গোল্ডেন জেনারেশন সেই অর্জনের পথেও গতকাল সবচেয়ে বড় ধাপগুলোর একটা অতিক্রম করে ফেললো। বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলাটা অনেক দলের জন্যেই হয়তো বিশাল কোন অর্জন হবে না। তবে বেলজিয়ামের জন্যে সেটা খুব ছোটখাটো কিছুও নয়। ১৯৮২ সালের পর এই প্রথম রেড বিগ্রেড শেষ চারে জায়গা করে নিলো।

হট ফেবারিট হয়ে বিশ্বকাপে আসা দলটা কতটা ভালো করবে, সেটা নিয়ে গুঞ্জন ছিল। দলে দারুণ সব খেলোয়াড় আছেন, প্রায় প্রত্যেকটা পজিশনেই বলার মতো প্রতিভা আছে। বেলজিয়ামের মাঝমাঠটা তো এবারের বিশ্বকাপে অন্যতম শক্তিশালী। দলের প্রায় সব খেলোয়াড়ই তরুণ, দারুণ গতিতে কাউন্টার এটাকে আক্রমণে উঠতে পারেন তারা, ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতে পারেন প্রতিপক্ষের রক্ষণ। গ্রুপপর্বের ম্যাচগুলোতে সবচেয়ে বেশি গোল দিয়েছিল তারাই। গ্রুপের সেরা হয়েই উঠেছিল দ্বিতীয় রাউন্ডে।

জাপানের বিপক্ষে বেলজিয়ামের জয়টা রূপকথা হয়ে আছে এবারের বিশ্বকাপে। দুই গোলে পিছিয়ে পড়েও এভাবে ফিরে আসার দুর্দান্ত এজ নজির স্থাপন করেই হয়তো হ্যাজার্ড-ডি ব্রুইনরা তেতে ছিলেন। তাদের সেই আগুনে পুড়েছে ব্রাজিল। অথচ এই ম্যাচের আগে সেমিফাইনালে ফ্রান্সের প্রতিপক্ষ হিসেবে বেলজিয়ামকে কেউ দেখেনি, দেখেছে ল্যাটিন পরাশক্তি ব্রাজিলকে। এবারের বিশ্বকাপে দারুণ ফর্মে থাকা নেইমার-কৌতিনহোদের আটকে দিতে পারবে বেলজিয়াম, এটটা খোদ বেলজিয়ামের সমর্থকেরাও কতটা বিশ্বাস করতে পেরেছিলেন, সন্দেহ আছে। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে বিগ ম্যাচের প্রেশার নেয়ার ক্ষমতাটাই পার্থক্য গড়ে দেয় বেশিরভাগ সময়। সেখানে পিছিয়ে থাকার কথা ছিল বেলজিয়ামের।

তবে এবারের বিশ্বকাপে হিসাব-নিকাশ উল্টে দেয়ার খেলায় যে ক’টা দল মেতেছে, বেলজিয়াম তো তাদের একটা। ফলাফল, একত্রিশ মিনিটেই ব্রাজিলের জালে দু’বার বল ঢুকে গেল! কাউন্টার অ্যাটাক থেকে ডি ব্রুইনের গোলটা চোখে লেগে থাকবে অনেক দিন। এমন দুর্দান্ত শট, এত চমৎকার একটা গোল! আত্মঘাতি গোলে এগিয়ে যাওয়ার পরে ব্যবধানটা দ্বিগুণ করেই খেলার রাশটা নিজেদের দখলে নিয়েছে তারা। এই বেলজিয়াম ভয়ঙ্কর সুন্দর!

একটা মানুষের কথা না বললে ভীষণ অন্যায় হয়ে যাবে। থিবো কোর্তোয়া, চেলসিতে খেলা এই গোলরক্ষক কাল একাই হারিয়ে দিয়েছেন ব্রাজিলকে। নয়টা সেভ করেছেন একটা ম্যাচে, তাও যে ম্যাচটা কিনা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল! বারবার নেইমার-কৌতিনহো-জেসুস-উইলিয়ানদের নিরাশ করেছেন তিনি। বেলজিয়ামের জমাট ডিফেন্সও কয়েকবার টপকে গিয়েছে ব্রাজিল, কিন্ত পেরিয়ে যেতে পারেনি কোর্তোয়ার বাধা। রেনেতো অগাস্তো দারুণ এক হেডে একবার তাকে পরাস্ত করলেও, জয়ের জন্যে যথেষ্ট হতে পারেনি সেটা।

গোলবারের নীচে বিশ্বস্ত প্রহরী হয়ে ছিলেন গতকাল, কে জানে, ক্যারিয়ারের সেরা ম্যাচটাই খেলে ফেললেন কিনা! অতিমানবীয় পারফরম্যান্সে বারবার হতাশা উপহার দিয়েছেন ব্রাজিলের ফরোয়ার্ডদের। নিশ্চিত গোলের সুযোগ থেকে প্রতিপক্ষকে বঞ্চিত করেছেন একাধিকবার। কোর্তোয়া না থাকলে ম্যাচটা বেলজিয়াম জেতে না। ম্যান অব দ্যা ম্যাচের পুরস্কার ডি ব্রুইন পেয়েছেন, তবে কোর্তোয়া যেটা করেছেন গতকাল, সেটার জন্যে ম্যাচসেরার পুরস্কারটা আসলে খুব সামান্যই হয়ে যায়। রাশিয়া বিশ্বকাপে যখন নামজাদা গোলরক্ষকেরাও হাস্যকর ভুল করছেন, সেখানে বলা যায় গোলরক্ষকদের মান রাখলেন কোর্তোয়া।

এই জয়ের পর বেলজিয়ামকে শিরোপার অন্যতম দাবীদার হিসেবেই দেখবে সবাই। বিশ্বকাপ জেতার ক্যালিবার কিন্ত এই দলটার মধ্যে সত্যি সত্যি আছে। গতকালের ম্যাচটাই তার প্রমাণ। ব্রাজিল শক্ত প্রতিপক্ষ, শিরোপাপ্রত্যাশী দল, সেসব জেনেই আক্রমণের ছক সাজিয়েছিল দলটা। দুই গোলে এগিয়ে থেকে রক্ষণে মন দিয়েছে তারা, কিন্ত মাঝমাঠের দখল ছাড়েনি। জায়গামতো মজুদ ছিলেন লুকাকু আর হ্যাজার্ড, যতোবারই বল পেয়েছেন, ঝেড়ে দৌড় দিয়েছেন, কাউন্টার থেকে রচিত হয়েছে আক্রমণ। বারবার নীচে নেমে ডিফেন্ডারদের সাহায্য করেছেন ফেলাইনি-চ্যাডলি, চারজনের ডিফেন্স হুট করেই ছয়জনের হয়ে গেল কিভাবে, সেটা বুঝতেই খেই হারিয়েছেন জেসুস-কোটিনহোরা। ডি-বক্সের সামনের মানবদেয়াল ভেদ করতে পারেনি ব্রাজিল, ম্যাচটাও তাই জেতা হয়নি।

বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্মের প্রতিনিধিরা বিশ্বকাপটা জিততে পারবেন কিনা, সেটা কয়েকদিন পরেই জানা যাবে। তবে লুকাকু-হ্যাজার্ড-ডি ব্রুইনদের হাত ধরে বেলজিয়ামের ফুটবল যে স্বর্ণালী সময় পার করছে, সেটা নিয়ে সন্দেহ নেই বিন্দুমাত্র।

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close