রকমারিরিডিং রুম

গগন হরকরা – যার গানের সুর থেকে জন্মেছিল আমাদের জাতীয় সংগীত!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন জমিদার পুত্র। বংশধারায় একটা সময় জমিদারির দায়িত্ব কিছু কিছু তাকেও নিতে হয়েছে। জমিদারি আমলে তিনি দেখা পান অনেক রকম মানুষের। এই জীবন্ত চরিত্রগুলো সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের অনেক কাজেই প্রভাব রেখেছে।

একটি বিশেষ চরিত্রের কথা না বললেই নয়, যার সাথে বাংলাদেশের একটি বিশেষ আবেগের অদ্ভুত যোগসূত্র আছে। ইতিহাস হয়ত সেই বিশেষ চরিত্রকে মনেও রাখবে না, রবীন্দ্রনাথই বরং দিন দিন আরো হয়ত উজ্জ্বল হবেন, আমাদের দৈনন্দিন প্রাসঙ্গিকতায় তার গল্প, গান ফিরে ফিরে আসবে, তবুও সেই বিশেষ চরিত্রকে স্বীকৃতি না দিলে একটা দায় থেকে যায়, দায়টা কার কাছে সে প্রশ্ন অবশ্য তর্কসাপেক্ষ।

মানুষটির নাম গগন চন্দ্র দাম। হতদরিদ্র এই মানুষটি ছিলেন শিলাইদহ ডাকঘরের পিয়ন। তাই তাকে বলা হতো হরকরা। কাজ হচ্ছে চিঠিপত্র বিলি করা, পেটের দায়ে কাজ। মনের দায়ে করতেন গান। অদ্ভুত সুন্দর সহজিয়া সুর ছিলো তার। নিজে নিজেই গান রচনা করতেন।

লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার বিখ্যাত টাইম ট্রিলজির দ্বিতীয় উপন্যাস ‘প্রথম-আলো’ তে লিখেছেন,

“রবীন্দ্র সবচেয়ে অবাক হয়েছিলো শিলাইদহ পোষ্টঅফিসে এক পিয়নকে দেখে। চিঠির থলে পিঠে নিয়ে যাবার সময় সে আপন মনে গান করে। একদিন বজরার ছাদে বসে তার সেই গান শুনে রবীন্দ্র নিজেই তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলো। লোকে বলে, ওর নাম গগন হরকরা, রবীন্দ্রের কাছে সে নিজে অবশ্য বললো,তার নাম গগনচন্দ্র দাম। সাধারণ এক অশিক্ষিত মানুষ, সে নিজে গান করে, নিজেই সুর দেয়। কি গভীর উপলব্ধির কথা সে সব গানের।

আমার মনের মানুষ যে রে, আমি কোথায় পাবো তারে
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে বিদেশে বেড়াই ঘুরে
কোথায় পাবো তারে…”

গগন হরকরার ব্যাপারে খুব বেশি তথ্য পাওয়া যায় না। ইতিহাস একজন জমিদার পুত্রকে হয়ত মনে রাখতে পারে, কিন্তু গ্রামের অখ্যাত, অচেনা দরিদ্র বাউলকে মনে রাখবে কেনো? গগন হরকরা আনুমানিক ১৮৪০ সালের আশেপাশের কোনো একসময়ে জন্মেছিলেন কুষ্টিয়ায়। গ্রামের সারল্য, মায়া, রুপ, ভালবাসার সন্ধান, প্রকৃতি সব কিছুর মিশেলে গগন হরকরা গান বানাতেন, বাউল দর্শন থাকতো তার গানে।

জমিদার রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহতে জমিদারি কার্য পরিচালনা করতে গিয়ে এই গাতককে আবিষ্কার করেন। তিনি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেন গগন হরকরার গান। এসময় গগন হরকারের সাথে তার একটি অসম যোগাযোগ হয়। রবীন্দ্রনাথ গগন হরকরাকে ডেকে আনেন, জমিদারের কথা মতো গগন হরকরা এসে গানের ঝুলি খুলে বসেন। ‘আমি কোথায় পাবো তারে, আমার মনের মানুষ যে রে..’ গানটির সুর রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করে। এই গানটির সুর অবিকল তিনি ব্যবহার করেন।

১৯০৫ সাল। ভাইসরয় লর্ড কার্জন বাংলাকে বিভক্ত করতে ‘বঙ্গভঙ্গ’ আদেশ প্রণয়ন করলেন। এই আদেশ আলোড়ন তুললো সারা বাংলায়। তখন যে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছিলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন গানটি, তবে গগন হরকরার গানের সুরে।

“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস,
আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি..”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মন্ত্রশিষ্য এবং ছায়া সঙ্গী শান্তিদেব ঘোষ লিখেছেন যে, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি” এই গানটি তিনি (কবিগুরু) রচনা করেছেন গগন হরকরার উপরের গানটির সঙ্গে মিলিয়ে। (উৎস – শান্তিদেব ঘোষ, রবীন্দ্র সঙ্গীত, পৃষ্ঠা – ১৩০)

রবীন্দনাথকে সকলেই চিনতো, কেউ চিনতো না গগন হরকরাকে। তাই এই গানের সুরস্রস্টা কে সেটা নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়নি তখনো। রবীন্দ্রনাথও সুরটি ব্যবহার করবেন বলে গগন হরকরার কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছেন সেই প্রমাণ কোথাও নেই। সেই সময় সামাজিক অবস্থানের বিচার করলেই ব্যাপারটা বোঝা যায়। ওই সময়ে একজন অচেনা অখ্যাত দরিদ্র গগন হরকরার গানের সুর কোনো জমিদার ব্যবহার করলে তা নিয়ে কথা বলার কে আছে?

রবীন্দ্রনাথের জমিদারি জীবন, তার সাহিত্য সব কিছু নিয়ে বিস্তর কথা আছে। অনেক চালু গল্প আছে। এমন গল্পও চালু আছে, রবীন্দ্রনাথ নাকি গগন হরকরাকে নিষেধ করেছিলেন এই গানটি তার কুঠিবাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় যেনো না গায়। হয়ত এই গল্প সত্য নয় তবে এটা সত্য রবীন্দ্রনাথ ‘আমার সোনার বাংলা..’ গানের সুর অবিকল অন্য কোনো গান থেকে নিয়েছেন সেটা তো বলেন নি।

১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকার পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদের জনসভায় আমার সোনার বাংলাকে জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে এই গান প্রথম জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গাওয়া হয়। অসাধারণ সুন্দর সুরের এই গানের কথা আসলে রবীন্দ্রনাথের অসীম মেধার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জাগে। প্রতিটি লাইনে আমরা আবেগে আপ্লুত হই, যতবারই শুনি, মন ভরে না। সত্যিই গানটা অসাধারণ। আমরা গর্ব করি, আমাদের জাতীয় সঙ্গীত এতোটা অসাধারণ!

কতটা অসাধারণ তার একটা উদাহরণ দেয়া যায়। ২০০৬ সালের বেইজিং অলম্পিকে অংশ নেয়া ২০৫টি দেশের জাতীয় সঙ্গীতের মাঝে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ২য় স্থান লাভ করে। বিবিসির স্রোতা জরিপে এই গান জনপ্রিয় ২০ টি গানের মাঝে শ্রেষ্ঠ গান হিসাবে ঘোষণা করা হয়।

গানটির শ্রেষ্ঠতার সাথে রবীন্দ্রনাথের নাম যেনো আরো জ্বলজ্বল করে একই সাথে যেনো নিভে যায় গগন হরকরার নাম। এই আর্টিকেল পড়ে যতজন নতুন করে জানবেন গগন হরকরার নাম, তাদের মাধ্যমেই হয়ত আরো কিছু মানুষের মাঝে ঠাই পাবে একজন অখ্যাত গগন হরকরা, যার সুরে হয়েছে আমার বাংলাদেশের গান- আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি…

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close