কয়দিন আগে পিএসসি আর জেএসসি পরীক্ষার ফলাফল দিয়েছে। কাছেধারে অনেক বাচ্চা পরীক্ষা দিয়েছে। কেউ জিপিএ ফাইভ, কেউ গোল্ডেন, কেউ ফোর পয়েন্ট সামথিং। এর মধ্যে একটা ছোট সাক্ষাতকার দেখলাম এক বাচ্চার, তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, জিপিএ ফাইভ না পেলে কি হতো। সে খুব গম্ভীর মুখে বলেছে, “আমার জীবনটাই বৃথা হয়ে যেত”। আমরা যারা যারা এই ভিডিও দেখেছি, সবাই খুব হেসেছি, এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। আমি নিজেই আমার রুমমেটদের দেখিয়ে দেখিয়ে হাহা করে হেসেছি। একটু পরে ক্যাম্পাস যাওয়ার জন্য বের হলাম। ক্যাম্পাসে আজকে বন্ধুদের একটা আড্ডা আছে। আমি সেটাকে সুকৌশলে এড়িয়ে যাব, কারণ আমার হলে ফিরে আসন্ন থার্ড সেমিস্টারের সিলেবাস দেখে এখন থেকেই তা কভার দেবার প্রাণপণ লড়াই করতে হবে। হলে ফিরেই সিলেবাসের পিডিএফ ফাইল পড়তে পড়তে আমি টের পেলাম, বাচ্চাটার কথায় আমার বা আমাদের, কারোরই হাসা উচিত হয়নি। বরং ভয় পাওয়া উচিত, শংকিত হওয়া উচিত।

আমরা ইতিমধ্যে এই নবীন প্রজন্মকে রোবোটিক বানিয়ে ফেলেছি অনেকাংশেই। ঠিক কতটুকু যান্ত্রিক হলে একটা স্কুলপড়ুয়া বাচ্চা জিপিএ ফাইভকে তার জীবনের গুরুত্ব বোঝানোর মাপকাঠি বানিয়ে ফেলে? এদের প্রত্যেকের ডেইলি রুটিন আমরা জানি। এক ক্লাসের পড়া শেষ করতে না করতেই ডিসেম্বর মাসে পরের ক্লাসের বই হাজির, কোন টিচারের কাছে পড়তে হবে, কোন ব্যাচ, তা ঠিক করা সারা। শীতকালীন ছুটি বলে যে কিছু আছে, তা না আমি কোনোদিন টের পেয়েছি, না এই বাচ্চারা পায়। আমার বয়সও তো খুব বেশি না। এই কয়দিন আগে ২০ হয়েছে। আমিও এই যান্ত্রিকতার শিকার। আমারও মস্তিষ্কে তাই একটা প্রাণখোলা আড্ডার চেয়ে এখন হাই সিজিপিএ পাবার ধান্ধাটা বেশি গুরুত্ব পায়।

যেখানে উন্নত দেশগুলোতে প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষায় সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয় সোশ্যাল স্কিল বা সামাজিকীকরণের উপরে, সেখানে আমরা গুরুত্ব দিই কিভাবে ইন্ট্রোভার্টে রূপান্তর করে ঘরকুনো করা যায়। কিভাবে আকাশ না দেখতে দিয়ে, নক্ষত্র না চিনতে দিয়ে ঘরে বসিয়ে বিজ্ঞান বইয়ের মহাকাশ সংক্রান্ত চ্যাপ্টার মুখস্থ করানো যায়। বাচ্চারা এখন আর খেলার মাঠে খেলে না, হাত পা ছিলে বাসায় কাঁদতে কাঁদতে ও পাড়ার শায়ানের নামে অভিযোগ করে না, দল বেঁধে সাইকেল চালাতে গিয়ে কোনো অচিন রাস্তা, প্রাচীন বাড়ী আবিষ্কার করে না। ওদের কোনো স্মৃতি নেই, ওরা যখন বাবা-মা হবে, ওরা কখনোই তাদের সন্তানদের এই গল্পগুলো বলে জাদুর দুনিয়ার দরজা খুলে দিতে পারবে না। আমি আমার বাবার কাছে গল্প শুনেছি আগ্রহ নিয়ে, কিভাবে ঝড়ের দিনে তারা সব ভাই মিলে গাছ থেকে কাচামিঠা নামে একজাতের আম পেড়ে বাড়ি বোঝাই করে ফেলত, কিভাবে মাছ ধরতে যেয়ে হাত থেকে ছপাত শব্দ করে মাছ পড়ে যেত, কিভাবে স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সেরা খেলোয়াড় প্রাইজটা সবসময় আমার বাবার থাকত। আমি আমার মা’র কাছে রবীন্দ্রনাথের জোড়াসাঁকোর গল্প শুনেছি, এরপর প্রবল আগ্রহ নিয়ে এ সংক্রান্ত সব বই পড়েছি। কিছুদিন আগে যখন জোড়াসাঁকো গিয়েছিলাম, একটু পর পর শিহরণের চোটে ঠাকুরবাড়ির উঠানে বসে পড়ছিলাম, কারণ আমি আমার কল্পনায় থাকা বাড়ির সাথে এই বাড়িকে রিলেট করতে পারছিলাম। এই বাচ্চারা কোনোদিন মাথাভর্তি রবীন্দ্রনাথের জোড়াসাঁকো নিয়ে চিন্তা রাখবেনা, তারা মাথাভর্তি করে রাখবে যে স্কুল টিউটোরিয়ালে সাবিহার চেয়ে বেশি নাম্বার পেতে হবে, পরীক্ষার হলে বাই হুক অর ক্রুক, আমাকে অন্যকে ভুল বলে দিয়ে নিজে ঠিকটা লিখতে হবে।

এই ঘোড়দৌড় করতে করতে আমরা একসময় বড় হই। এই চৌদ্দ পনেরটা পাব্লিক পরীক্ষা দিতে দিতে আমরা নিজেদের মর্যাদা, সক্ষমতা সবকিছুকে একটা জিপিএ ফাইভ, বা গোল্ডেন বা লোহা বা তামা’র সাথে বেঁধে ফেলি। এরপর আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিই। সেখানে প্রশ্ন ফাঁস করি। সগৌরবে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ করি। এরপর বিসিএস দিই, ব্যাংক জব দিই। সেখানেও প্রশ্ন ফাঁস করি। প্রশ্ন ফাঁস আমাদের কাছে নতুন কিছু না। কারণ আমরা ছোট্টবেলা থেকেই বেড়ে ওঠার ডোজ রোজ রোজ হরলিক্সের পাশাপাশি এই প্রশ্ন ফাঁস দেখে থাকি, ঘোড়দৌড়ে এগিয়ে থাকতে এই প্রশ্ন নিয়ে পরীক্ষাও দিয়ে থাকি।

একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, পাব্লিক সার্ভিসে যারা যারা গিয়েছেন, তাদের মধ্যে সিংহভাগ কর্মকর্তার ইংরেজিজ্ঞান খুবই নগণ্য, তারা বিভিন্ন সোশ্যালাইজিং প্রোগ্রাম ঠিকমত সামাল দিতে পারেন না, ডেলিগেশনে গেলে তাদের সবচেয়ে বেশি সোশ্যালি অকওয়ার্ড বলা হয়। এতে তো তাদের দোষ দেবার কিছু নেই। তারা তো একদফাতেই এরকম হননি। বিন্দু বিন্দু জল এক হয়ে এই মহাসমুদ্র হয়েছে। আমরা একটু পেছনে গেলেই বুঝব, কেন এমন হচ্ছে।

শেষমেশ যদি এই দশাই হয়, তাহলে এই প্রশ্ন আমার মাথায় ঘোরে, এত গোল্ডেন লইয়া আমরা কি করিব?

আরও পড়ুন- একটি বিজ্ঞপ্তি: একজন সাহসী মানুষ প্রয়োজন!

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-