ঝাড়খণ্ডের ধনবাদ থেকে ইতালির সিসিলির দূরত্ব কতো? কয়লাকালো ওয়াসিপুর আর শান্ত-সৌম্য কর্লিওনিতে কি এক রাস্তা দিয়েই যেতে হয়? সর্দার খানের সাথে কি কখনো দেখা হয়েছিল ভিটো কর্লিওনির? সনি আর দানিশের রগচটা মেজাজে কি তারা বিরক্ত হয়েছিল? ফায়জাল খান আর মাইকেল কি ছোটবেলায় একসাথে খেলেছিল? সব প্রশ্নই কাল্পনিক, চরিত্রগুলোও তাই। গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরের লেখক জিশান কাদরী গডফাদারের স্রষ্টা মারিও পুজোকে পাঠ করেই থাকবেন হয়তো। অনুরাগ কশ্যপও যে ফ্র্যান্সিস ফোর্ড কাপোলার কাজ দেখেন নি এমনটাও না। সর্বকালের অন্যতম সেরা সিনেমা হিসেবে স্বীকৃত গডফাদার ইনফ্লুয়েন্স করে আসছে ফিল্মমেকারদের যুগ যুগ ধরেই। অনেকেই চেষ্টা করেছেন মাফিয়া ফিল্ম বানাতে, ভিটো আর মাইকেলের সমমানের কাউকে সামনে এনে দাঁড় করাতে কিন্তু ব্যর্থ হয়েছেন প্রতিবারই। কিন্তু একজন পেরেছেন কিছু একটা করতে। গডফাদার মুক্তির ঠিক ৪০ বছর পর একটা মাস্টারপিস বানিয়েছেন যা পূর্ববর্তী সিনেমাকে আরও গৌরবোজ্জ্বল করে তুলেছে। গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর- ৫ ঘণ্টার এই ভায়োলেন্ট ওপাস কোনভাবেই গডফাদারের রিমেক নয়, বরং সিনেমা কৌশলে-চরিত্র চিত্রনে- ক্ষমতার উত্তরাধিকারে ও হিংস্রতায় একে অপরকে কমপ্লিমেন্ট করেছে। সেই কমপ্লিমেন্ট, সেই মিল-অমিল আর কন্টেক্সটের দ্বৈততা নিয়েই আলোচনা করবো আজ।

গডফাদার সিনেমাটি মুক্তি পায় ১৯৭২ সালে, ঠিক সে বছরই ভারতের উত্তর প্রদেশের গোরাখপুরে জন্ম হয় অনুরাগ কশ্যপের। অল্প বয়স থেকেই থিয়েটারে আগ্রহী অনুরাগ মুম্বাই আসেন স্বপ্নপূরণ করতে। মুম্বাইয়ের খোলা বীচে শুয়ে কাটিয়ে দিনাতিপাত করতেও সে পিছপা হয়নি স্বপ্ন থেকে, স্ট্রিট থিয়েটার করা শুরু করে। সুযোগ পেয়েও যায় টেলিভিশনে কাজ করার। সেখান থেকেই মনোজ বাজপায়ির অনুরোধে রাম গোপাল ভার্মার সাথে কাজ করার সুযোগ। (ভার্মার ‘সত্য’ সিনেমার পরে যাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি?) ব্র্যাকেট কেটে লেখা লাইনটা লেখার কারণ আর দশটা জীবনী পড়তে গেলে সফলতার গল্প শুনতে শেষে গিয়ে এমন একটা লাইনই পড়তে হয় সবার। কিন্তু অনুরাগ আসলে কখনোই সফলতার চাদরে মোড়া ছিলেন না, তাকে বারবার পেছনে ফিরে তাকাতে হয়েছে। বারবার তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে বাস্তবতা যে একজন স্বাপ্নিক নির্দেশক চাইলেই সিনেমা নিয়ে তাঁর স্বপ্ন বাস্তব করে ফেলতে পারে না। দীর্ঘ সময় ধরে তাকে স্ট্রাগল করতে হয়েছে তাঁর ঘরানার সিনেমা দর্শককে দেখানোর জন্য। ব্ল্যাক ফ্রাইডে, নো স্মোকিং, পাঁচ, সকল ধরণের কাজেই বাঁধা পেয়ে এসেছেন অনুরাগ। তাই ড্রিম প্রজেক্ট যখন দানা বাঁধা শুরু করে মনে, জিশান কাদরীর ওয়াসিপুর কেন্দ্রিক মাফিয়া গল্প পড়ে যে উত্তেজনা অনুভব করেন অনুরাগ তা নিয়ন্ত্রন করার ক্ষমতাও তখন তাঁর চলে এসেছিল। জিশানের সে গল্প ছিল ওয়াসিপুরের, যুগ যুগ ধরে চলে আসা- প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে আসা প্রতিশোধ আর হিংস্রতার। কয়লার চমক ছিল তাতে, ছিল কসাইপট্টির নির্মমতা, বলিউডের উত্থানপর্ব ছিল সাথে ছিল রাজনীতির অস্থিরতা। আর এই সবকিছুকে ঘিরে ছিল খান পরিবার- শাহিদ খান, সরদার খান, দানিশ খান আর ফায়জাল খান। অনুরাগের চরিত্রগুলোর উল্লম্ফনধর্মীতায় যেখানে স্ট্যাবলিশ হয় কেবল সরদার খান আর ফায়জাল খানই। ঠিক এই পর্যায়ে এসে চলুন গডফাদারে ফিরে যাওয়া যাক। মারিও পুজোর লেখা গডফাদারেও দুটো চরিত্রই যেন আবেশিত করে রাখে পুরো ভায়োলেন্স ড্রামাকে। ভিটো আর মাইকেল কর্লিওনি। কর্লিওনি পরিবারের হাত ধরে এখানেও আমরা দেখি প্রজন্মান্তরে বয়ে আসা প্রতিশোধের গল্প, ক্ষমতা আর অভিবাসনের গল্প। হলিউডি সিনেমার জাঁকজমক আর তার উল্টোপিঠে থাকা রক্তাক্ত গল্প। গডফাদার ট্রিলজি ও ওয়াসিপুর ডুয়োলজিকে আলাদা আলাদাভাবে একক সিনেমা ধরেই বাকি আলাপ চলুক।

দৃশ্যায়ন ও গল্পবয়ন– গডফাদারের প্রথম দৃশ্য…কনি কর্লিওনির বিয়ের উৎসব বাইরে আর অন্যদিকে আধো অন্ধকারে বোনাসেরা গডফাদারের কাছে আর্জি পেশ করছে। একইসাথে কালো আর আলো, কল্পনা আর বাস্তবতার সংঘাত স্পষ্ট। ঠিক একইভাবে গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরে দেখি জনপ্রিয় ডেইলি সোপের ইন্ট্রো চলছে বাড়িগুলোতে আর গাড়িতে করে এলাকায় প্রবেশ করে অস্ত্রধারীরা। একদিকে আলোর কল্পনায় বসত তো অন্যদিকে ভয়াবহ বাস্তবতা অপেক্ষায় আছে কালো হাত দিয়ে সব ভেঙ্গেচুড়ে দিতে। দুটো সিনেমার দুটো সূচনাই কিন্তু মূল গল্পের মধ্যভাগের বা এর পরের অংশ। এরকম একটা দৃশ্য দিয়ে শুরু করার সুবিধা আছে বেশকিছু। ডিরেক্টরের ন্যারেশন স্টাইলে পরিবর্তন এসে যায় শুরুতেই, ফলে একরৈখিক গল্পে ভিন্নতা আসে। আর এই ভিন্নতা দুজন নির্দেশকই ব্যবহার করেছেন দুইরকমভাবে। অনুরাগ ওয়াসিপুরে যখন ফ্ল্যাশব্যাকের টাইমলাইনে গিয়েছেন তখন সেখানেই থেকে গিয়েছেন আর ফেরত আসেন নি দ্বিতীয় ভাগ পর্যন্ত, অন্যদিকে ফ্র্যান্স কাপোলা দুই টাইমলাইনই ব্যবহার করেছেন। মাইকেলের গডফাদার হয়ে ওঠার পাশাপাশি ভিটোর অভিবাসন পরবর্তী গডফাদার হয়ে ওঠাকেও একইসাথে দেখিয়েছেন। আর ওয়াসিপুরে ফায়জালের টাইমলাইন শুরুতে এসেই চলে গেছে, শাহীদ খান হয়ে সরদার খান এসেছে তারপর গিয়ে ফায়জালের আগমন। এই ভিন্নধর্মী ট্রিটমেন্ট সম্ভব হয়েছেই প্রথম সিনকে একদম গল্পের মধ্যভাগ থেকে কেটে নেয়ায়। গল্প ঘুরে ফিরে এক বিন্দুতে গিয়ে মিলে যায় সব কিন্তু উপস্থাপনাই মূলত গল্পকে নতুনত্ব দেয় আর সে নতুনত্ব গডফাদারও যেমন দিয়েছে তেমনি গ্যাংস অফ ওয়াসিপুরও।

অভিবাসন– গডফাদারে আমরা যে মাফিয়া ফ্যামিলি পাই তারা মূলত অভিবাসনের মাধ্যমে আমেরিকায় এসেছিল। সিসিলির কর্লিওনি থেকে আসা ভিটো আন্দোলিনিকে ইমিগ্রেশন অফিসার যে ভিটো কর্লিওনি নাম দিয়ে দেয় সে নামই যেন নতুন পরিচয় এনে দেয় ভিটোকে। ওয়াসিপুরেও আমরা শাহীদ খানের পরিবারের দেখা পাই। প্রথমে সুলতানা ডাকু ও পরে রামাধির সিং এর তাড়া খেয়ে অভিবাসিত হয়ে আসে ওয়াসিপুরে। একে এস্কেপিজমের অন্য একটা ধারাই বলা যায় যেখানে বাস্তবতা সুইটেবল না হওয়ায় কাল্পনিক সুখের খোঁজে চলে যায় মানুষ। কিন্তু দুটো ক্ষেত্রেই যে রক্তাক্ত ইতিহাস পেছনে ফেলে আসতে হয়, আর বাস্তবতার বুক কেটে নেয়া রক্তের দাগ কখনো শুকোয় না। তাই তো সেই দাগ ধরে কার্মা ফিরে আসে বারবার, যা নেবার নিয়ে যায় সাথে করে।

চরিত্রায়ন– আমরা চাইলেই শাহীদ খানের মাঝে ভিটোকে দেখতে পারি কিন্তু সর্দার খানের মাঝে ভিটোকে পাওয়া যায় আরও বেশি করে। ভিটোর অটল আত্মবিশ্বাস আর দুঃসাহস সর্দার খানেরও ছিল। সর্দার খান জানতো যে তাকে বড় হতে হবে তা নাহলে সে ক্ষমতা হস্তগত করতে পারবে না আর ক্ষমতাই সকল শক্তির উৎস। ভিটোও সেইম ফিলোসফি নিয়েই আমেরিকা এসেছিল, তাঁর মাঝে বড় হবার ইচ্ছা এতোই প্রবল ছিল যে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতেও সে দ্বিধা করে নি। আমরা ভিটোকে কম্বল মোড়ানো পিস্তল হাতে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে দেখি, সর্দার খানকে চাপাতি হাতে ক্ষমতা টুকরো টুকরো করে কুড়িয়ে নিতে দেখি। এই গ্রুসম ভায়োলেন্স কখনো মাইকেলের ক্ষেত্রে বা ফায়জালের ক্ষেত্রে দেখা যায় না কারণ ক্ষমতা নেয়ার জন্য যে ভায়োলেন্স ক্রিয়েট করতে হয় তা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য করা লাগে না। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বা প্রতিশোধ নিতে যে ভায়োলেন্স তা আরও বেশি স্টাইলাইজ করে প্রকাশ করতে হয়। ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ার মতো নির্মম তাকে না হলেও চলে। ক্ষমতা টেকানোর ভায়োলেন্স কখনো কখনো কমিক্যালও হয়ে ওঠে। মাইকেল আর ফায়জালের প্রসঙ্গ যেহেতু চলেই আসলো সেহেতু তাদের মেলানো যাক। মাইকেল আর ফায়জাল দুজনকেই প্রথম দেখায় ফ্যামিলি গ্যাং ওয়ারে একটুও ইন্টারেস্টেড বলে মনে হয় না। মাইকেল ওয়ার হিরো, প্রেয়সীকে নিয়ে মিষ্টিমধুর দিন কাটাতে ব্যস্ত আর ফায়জাল সিনেমাফ্রিক, নারীসঙ্গের ফ্যান্টাসিতেই যার দিন কেটে যায়। দুজনকেই প্রথমে গল্প থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়, এই ট্রিটমেন্টের কারণ একটাই যে তারা যখন গল্পের লুপে ঢুকে যাবে তখন সবটুকু এটেনশন যেন নিয়ে নেয়। মাইকেলের স্থিরধী ফায়জালের মাঝেও বিদ্যমান। ফায়জালের চতুরতা যেন মাইকেল থেকেই ধার করা। ফায়জালের তবুও প্রতিশোধের প্রতিহিংসা থাকে তাই তাকে দুর্বল মনে হয় মাঝেমাঝেই কিন্তু মাইকেলের প্রতিশোধ পর্ব শেষ হবার পরও যে তাকে মাফিয়ালুপে থেকে যেতে হয় আর সে নিস্তরঙ্গ জীবনে আনন্দ বা পরিতৃপ্তি যে মৃতপ্রায় সেটিই মাইকেলের চরিত্রকে আরও দৃঢ় করে তোলে। মাইকেলের বড় ভাই সনি কর্লিওনি আর ফায়জালের বড় ভাই দানিশ খান দুজনের মাঝেই কমন গ্রাউন্ড হল- রাগ। যে হিংস্রতাকে মাইকেল আর ফায়জাল প্রশ্রয় দেয় নি সেই রগচটা মেজাজই মিলিয়ে দেয় সনি আর দানিশকে। ভিটো আর সর্দার খানের সাকসেসর হবার কথা যাদের তাদের ব্যর্থতা জরুরী ছিল কারণ দর্শককে এটা বোঝানো হয়ে যায় তাতে যে- ক্ষমতার উত্তরাধিকার রক্তের সম্পর্ক দিয়ে নয় ক্ষমতার মূল্য বুঝে নির্ধারিত হয়। আর সে মূল্য সনি কিংবা দানিশ কেউই বুঝতে পারে নি। ক্ষমতার স্পর্শে পাওয়া তাদের অহমিকার আঁধার ঢেকে দিয়ে যায় ক্ষমতা রক্ষা করবার দায়বদ্ধতাকে। তাই তো টিকে থাকতে পারে নি সনি কিংবা দানিশের কেউই। ক্ষমতার যুদ্ধে বলি হয়ে যায় তারা দুজনেই আর উত্তরাধিকারসূত্রে তা পেয়ে যায় যোগ্যজনেরাই। তবুও মাথার ওপর একটা ছায়া সবক্ষেত্রেই লাগে। একজন ফাদার ফিগার দেখাতে হয় নতুন পাওয়া ক্ষমতার পর সিদ্ধান্ত গ্রহণের দ্বিধার সময় পরামর্শ দেবার জন্য। তবে সে ফাদার ফিগারেরও ব্যাকস্টোরি দিয়ে তাকে স্ট্যাবলিশ করতে হয়। ওয়াসিপুরের নাসির আহমেদ যেমন স্ট্যাবলিশ হয়েছেন, গডফাদারের পিটার ক্লেমেঞ্জে তার চেয়ে একটু কম। তবে দুজনেই ফায়জাল আর মাইকেলকে সঙ্গ দিয়েছেন যেমনটা তারা দিয়েছেন সর্দার আর ভিটোকেও। আর দরকার হয় একজন বন্ধুবৎসল কাউকে, সেটা টম হ্যাগেন হোক কিংবা আসগর খান। আসগর কেবল কাজে সহযোগী হলেও হ্যাগেন তো আবেগেও সহযোগী। এসবের মাঝে ফ্রিডো কর্লিওনি, পার্পেন্ডিকুলাররা হারিয়ে যায়। তবে টিকে যায় ভিনসেন্ট, ডেফেনিটরা। বরং বলা ভালো তাদের টিকিয়ে রাখা হয়। কারণ গল্পটা যেখানে ক্ষমতার আর সে ক্ষমতা অর্জন যেখানে রক্তাক্ত ইতিহাস বহন করে সেখানে নতুন উত্তরাধিকার ঠিক করেই যেতে হয়। এখন সে উত্তরাধিকার কেউ ভিনসেন্টের মতো অর্জন করে নিতে পারে আবার কেউবা ডেফিনিটের মতো ছিনিয়েও নিতে পারে। ডেফিনিট হয়তো ডেফিনিট হতো না যদি তাকে ভিনসেন্টের মতো সুযোগ দিতো ফায়জাল। কিন্তু ফায়জাল মাইকেলের মতো দূরদর্শী না, তাঁর দুর্বলতাই তাই ডেফিনিটকে শক্তিশালী করে তোলে। আর ডেফিনিট ছিনিয়ে নেয় সে ক্ষমতা সুযোগ পেয়েই।

সাবপ্লট এন্ড সাবটেক্সট– অনুরাগ আর কাপোলা দুজনই একে অপরের থেকে ভিন্ন ধারার নির্মাতা। দুজনের ন্যারেশন স্টাইল, শট সিলেকশন, চরিত্রদের গভীরতা দেয়ার চেষ্টা সবই ভিন্ন হয়। দুজনই অনেকগুলো চরিত্র নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন কিন্তু অনুরাগ যেখানে অধিকাংশ চরিত্রকে কিছু না কিছু করতে দেন, তাদের আলাদা আলাদা ইনডিভিজুয়াল গল্পকে মার্জ করেন মূল গল্পের সাথে সেখানে কাপোলা গুটিকয়েক চরিত্রের মাঝেই গভীরতা প্রদান করতে পছন্দ করেন এবং তাদের চরিত্রগুলোকে কালজয়ী করে তোলার সমস্ত উপাদানই তাতে প্রয়োগ করেন। সাবপ্লটের চেয়ে সাবটেক্সটে কাপোলা কাজ করেন বেশি। অবশ্য সময় ভিন্নতাও দেখতে হবে। সাবপ্লট এখন জরুরী হয়ে পড়েছে সাবটেক্সটের সঙ্কটের কারণেই। কথায় বোঝানো এখন প্রায় অসম্ভব চরিত্রের কষ্ট, সমস্যা বা আনন্দগুলোকেও। তাই তাদের আলাদা গল্প তৈরি করে দিতে হয়। যেমনটা করেন অনুরাগ কশ্যপ। তিনি চরিত্রগুলোকে গ্রো করান আরও অনেকগুলো গল্প এনে, যার ফলে আনএডিটেড শ্যুট তাঁর পছন্দ। গড়গড়িয়ে গল্প বলে যেতে চান, একনাগাড়ে অনেকগুলো গল্প বলে একসাথে তাদের গাঁথতে চান। অন্যদিকে কাপোলা বলতে চান একটা গল্পই, বয়নের ভিন্নতা যাকে নতুন মাত্রা দেয়। ভিটো আর মাইকেলের সাদামাটা কথোপকথনে তিনি ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিশ্চিত করেন। ভিটোর সংশয় ফুটে ওঠে মাইকেলের নিজের প্রতি খেয়াল রাখা, তাঁর ভালো মন্দ জানার মধ্য দিয়ে। অথচ ভিটো বলতে চাইছেন এই মাফিয়ালুপে মাইকেল যেন না জড়ায়। কিন্তু তিনি বলতে পারছেন না সরাসরি কারণ জানেন সেটি এখন আর সম্ভব না। ওদিকে ফায়জাল বাবা, ভাইয়ের মৃত্যুর পর প্রিয় বন্ধুকে সরাসরি খুন করার মধ্য দিয়ে নিজের হাতে ক্ষমতা তুলে নেয়। সাবটেক্সটের ধার ধারে না অনুরাগ বরং সাবপ্লটে ডিল করে। অনুরাগ ডেফিনিটের জন্য আলাদা, শামশাদের জন্য আলাদা, কুরেশিদের জন্য আলাদা, রামাধিরের জন্য আলাদা গল্প বানায় তারপর তাদের গল্পকে এনে মেশায় খান পরিবারের গল্পের সাথে। একদিকে কাপোলার সাবটেক্সট ভায়োলেন্স ক্যারি করে গডফাদারের আরেকদিকে অনুরাগের সাবপ্লট ক্যারি করে ওয়াসিপুরের।

সামঞ্জস্যতা

গডফাদার

গ্যাংস অফ ওয়াসিপুর
ন্যারেশন স্টাইল- সূচনালগ্ন শুরুতে শুরু না। ইয়াং মাইকেলের টাইমলাইন, ভিটোর শেষের শুরু, মূল গল্পের মধ্যভাগে অস্তিত্ব শুরুতে শুরু না। ফায়জালের টাইমলাইন, মূল গল্পের তৃতীয় ধাপে অস্তিত্ব
অভিবাসন ইতালির সিসিলি থেকে আমেরিকা আসে ঝাড়খণ্ডের ধনবাদ থেকে ওয়াসিপুর আসে
চরিত্রায়ন ভিটো কর্লিওনি সর্দার খান (ক্ষমতা ক্রিয়েট করার দিক থেকে)
ভিটো কর্লিওনি শাহিদ খান (অভিবাসন, অড জবস, ক্ষমতাধর লোকেদের সাথে ঝামেলা করার দিক থেকে)
মাইকেল কর্লিওনি ফায়জাল খান
সনি কর্লিওনি দানিশ খান
ফ্রিডো কর্লিওনি পার্পেন্ডিকুলার
ভিনসেন্ট কর্লিওনি ডেফিনিট
পিটার ক্লেমেঞ্জে নাসির আহমেদ
টম হ্যাগেন আসগর খান
ক্ষমতার উত্তরাধিকার ভিটো>মাইকেল>ভিনসেন্ট সর্দার>ফায়জাল>ডেফিনিট
কভারড টাইম ১৯০১-১৯৯৭, ৯ দশকেরও বেশি ১৯৪১-২০০৪, ৭ দশকেরও বেশি

গডফাদারের সাথে সাদৃশ্য টানা যায় ওয়াসিপুরের অনেক দিক থেকে কিন্তু যখনই তাদের তুলনা করতে যাওয়া হবে তখনই থেমে যেতে হবে। কারণ অনুরাগ গডফাদারকে মাথায় রেখে ওয়াসিপুর বানান নি, সিটি অফ গডসে বন্দুককে খেলো করে দেয়া তাকে ওয়াসিপুরের কমিক্যাল ভায়োলেন্সে উদ্বুদ্ধ করে নি, গুডফেলাসের সাথে সামঞ্জস্য টানা যায় গল্পের আঙ্গিক দিয়ে। কিন্তু অনুরাগ তার ওয়াসিপুর নিয়ে স্বতন্ত্র কারণ হি মেইড এ মাস্টারপিস এন্ড হি নোজ ইট। সাত দশককে পাঁচ ঘণ্টাব্যাপী লাখো ফ্রেমে আটকে সেটাকে উপস্থাপন করা মুখের কথা না। সহজ না মেইন প্লটের সাথে এতো সাবপ্লটকে এনে যুক্ত করাটাও। অনুরাগ ওয়াসিপুরের ইতিহাস থেকেই গল্পটা নিয়েছেন, ফ্যাক্টবেইজড ফিল্ম বানিয়েছেন। উত্তরাধিকার সুত্রে ক্ষমতা পাওয়ার গল্প তো পৌরাণিকতার মতোই পুরনো, সেখান থেকেই গল্প নিয়েছেন মারিও পুজো, জিশান কাদরীরা। গডস এন্ড ডেমিগডস অফ পাওয়ার- ক্ষমতাদেবতাদের উত্থান আর পতন নিয়েই গডফাদার, ওয়াসিপুররা গল্প বলেছে। কাপোলা, অনুরাগদের হাত ধরে উঠে এসেছে এইসব গল্প, কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ক্ষমতার হাতবদলই দেখে এসেছে ইতিহাস। সে রক্তাক্ত ইতিহাসের গল্প বলে যাওয়া হবে এই শতাব্দী শেষেও। ততদিন প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে ‘গডফাদার অফ ওয়াসিপুর-ক্ষমতার উত্তরাধিকার’ও।

Comments
Spread the love