মূল লেখা ও ছবি- জিএমবি আকাশ, ভাবানুবাদ করেছেন- মানিক চন্দ্র দাস

*

আমার ঐ যে ছেলের বৌটা, শিরিন, বয়স ছিলো মাত্র তেরো বছর। মা বাবা মরা এতিম মেয়ে। এতিম হলে যা হয়, কেউ মেয়েটার আদর যত্ন করতো না। ফেলনা ছিলো সবার কাছে। তাই ওরে দেখা মাত্র সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ছেলের বৌ বানাবো। মেয়েটা যখনই আব্বা বলে ডাকতো, বুকের ভেতরটা একেবারে ঠান্ডা হয়ে যেতো, জানেন!

আমার কোন মেয়ে ছিলো না, শিরিন হয়ে গেলো আমার একমাত্র মেয়ে। আমার বৌটার একটু সমস্যা আছে। মানসিক সমস্যা। বছরের ছয় মাস বিছানায় পড়ে থাকে। ঐ সময়টায় আমার মেয়েটা যা করেছে তা নিজের পেটের মেয়েও করে না।

বিয়ের পর এ বাড়িতে এসে মেয়েটাকে একটা মুহুর্ত বসে থাকতে দেখিনি। সবসময় ব্যস্ত। নিজে হাতে আমার গোটা সংসার পয়মন্ত করে তুলছিলো শিরিন। এত এত কাজের ভিড়েও মাঝে মাঝে মেয়েটাকে খুব বিষণ্ণ লাগতো। কেমন চুপচাপ!

একদিন শহরে যাবো বলে আমার নৌকাটায় উঠেছি। কোত্থেকে যেনো মেয়েটা দৌড়ে আসলো আমার কাছে। চেহারা দেখেই বুঝলাম কিছু একটা বলবে আমার মেয়েটা।

জিজ্ঞাসা করতেই বললো, “আব্বা আমার জন্যে একটা সুন্দর হওনের ক্রীম আনবা?”
“আর কিছু লাগবো?”
“না আব্বা। তোমার পোলারে কইও না।”

আমি জীবনেও এইরকম কিছু কিনিনি। এই একটা ক্রীম কিনে যে কি আনন্দ পেয়েছিলাম! কোনদিন কিছু কিনে এরকম অনুভূতি হয়নি আমার।

এর কদিন পর জানলাম ছেলেটা বৌটাকে “তুই দেখতে খারাপ” বলে কি অসহ্য যন্ত্রনা দেয়। আমি জানতামই না আমার ছেলেটা তার বৌ এর উপর এতটা ঘেন্না পুষে রেখেছে। বিয়ের পর সমস্যা তো হয়ই, আমিও সেরকম ভেবে সমাধান করার চেষ্টা করেছিলাম। হলো না। সবকিছু কেমন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো। ছেলেটা বাড়িতেই আসা বন্ধ করে দিলো।

আমার ছেলে বৌটা তখন মা হতে চলেছে। ডেলিভারির সময় দেখলাম আমার নিজের পাগল বৌটা ভয় পাচ্ছে। তীব্র ভয়। বলছিলো, “শিরিন মইরা যাবে, এক্ষুনি মইরা যাবে।” পাগলীকে কে-ই বা বিশ্বাস করে বলেন? সব বাদ দিয়ে আমি আল্লাহ্র দরবারে হাত তুলে বসেছিলাম। শিরিন তার শরীরের কথা আমাকে কিছুই জানায়নি, বলেনি তার শরীরটা খারাপ। ঐদিন ঘরে কোন টাকাও ছিলো না। কপাল আমার!

নাতনীটাকে জন্ম দেবার পরপরই আমার মেয়েটা, আমার শিরিন মেয়েটা কেমন নিস্তেজ হয়ে গেলো। কিভাবে আমি ঐ সময়টায় টাকা জোগাড় করেছি আমি জানি না। নৌকা যোগাড়যন্ত্র করে বাড়ির ভেতরে গেলাম। শিরিনকে নিতে হবে ডাক্তারের কাছে।

শিরিন আটকে দিলো। আমার নিস্তেজ হয়ে পড়া মেয়েটা কোত্থেকে এত শক্তি পেলো জানি না। ফিসফিস করে বললো, “আব্বা, তুমি আমারে বাপের যে ভালোবাসাটা দিছো, তা আমি ভুলুম না। ভুলুম না।”

কি বলবো আমি? আমার কি কিছু বলার আছে? আমি বাপ তো!

মেয়েটা আবার ফিসফিস করে বললো, “তোমার ছেলে আরেকটা বিয়া করছে। আমি মইরা গেলে ওগোরে ঘরে তুইলা নিও।” দেখি আমার নিজের পাগলী বৌটাও কাঁদছে আকুল হয়ে। বাপ তো আমি, শক্ত হতে হয়। নাতনীকে কোলে নিয়ে বললাম, “সব ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা করিস না মা।”

এর মিনিট কয়েকের মধ্যেই মেয়েটা, আমার মেয়েটা চলে গেলো। আমাকে ছেড়ে চলে গেলো। একটা বার বলতে পারিনি, “মা রে, তুই আমাকে যে এত ভালোবাসছিস, এইরকম আমাকে আর কেউ ভালোবাসে নাই। তুই আমার পাগলী বৌটারে যে আনন্দে, সুখে রাখছিলি তা আমি পারি নাই।”

আমার নাতনীটার এখন বয়স আট বছর। নাম শিপা। এই মেয়েটাও তার মায়ের মতো আমাদের ভালোবাসে, যত্ন করে। স্কুলেও যায়।

আজকে আমার মেয়েটার মৃত্যুবার্ষিকী। রোজা রেখেছি। সারাটা দিন আল্লাহ্র দরবারে হাত তুলে আমার মেয়েটার শান্তির জন্য, সুখের জন্য দোয়া করি। যে সুখ-শান্তি আমার মেয়েটা এই দুনিয়ায় পায়নি, সেই শান্তি, সেই সুখ যেন আল্লাহ তায়ালা পরকালে, তার দরবারে কবুল করে দেন।

মেয়েটার জন্য আমার বুকটা পোড়ে, বেঁচে থাকতে মেয়েটাকে একটু শান্তি দিতে পারিনি, বলতে পারিনি তুই আমার কাছে কি ছিলি রে মা!

-হারুন (৬০)

মূল কথা ও ছবিঃ GMB Akash

ভাবানুবাদঃ আমিই। এইটা ঠিক অনুবাদ হয়নি। ভাবের অনুবাদ হয়েছে।

আর কোন গল্পে আমি এভাবে কাঁদিনি। আশপাশে যা হচ্ছে তার মাঝে এই গল্পে হাপুস চোখে অনুবাদ করেছি। এখন আর আকাশ ভাইয়ের লেখা অনুবাদ করি না টেকনিক্যাল কারনে। তাও এইটা করলাম। হয়তো অপরাধ করেছি, তাও করলাম।

আহারে মেয়েটা!

(জিএমবি আকাশের মূল ফেসবুক পোস্ট এই লিংকে)

Comments
Spread the love