খেলা ও ধুলারাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮

এবার ‘গোল্ডেন বল’ জিতবেন কে?

রাশিয়া বিশ্বকাপ ২০১৮ এর একদম শেষ প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছি আমরা। ইতিমধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে ৬২টি ম্যাচ, এবং একে একে বিশ্বসেরার লড়াই থেকে ছিটকে পড়েছে ৩০টি দল। টিকে আছে কেবল ১৯৯৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স এবং ওই একই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট ক্রোয়েশিয়া। এই দুই দলের মধ্যে কারা হাসবে শেষ হাসি, তা জানা যাবে ১৫ জুলাই মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিতব্য ফাইনালের পর।

তবে বিশ্বকাপ কি শুধু বিশ্বসেরা দল নির্ণয়ের আসর? মোটেই না। দলীয় সাফল্যের পাশাপাশি এই প্রতিযোগিতা থেকে অর্জিত ব্যক্তিগত সম্মাননার মূল্যও অপরিসীম। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় কে হবেন, অর্থাৎ কার হাতে উঠবে গোল্ডেন বল, এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে এখন সবার মনেই। প্রতি বিশ্বকাপ শেষেই ফিফা সেরা খেলোয়াড়দের একটি শর্ট-লিস্ট প্রণয়ন করে, যেখান থেকে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা তাদের ভোটের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড়কে নির্ধারণ করে থাকেন।

চলুন এক নজরে দেখে আসি গত পাঁচ বিশ্বকাপে গোল্ডেন বল জিতেছিলেন কোন কোন খেলোয়াড়:

২০১৪ – লিওনেল মেসি
২০১০ – ডিয়েগো ফোরলান
২০০৬ – জিনেদিন জিদান
২০০২ – অলিভার কান
১৯৯৮ – রোনালদো

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, গোল্ডেন বল জেতার জন্য দলকে বিশ্বকাপ জেতানো কিন্তু মোটেই জরুরি নয়। উপরের তালিকায় যে পাঁচজন খেলোয়াড়ের নাম রয়েছে, তারা কেউই বিশ্বজয়ী দলের সদস্য হিসেবে গোল্ডেন বল জেতেননি। মেসি, জিদান, কান ও রোনাল্ডো যখন গোল্ডেন বল জিতেছেন, তখন তাদের দল স্রেফ বিশ্বকাপের রানার্স-আপই হতে পেরেছে। আর ফোরলানের ক্ষেত্রে তো ফাইনাল অব্দিও যাওয়া লাগেনি। ২০১০ সালে উরুগুয়েকে তৃতীয় করেছিলেন তিনি, আর তাতেই জিতে নিয়েছিলেন আসরের সেরা খেলোয়াড়ের খেতাব।

পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটার মূল উদ্দেশ্য হলো আপনাদের সামনে এই বিষয়টি তুলে ধরা যে গোল্ডেন বল জেতার ক্ষেত্রে যেহেতু বিশ্বজয়ী দলের সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়, কেননা এটি নিছকই একটি ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের সম্মাননা, তাই এবারের আসরে কে হবেন সেরা খেলোয়াড় তা অনুমান করার জন্যও আমাদের ফ্রান্স-ক্রোয়েশিয়া ফাইনাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার কোনো প্রয়োজন নেই। সেমিফাইনাল পর্যন্ত সকল খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করেই আমরা মোটামুটি ধারণা করে নিতে পারি যে কোন খেলোয়াড়েরা এগিয়ে থাকবেন এবারের বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল জয়ের রেসে।

তাহলে পাঠক, চলুন দেখে নিই ২০১৮ বিশ্বকাপের সম্ভাব্য গোল্ডেন বল জয়ীদের তালিকায় থাকবেন কারা…

এডেন হ্যাজার্ড (বেলজিয়াম)

টুর্নামেন্ট শুরুর আগে যে দলটিকে নিছকই ডার্ক হর্স বলে মনে হচ্ছিল, তাদেরকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে আসতে এই চেলসি ফরওয়ার্ড রেখেছেন দারুণ ভূমিকা। নিজে গোল করেছেন দুইটি, আর অ্যাসিস্টও করেছেন দুইটি। এবারের বিশ্বকাপে তারচেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট করতে পারেননি আর কোনো খেলোয়াড়ই। আর তার চেয়ে বেশি ড্রিবলও সম্পন্ন করেছেন মাত্র দুইজন খেলোয়াড় – আর্জেন্টিনার মেসি আর স্পেনের ইস্কো। তবে ব্রাজিলের বিপক্ষে তার ১০টি ড্রিবলের চেষ্টা করে ১০টিতেই সফল হওয়া রীতিমত একটি রেকর্ড। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের পর আর কোনো বিশ্বকাপে কোনো খেলোয়াড় এক ম্যাচে শতভাগ ড্রিবল সফলতার দেখা পাননি।

নেইমার (ব্রাজিল)

এবারের বিশ্বকাপটি হয়ত ঠিক আশানুরূপ কাটেনি নেইমারের জন্য। ভুল কারণে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন বারবার। তার দলও কোয়ার্টার ফাইনালের চৌকাঠ পেরোতে পারেনি। তবে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স দিয়ে নেইমার বেশ নজর কেড়েছেন। লম্বা সময় ইনজুরির কারণে মাঠের বাইরে থাকা বিশ্বের সবচেয়ে দামি এই খেলোয়াড় গোল করেছেন দুইটি, এবং অ্যাসিস্ট করেছেন একটি। পাশাপাশি তিনিই হলেন সেই খেলোয়াড় যিনি একাধারে গোলে শট নিয়েছেন সবচেয়ে বেশি, কী-পাস সম্পন্ন করেছেন সবচেয়ে বেশি, আর ফাউলের শিকারও হয়েছেন সবচেয়ে বেশি।

ব্রাজিল, সার্বিয়া, বিশ্বকাপ ফুটবল, থিয়াগো সিলভা

কেভিন ডি ব্রুয়েন (বেলজিয়াম)

গত মৌসুমে পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটির মেইন ম্যান ডি ব্রুয়েন বেলজিয়ামের বিশ্বকাপ সাফল্যেরও অন্যতম প্রাণভোমরা ছিলেন। তিনি একটি গোল করেছেন, আর একটি অ্যাসিস্টও করেছেন। কিন্তু শুধু পরিসংখ্যানের মাধ্যমে রেড ডেভিল দলে তার অনবদ্য প্রভাবের কিয়দাংশও বোঝানো সম্ভব হবে না। নেইমারের পর এবারের আসরে সবচেয়ে বেশি কী-পাস এসেছে তার পা থেকেই। আর কোয়ার্টার ফাইনালে তার জয়সূচক গোলের পাশাপাশি গোটা ম্যাচ জুড়ে অনবদ্য ফুটবলশৈলীর কারণেই ব্রাজিলের বিপক্ষে অবিস্মরণীয় এক জয় পায় রবার্তো মার্তিনেজের শিষ্যরা।

লুকা মড্রিচ (ক্রোয়েশিয়া)

এই খেলোয়াড়টি সম্পর্কে যাই বলি না কেন, কম হয়ে যাবে। ক্রোয়েশিয়ার মত একটি দল, যাদেরকে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে গণনায়ই ধরেনি বেশিরভাগ লোক, তারাই যে শেষ পর্যন্ত ফাইনালে উঠে যাবে, কে ভাবতে পেরেছিল! কিন্তু বাস্তবে হয়েছে সেটিই। আর সেজন্য ক্রোয়েটরা সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ রিয়াল মাদ্রিদের মাঝমাঠের সেনানী মড্রিচের কাছেই। দুইটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট রয়েছে তার নামের পাশে। বিশেষত আর্জেন্টিনাকে ৩-০ গোলে হারানোর ম্যাচে তার অসাধারণ গোলটির কথা দীর্ঘদিন মনে রাখবে ফুটবল বিশ্ব।

মড্রিচ, ক্রোয়েশিয়া মড্রিচ

ডেনমার্কের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের খেলায় পেনাল্টি মিস করেছিলেন তিনি, কিন্তু পরপর দুই ম্যাচে পেনাল্টি শ্যুট আউটে ঠিকই লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হন। অন্য যে কারও চেয়ে এবারের বিশ্বকাপে তার গোল্ডেন বল জয়ের সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। যেটুকু যা সংশয় রয়েছে, তা-ও নিশ্চিতভাবেই দূর হয়ে যাবে, যদি ফাইনালে ফরাসিদের হারিয়ে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ জিতে নেয় বলকান রাষ্ট্রটি।

কিলিয়ান এমবাপে (ফ্রান্স)

বেশ অনেকদিন ধরেই তাকে মনে করা হচ্ছিল ফুটবলের পরবর্তী ফেনোমেনো। কেন তাকে রোনাল্ডো ডি লিমার সাথে তুলনা করা হয়, তা তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন রাউন্ড অফ সিক্সটিনে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অতিমানবীয় খেলার মাধ্যমে। মাত্র ১৯ বছর বয়সী এই খেলোয়াড় পেরুর বিপক্ষে বল জালে জড়িয়ে পরিণত হন ফ্রান্সের সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ গোলদাতায়।

দিদিয়ের দেশম, ফ্রান্স, বিশ্বকাপ ফাইনাল, ২০১৮ বিশ্বকাপ

আর আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একটি অ্যাসিস্ট, একটি পেনাল্টি আদায়ের পাশাপাশি নিজেও দুইটি গোল করার মাধ্যমে বিশ্বকাপে টিনেজার হিসেবে একই ম্যাচে জোড়া গোলের মালিক হয়ে তিনি ছুঁয়ে ফেলেন ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তী পেলেকে। পরের দুই ম্যাচে নিজের সামর্থ্যের তুলনায় কিছুটা নিষ্প্রভই মনে হয়েছে তাকে। কিন্তু কে জানে, হয়ত ফাইনালের জন্য নিজের সেরাটা তুলে রেখেছেন তিনি!

আঁতোয়ান গ্রিজম্যান (ফ্রান্স)

ফ্রান্সকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তোলায় সবচেয়ে বড় অবদান গ্রিজম্যানেরই। দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। জ্বলে উঠছেন সঠিক সময়ে। তিনটি নক আউট ম্যাচের দুইটিতে গোল এসেছে তার পা থেকে। কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা, অভিজ্ঞতার অভাবে প্রায়সই খেই হারিয়ে ফেলা ফরাসি আক্রমণভাগকে এক সুতোয় গেঁথে রেখেছেন তিনি। সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত তিনটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি। ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মত দলকে বিশ্বকাপ জেতাতে হলে তাকে এমন ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে মস্কোর ফাইনালেও।

রোমেলো লুকাকু (বেলজিয়াম)

চার গোল করে গোল্ডেন বুট জয়ের রেসে বেশ ভালোভাবেই ছিলেন তিনি। কিন্তু সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে হারের মাধ্যমে তার দল যেমন বাদ পড়েছে বিশ্বকাপ থেকে, তেমনি তিনিও ছিটকে পড়েছেন শীর্ষ গোলদাতার রেস থেকে। কিন্তু আমরা এমন এক লুকাকুর কথা বলছি যাকে এখন কেবল গোলের সংখ্যা দ্বারাই সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয়। এই বিশ্বকাপে দেখা মিলেছে এক নিঃস্বার্থ, অলরাউন্ডার লুকাকুর যিনি একটি অ্যাসিস্টই শুধু করেননি, পাশাপাশি নিজের অর্ধ থেকে বল টেনে নিয়ে যাওয়া কিংবা মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগকে নিজের অসম্ভব গতি ও শারীরিক শক্তি দিয়ে শাসন করার ক্ষেত্রেও সাফল্যের দেখা পেয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে নিজেকে হারিয়ে খুঁজেছেন তিনি। আর তাই তার দলও পায়নি কোনো গোলের দেখা।

রোমেলো লুকাকু, রিও ফার্ডিন্যান্ড, বেলজিয়াম, বিশ্বকাপ ফুটবল

জর্ডান পিকফোর্ড (ইংল্যান্ড)

গোলরক্ষক হলেই যে গোল্ডেন বল জেতা যাবে না, সন্তুষ্ট থাকতে হবে কেবল গোল্ডেন গ্লাভস জিতেই, এমন নিয়ম কিন্তু কোথাও লেখা নেই। ২০০২ বিশ্বকাপেই যেমন জার্মানির অলিভার কান হয়েছিলেন আসরের সেরা খেলোয়াড়। সেই সম্মাননা এবার জুটতে পারে পিকফোর্ডের কপালেও। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একেবারেই অনভিজ্ঞ ও ক্লাব ফুটবলেও শীর্ষস্থানীয় লিগে খেলছেন যিনি মাত্র দুই বছর, এবং বিশ্বকাপের আগে যিনি গ্যারেথ সাউথগেটের দলের নাম্বার ওয়ান হিসেবেও নিশ্চিত ছিলেন না, সেই তিনিই রাউন্ড অফ সিক্সটিনে পেনাল্টি শ্যুট আউটের নায়ক ছিলেন। প্রথমবারের মত দলকে বিশ্বকাপে পেনাল্টি শ্যুট আউটে জিতিয়েছেন। সুইডেনের বিপক্ষে তিনটি অসাধারণ সেভের মাধ্যমে হয়েছেন ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ গোলরক্ষক হিসেবে ক্লিন শিটের মালিক। তবে সেমিফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে যে দুইটি গোল হজম করেছেন, তার মধ্যে মারিও মানজুকিচের গোলটি ঠেকানো সম্ভব ছিল তার পক্ষে। আর তাহলে হয়ত ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ ছাড়াই বাড়ি ফিরতে হতো না।

ফিলিপে কৌতিনহো (ব্রাজিল)

বরাবরের মত বিশ্বকাপেও নেইমারের ছায়ায় ঢাকা পড়েছিলেন কৌতিনহো। কিন্তু দলের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার না হতে পারলে কী হয়েছে! দলের সেরা খেলোয়াড় কিন্তু ছিলেন তিনিই। রাশিয়ায় যখনই দল বিপদে পড়েছে, বার্সেলোনার এই খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন ত্রাণকর্তা।

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে বক্সের প্রান্তদেশ থেকে তার ট্রেডমার্ক শটে গোল কিংবা কোস্টারিকার বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ের গোল- এগুলো গোটা টুর্নামেন্টেরই অন্যতম হাইলাইটস হয়ে থাকবে। এছাড়া দুইটি অ্যাসিস্টও করেছেন তিনি, যা এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপের যুগ্ম সর্বোচ্চ। কিন্তু তারপরও তাকে নিয়ে ব্রাজিল সমর্থকদের মনে আফসোস থেকেই যাবে, বেলজিয়ামের বিপক্ষে সহজ সুযোগটি যদি মিস না করতেন!

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close