রক্তাক্ত একাত্তরসিনেমা হলের গলি

গাজী এটাক ও আমাদের হতাশা

দুদিন আগে ইউটিউবে ঘোরার সময় একটা ভারতীয় মুভির নাম চোখে পড়লো। নাম গাজী এটাক (Ghazi Attack)। আমার এমনিতেই ওয়ার রিলেটেড সিনেমা গুলো পছন্দ। ট্রেলার দেখলাম শুরুতে, দেখে বুঝলাম ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় নভেম্বরের শেষের দিক থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে কোন্দল শুরু হয়েছিলো তার একটা সিক্রেট মিশন নিয়ে সিনেমাটা বানানো হয়েছে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশী গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ও অন্যান্য সহায়তা করায় ভারতের উপর বেশ নাখোশ ছিলো পশ্চিম পাকিস্তান। ভারতের উপর হামলা হতে পারে এমন একটা আভাস পাচ্ছিলো তাদের ইন্টেলিজেন্স। এর মাঝেই করাচী থেকে চিটাগং পোর্টে পাঠানো একটা মেসেজ ইন্টারসেপ্ট করে ভারতীয় ইন্টেলিজেন্স। ওই মেসেজে বলা হয় পাকিস্তানের শক্তিশালী সাবমেরিন পিএনএস গাজী (PNS Ghazi) করাচী থেকে বঙ্গোপসাগর উপকূল দিয়ে চলাচল করবে। তবে এর গন্তব্য সম্পর্কে পরিষ্কার কোন ধারণা পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ভারতীয় নেভী এক গোপন মিশনে পিএনএস গাজীর গতিবিধি অনুসরণ করার জন্য ভারতীয় সাবমেরিন আইএনএস রাজপুত (INS Rajput) কে পাঠায়। গতিপথ অনুসরণ করতে করতে রাজপুত বুঝতে পারে যে গাজী হয়তো ভারতের তৎকালীন মূল সমুদ্রবন্দর ভিশাখাপাতনাম এ হামলা চালাতে পারে। এই অনুমানকে কেন্দ্র করে গভীর সমুদ্রে গাজীর পিছু নেয় রাজপুত। এক পর্যায়ে দুই সাবমেরিনই বঙ্গোপসাগরের তলায় এক সম্মুখ সমরে জড়িয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে রাজপুতের টর্পেডোর আঘাতে ধ্বংস হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে লিজ নিয়ে আসা পাকিস্তানের শক্তিশালী সাবমেরিন গাজী। অনেকদিন পর ভারতীয় নেভী এই মিশনের সফলতা দাবী করলেও করাচী জানায় গাজীর ভেতরে নিজেদের মাইনের দূর্ঘটনাজনিত বিস্ফোরণের কারণে ডুবে যায়। যেহেতু এটি ক্লাসিফায়েড মিশন ছিলো এবং নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতীয় নেভী এর কোন রেকর্ড রাখে নি যার ফলে এর সত্যতা নিয়ে যুগে যুগেই প্রশ্ন উঠেছে।

তবে ঘটনা সেটা নয়, ঘটনা হচ্ছে এই অসাধারণ একটা গল্প দিয়েই ভারতের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি কত সুন্দর একটা সিনেমা বানিয়ে ফেলেছে। কি দারুণ সেই প্লট, কি দারুণ সেই সিনেমার এক্সিকিউশন! বাহবা পাওয়ার মত। সেই সাথে একটা জিনিস নিয়ে হতাশ হই, তা হচ্ছে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের কত সুন্দর সব গল্প। কত বীরত্বগাঁথা, কিন্তু তা নিয়ে আমরা একটা সিনেমা বানাতে পারি না। ফ্রান্সের নরম্যান্ডি বিচে মিত্রবাহিনীর আক্রমণ নিয়ে কতগুলো সিনেমা বানিয়েছে হলিউড। কিন্তু আমরা ক্র্যাকপ্লাটুন নিয়ে, চট্রগ্রাম পোর্টে পাকিস্তানি জাহাজে মাইন পাতা নিয়ে, কিংবা দেশের আনাচে কানাচে হাজারো মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বগাঁথা নিয়ে একটা সিনেমা বানাতে পারিনি।

মুক্তিযুদ্ধের পর পর ওরা ১১ জন এর মত সিনেমা হয়েছে। সাম্প্রতিক কালে হুমায়ুন আহমেদের শ্যামল ছায়া আর তৌকির আহমেদের জয়যাত্রা, জয়া আহসান অভিনীত গেরিলা ব্যতিত আর ভালো সিনেমা খুব বেশি বানাতে পারিনি আমরা। আমাদের প্রডিউসাররা মশলাদার নায়িকা খোঁজেন, আমাদের পরিচালকরা প্রেমের গল্প ছাড়া সিনেমা বানাতে চান না। রাজনৈতিক যাঁতাকলে পড়ে যুগে যুগে যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসটা পালটে যাচ্ছে, তার দায়ভার কে নেবে? আজ থেকে ১০/২০ বছর পর মুক্তিযোদ্ধারা বয়সের ভারে যখন পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবেন (অধিকাংশই নেই এখন আর), তখন কে শোনাবে মুক্তিযুদ্ধের আসল গল্পগুলো? মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সরাসরি অংশগ্রহণ কয়দিন ছিলো? একমাস? বড়জোর দেড়মাস? তার আগে যে আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধার দেশের বিভিন্ন স্থানে দুঃসাহসিক সব অপারেশন চালিয়েছেন, সেগুলো কে জানাবে নতুন প্রজন্মকে?

আমাদের পরিচালকরা প্লট পান না সিনেমা বানানোর। প্রেমের গল্প, বড়লোক বাপের মেয়ে আর গরীব ঘরের ছেলে ছাড়া তারা সিনেমা বানাতে জানেন না। ঘুরে ফিরে সেই একই গল্প, সেই একই কাহিনী। কিন্তু একটা মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা কি আমরা বানাতে পেরেছি সত্য ঘটনা অবলম্বনে?

বিশ্বের সব দেশই তাদের নিজস্ব স্বাধীনতার গল্পগুলো নিয়ে যুগে যুগে সিনেমা বানিয়ে সেই ইতিহাসকে অক্ষুণ্ন রাখে। আর আমরা করি পরিবর্তন। দেশে নাকি দশ লক্ষ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। তাদের বিপরীতে আমাদের আসল মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় কে রক্ষা করবে? নিজের রক্ত দিয়ে যে মানুষগুলো এই দেশের স্বাধীনতা কিনে এনেছে, বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটা দেশের নাম প্রতিষ্ঠা করেছে। আমরা কি তাদের ইতিহাসগুলোকে এভাবেই হারিয়ে ফেলবো?

প্রশ্ন অনেক, কিন্তু উত্তর নেই কোন।

 

Comments
Tags
Show More

Related Articles

Close