উনবিংশ শতক ছিল পৃথিবীর ইতিহাস আবিষ্কারের শতক। তত দিনে ইউরোপীয়রা সারা দুনিয়া নিজেদের দখলে নিয়ে নিয়েছে। আর ইউরোপের অসীম কৌতুহলী গবেষকেরা দুনিয়াটা আসলে কেমন তা জানতে বের হয়ে পড়েছে। এই দলে প্রত্নতাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ, অভিযাত্রী, জীববিজ্ঞানীসহ আরো অনেকেই ছিল। তারা একের পর খুঁজে বের করছে আশ্চর্য সব ইতিহাস। যে ইতিহাস স্থানীয় লোকেরাই অনেক ক্ষেত্রে জানত না। তারা মিশরের পিরামিডের রহস্য বের করছে, ব্যাবিলনের সভ্যতা খুজে বের করছে, ভারতের সম্রাট অশোকের কীর্তিকলাপ জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশে আর ভারতের বৌদ্ধসভ্যতা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। আর আমরা জানছি পৃথিবীটা যেমন ছিল বলে আমরা ভাবছিলাম আসলে তেমন নয়!

১৮৪৩ সালে মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন শহর নিনেভেহ (বর্তমান ইরাকের মসুল)-তে আসিরীয় রাজা আসুরবানিপালের লাইব্রেরির ধ্বংসাবশেষ থেকে গবেষকরা খুঁজে পান প্রাচীন আক্কাডিয়ান (মেসোপটেমিয়ান ভাষা) ভাষায় লেখা কিছু মাটির ফলক। মাটির ফলকে খোদাই করে লিখে পুড়িয়ে স্থায়ী করার এই পদ্ধতির নাম কিউনিফর্ম, সেই যুগে লেখার পদ্ধতি ছিল এই। বহু কষ্টে গবেষকরা এই লেখার অর্থ উদ্ধার করেন ধীরে ধীরে। তারপরে ছিল আসল চমক। মোট ১২টি মাটির ট্যাবলেটে থেকে উদ্ধার হয় এক অসাধারণ কাহিনী, উর শহরের রাজা গিলগামেশ ও তার বন্ধু এনকিদুর কাহিনী! এখন পর্যন্ত পাওয়া পৃথিবীর প্রথম লিখিত গল্প এইটি ( মহাকাব্যের ফরম্যাটে বলা গল্প)। এই কাহিনী রামায়ন বা মহাভারতের চেয়েও পুরানো। গ্রীসের অডিসি আর ইলিয়ডের চেয়েও পুরনো। এমনকি হিব্রু বাইবেলও লেখা হয়নি তখন! মাটির ট্যাবলেটগুলো বলছে তাদের বয়স ৪০০০ থেকে ৪৫০০ বছর, গল্পের ঘটনা এরও অনেক আগের। এত এত আগে কোন এক বা একাধিক নাম না জানা লেখক লিখে গেছেন এক দারুণ এডভেঞ্চারের কাহিনী। রাজা গিলগামেশের সাইকোলজিক্যাল রুপান্তরের কাহিনী।

প্রাচীন মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক)-এর সবচেয়ে সমৃদ্ধ শহর উরের কোন এক সময়ের রাজা ছিলেন গিলগামেশ। তিনি ছিলেন অত্যাচারী, খামখেয়ালি রাজা। তার শরীরের তিনভাগের দুই ভাগ দেবতা, সেই অহংকারে তার মনে হতো পৃথিবীর কোন কিছুই তার অসাধ্য নয়। এই গল্প তার সেই অহংকার চূর্ণ করে মাটির মানুষে রুপান্তরের গল্প।

উর শহর, রাজা গিলগামেশ

ইরাকে উর শহরের ধ্বংসাবশেষ

রাজ্যের লোকেরা গিলগামেশের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেবতার কাছে সমাধান চাইলে দেবতা এনকিদুকে তৈরি করেন ঠিক গিলগামেশের মতো করে। তার চেহারা গিলগামেশের মতো, তার শক্তি ও সাহসও গিলগামেশের মতো। খারাপের ভারসাম্য তৈরিতে ঠিক বিপরীতমুখী ভাল তৈরি করা। চাইনীজ দর্শনের ইন এবং ইয়ানের মতো। এনকিদু বড় হয় জংগলে, পশুপাখিদের সাথে। মোগলি আর টারজানের আইডিয়ার অনুপ্রেরণা ছিল সম্ভবত এনকিদু। ঘটনাক্রমে এনকিদু শহরে আসে, গিলগামেশের সাথে বন্ধুত্ব হয়, দুই বন্ধু মিলে অনেক বড় বড় অভিযানে গিয়ে বিজয়ী হয়ে এসে শেষে এনকিদু অসুস্থ হয়ে পড়ে। গিলগামেশ তাকে কোনোমতেই বাঁচাতে পারে না। এনকিদু মারা গেলে তাকে আবার বাঁচিয়ে তুলতে গিলগামেশ রাজ্য ছেড়ে বের হয়ে পড়ে। চলতে চলতে পৃথিবীর শেষপ্রান্ত পেরিয়ে এক সময় মৃত্যুর জগতে পৌছায়। সেখানে দেখা হয় উতনা-পিশতিমের সঙ্গে, যে কিনা মৃত্যুকে জয় করেছে। কিন্তু এই অমরত্ব ভয়ঙ্কর! অমর মানুষ ভয়াবহ নিঃসংগ। উতনা-পিশতিম হলো মহাপ্লাবন সারভাইবাল। তার সময়ে ভয়াবহ বন্যা হয়, সে দেবতার নির্দেশে একটি বড় নৌকা বানিয়ে সমস্ত আত্মীয় আর গৃহপালিত পশুদের নিয়ে নৌকায় উঠে জীবন বাঁচায়। এর পুরস্কার হিসেবে সে অমর হয়, কিন্তু অমর না হলেই হয়তো ভাল ছিল। গিলগামেশের অনুরোধে সে মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে তোলার সমাধান তো দেয়, কিন্তু সেটা হাতে পেয়েও গিলগামেশ তার ছোট্ট খামখেয়ালির জন্য আবার চিরতরে হারিয়ে ফেলে। শেষমেষ পরাজিত গিলগামেশ, বন্ধুকে বাঁচাতে ব্যর্থ গিলগামেশ নিজের শহরে ফিরে আসে। এসে তার উপলব্ধি হয় সে আসলে সবকিছু পারে না, বাস্তবতা বদলানোর ক্ষমতা আসলে তার নেই। ততদিনে বন্ধুর জন্য করা অসাধারণ ত্যাগ স্বীকার তাকে মানবিক মানুষে পরিণত করেছে, সম্পর্কের মুল্য বুঝিয়েছে।

গিলগামেশের স্ট্যাচু

প্রাচীন মহাকাব্যগুলোতে এই থিমটি কমন- খুবই শক্তিশালী কারো পতন তার অহংকারের জন্য। রামায়নে রাবণের, মহাভারতের দুর্যোধন, সকলেই তাদের অহংকার আর এরোগেন্সির ফল ভোগ করে। তবে বাস্তব আর স্পিরিচুয়াল জার্নির মাধ্যমে মানসিক রুপান্তরের কাহিনী হিসেবে গিলগামেশ অনেক আলাদা তাদের চেয়ে। গিলগামেশের গল্প বাংলা অনুবাদেও পাওয়া যায়। অনুবাদ করেছেন হায়াৎ মামুদ। আগ্রহী কেউ খুঁজলেই পেয়ে যাবেন।

Do you like this post?
  • Fascinated
  • Happy
  • Sad
  • Angry
  • Bored
  • Afraid

আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিন-