মাই ফ্রেন্ড কেম টু মি, উইথ স্যাডনেস ইন হিজ আইস
হি টোলড মি দ্যাট হি ওয়ান্টেড হেল্প
বিফোর হিজ কান্ট্রি ডাই’স
অলদো আই কুডন’ট ফিল দ্যা পেইন, আই নিউ আই হ্যাড টু ট্রাই
নাও আই এম আস্কিং অল অফ ইউ
টু হেল্প আস সেভ সাম লাইভ’স
বাঙলা–দেশ বাঙলা–দেশ
হোয়ার সো মেনি পিপল ডাইং ফাস্ট
অ্যান্ড সিউর ইট লুক লাইক আ মেস
আই হ্যাভ নেভার সিন সাচ ডিস্ত্রেস
নাও ওন’ট ইউ লেন্ড ইউর হ্যান্ড অ্যান্ড আন্ডারস্ট্যান্ড
রিলিভ দ্যা পিপল অফ বাঙলা–দেশ…

বাংলাদেশ শব্দটা উচ্চারণ করতে পারতেন না ভালোভাবে, সেটা সম্ভবও ছিল না তার পক্ষে, উচ্চারনটা ব্যাংলাদেশ ব্যাংলাদেশ হয়ে যেত। কিন্তু সেই ভাঙ্গা ভাঙ্গা উচ্চারনেই তিনি সৃষ্টি করেছিলেন ইতিহাস। গলায় অসামান্য মমতা ঢেলে দিয়ে ১৯৭১ সালের ১লা আগস্ট গানটা গেয়েছিলেন তিনি, বহুদূরের একটা অজানা অচেনা দেশের মানুষের জীবন বাঁচাবার জন্য, অকল্পনীয় আকুতি ছিল তার কণ্ঠে। শুধু গান দিয়েই না, বন্ধু রবিশংকরের সাথে হ্যারিসনের ঐকান্তিক চেষ্টায় নিউইয়র্ক এর বিখ্যাত মেডিসন স্কয়ার গার্ডেনের সেই কনসার্টে যোগ দিয়েছিলেন বব ডিলান, এরিক এরিক ক্ল্যাপটন, ক্লাউস ভুরম্যান, ড্রামার জিম কেল্টনার, গিটারিস্ট ডন প্রেস্টন, রিংগো স্টার, বিলি প্যাটারসন, ও লিওন রাসেলসহ সঙ্গীত জগতের অসামান্য কিছু নক্ষত্র… গান গেয়েছিলেন তারা, কিন্তু কোন পারিশ্রমিক নেননি। কনসার্টের নাম ছিল কনসার্ট ফর বাংলাদেশ…

পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম বিশ্ববরেণ্য শিল্পীরা একই মঞ্চে এক হয়েছিলেন নৃশংসতা আর বর্বরতার বিরুদ্ধে ঘৃণা আর প্রতিবাদ জানাবার জন্য, লাখো মানুষকে বাঁচাতে, মানবতার ডাকে। ৪০ হাজার দর্শকের সামনে একের পর এক অসামান্য গান তারা গেয়েছেন বাংলাদেশের মানুষের জন্য, মৃত্যুমুখে থাকা লাখো বাঙ্গালীর জন্য…

কনসার্টটির শুরুতেই পণ্ডিত রবিশংকর এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন,

“প্রথম ভাগে ভারতীয় সংগীত থাকবে । এর জন্য কিছু মনোনিবেশ দরকার । পরে আপনারা প্রিয় শিল্পীদের গান শুনবেন । আমাদের বাদন শুধুই সুর নয়, এতে বাণী আছে । আমরা শিল্পী, রাজনীতিক নই । তবে বাংলাদেশে আজ যে তীব্র যন্ত্রণা, বেদনা ও দুঃখের ঘটনা ঘটছে, আমাদের সংগীত দিয়ে আমরা তা আপনাদের উপলব্ধি করাতে চাই । আমরা তাদের কথাও উপলব্ধি করাতে চাই, যারা বাংলাদেশ থেকে শরণার্থী হয়ে ভারতে এসেছে।

নিজের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ আই মি মাইন-এ হ্যারিসন লিখেছেন, ‘সামান্য মহড়াই আমরা করেছিলাম। সত্যি বলতে কি, সবার উপস্থিতিতে একটা মহড়া আমরা করতে পারিনি। নানা অসুবিধার মধ্যে অগোছালোভাবে কাজটা করলাম আমরা। তারপর কনসার্ট করলাম আমরা। দুটি অনুষ্ঠান করেছিলাম। প্রথম অনুষ্ঠানের সব টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ায় দ্বিতীয় কনসার্টটি করেছিলাম। কপালই বলতে হবে, সবকিছু ভালোয় ভালোয় সম্পন্ন হয়েছিল।’

আসলেই তেমন কোন প্রস্তুতি ছাড়াই খুব অদ্ভুতভাবে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক কনসার্ট উপহার দিয়েছিলেন তারা। অনুষ্ঠানের আগে সব শিল্পীর পুরো রিহার্সেলও হয়নি। অনুষ্ঠানের আলোর ব্যবস্থা ভালো ছিল না। তথ্যচিত্র ধারণের ব্যবস্থাও পর্যাপ্ত ছিল না।
২৮শে জুলাই এই অ্যালবামের মূল গান “বাংলা দেশ” রিলিজ হয় বিশ্বব্যাপী। নিউইয়র্ক টাইমসের শেষ পাতায় ছোট্ট এড স্বত্ত্বেও টিকিট শেষ হয়ে যায় চোখের পলকে, বাধ্য হয়ে একইদিনে আরো একটি শো করার ঘোষণা দেন হ্যারিসন। প্রথম কনসার্ট দুপুর দুটোয়, পরের কনসার্ট একই লাইনআপ নিয়ে রাত আটটায়। সম্পূর্ণ সোল্ড আউট ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ রাতারাতি টক অফ দ্য ওয়ার্ল্ডে পরিণত হয়, সম্পূর্ণ অজানা এক নাম থেকে বাংলাদেশ হঠাৎ যেন সবার ঠোঁটে ঠোঁটে ফিরতে থাকা খুব আপন এক নাম হয়ে গেল।

বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্য করতে আর মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে এ ধরনের একটি অনুষ্ঠান ছিল বিশ্বে প্রথম। এরপর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা বিষয়ে বড় বড় কনসার্ট হয়েছে। দামি শিল্পীরা তাতে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর ব্যাপ্তি কোন কনসার্টই অতিক্রম করতে পারেনি। আত্মজীবনীতে জর্জ হ্যারিসন লিখেছিলেন, ‘ আমরা যখন কনসার্টের প্রস্তুতি নিচ্ছি, মার্কিনরা তখন পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠাচ্ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মৃত্যু হচ্ছে, কিন্তু সংবাদপত্রে শুধু কয়েক লাইন, “ও, হ্যাঁ, এখনো এটা চলছে। আমরা ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছিলাম। এখনো বাঙালি রেস্তোরাঁয় এমন সব ওয়েটারের সঙ্গে আমার দেখা হয়, যাঁরা বলেন, “ওহ্, মিস্টার হ্যারিসন, আমরা যখন জঙ্গলে লড়াই করছিলাম, তখন বাইরে কেউ আমাদের কথা ভাবছে, এটা জানাটাও আমাদের জন্য ছিল অনেক কিছু।’’

ইতিহাসে প্রথমবারের মত আয়োজিত এত বড় কনসার্টে একটি সহিংসতার ঘটনাও ঘটেনি, হয়নি কোনো দাঙ্গাফাসাদ। এখানে কোনো রাজনীতি জড়িত ছিলো না, জড়িত ছিল কেবল অনাথ শিশুর ক্ষুধা, যা মেটাতে বিশ্বসেরা ৩৫ জন মিউজিশিয়ান একত্রিত হয়েছিলেন এক অনন্য নজির স্থাপনে। ইউনিসেফের সহায়তায় আয়োজিত এ কনসার্টের মাধ্যমে ২০০০০ ডলার সংগ্রহের কথা ভেবেছিলেন হ্যারিসন ও রবিশঙ্কর।কিন্তু তাদের আহবানে অভুতপূর্ব সাড়া দেন পৃথিবীর মানবতা পক্ষে দাঁড়ানো অসংখ্য মানুষ, প্রায় ২৪৩,৪১৫ মার্কিন ডলার এবং ৩,৭৫০,০০০ মার্কিন ডলার যথাক্রমে লাইভ শো ও অডিও ভিডিও স্বত্ত্ব বাবদ ইউনিসেফের ফান্ডে জমা হয়েছিল, পুরোটাই ব্যয় হয়েছিল ভারতে আশ্রয় নেওয়া এক কোটি শরণার্থী ও আমাদের মুক্তিযুদ্ধে অবর্ণনীয় দুঃখকষ্ট ও যন্ত্রণায় থাকা অজস্র প্রাণের জন্য!

আর এই উদ্যেগের প্রভাব ছিল আরো অনেক বিশাল। ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ পরবর্তীতে ‘লাইভ এইড’ বা ‘লাইভ এইট’-এর মত আরও বিশাল চ্যারিটি কনসার্টের পথপ্রদর্শক হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত তিনটি রেকর্ডসহ অ্যালবাম এবং ১৯৭২ সালের মার্চের কনসার্ট নিয়ে তৈরি ফিল্ম থেকে আয় নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। পরবর্তী দশকগুলোতে এসব অর্থ দান করা হয় ইউনিসেফ পরিচালিত শিশুদের কল্যাণমূলক তহবিলে। গানগুলো তিনটি ক্যাসেটের একটি বাক্সবন্দী অ্যালবাম বেরোয়, শিগগিরই তা সারা দুনিয়ায় তালিকার শীর্ষে চলে আসে। অ্যালবামের মূল প্রচ্ছদে একটি রোগা শিশুর শূন্য থালা সামনে নিয়ে বসে থাকার ছবি ছিল। ছবিটি মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠে। হ্যারিসন আর রবিশংকরের অসামান্য এই উদ্যোগে’বাংলাদেশ’ নামটি প্রথমবারের মত সারা বিশ্বে প্রতিধ্বনিত হতে আরম্ভ করে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংস গণহত্যার কথা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। সারাবিশ্বে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহের দায়ে তীব্র প্রতিবাদের সম্মুখীন হয় নিজ দেশের ভেতর থেকেই।

বাংলাদেশের বন্ধু জর্জ হ্যারিসন মুলত বিটলসের লীড গিটারিস্ট হলেও প্রতিটি অ্যালবামেই তার নিজের লেখা ও সুর দেয়া দু-একটি একক গান থাকতো যা তাঁর প্রতিভার পরিচায়ক ছিল। বিটলস্ এর হয়ে এ সময়ের গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল-

• ইফ আই নিডেড সামওয়ান
• ট্যাক্সম্যান
• হোয়াইল মাই গীটার জেন্টলী উইপস্
• হেয়ার কামস্ দ্য সান এবং
• সামথিং

বিটলস্ ভেঙ্গে যাবার পরও তাঁর জনপ্রিয়তা কমেনি। সত্তুরের পরবর্তী সময়ে তাঁর অনেক গান প্রচন্ড জনপ্রিয় হয়েছিল। এ সময় কালের গানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল-

• মাই সুইট লর্ড (১৯৭০)
• গিভ মি পিস অন আর্থ (১৯৭৩)
• অল দোজ ইয়ার্স এগো (১৯৮১)
• গট মাই মাইন্ড সেট অন ইউ (১৯৮৭)

১৯৯৭ সালে হ্যরিসনের গলায় ক্যান্সার ধরা পড়ে। তখন তাকে রেডিওথেরাপি দেয়া হয় যা সফল হিসেবে মনে করা হয়েছিল। ২০০১ সালে তাঁর ফুসফুস থেকে ক্যন্সার টিউমার অপসারণ করা হয়। ২০০১ সালে ২৯ নভেম্বর হ্যরিসন ৫৮ বছর বয়সে মেটাস্টাটিক নন-স্মল সেল লাং ক্যন্সারে মারা যান। হলিউড ফরএভার সিমেট্রিতে তাঁকে দাহ করা হয়। এরপর তাঁর দেহভস্ম ভারতের কাশীর নিকট গঙ্গা ও যমুনা নদীতে ছড়িয়ে দেয়া হয়। নিকট পারিবারিক লোকেরা ভারতে হিন্দুরীতিতে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন। হ্যরিসনের শেষ অ্যালবাম Brainwashed (২০০২) তাঁর দুই সন্তান শেষ করেন। এবং এ্যালবামে ভগবদ গীতা থেকে একটি উক্তি ছিল, “There never was a time when you or I did not exist. Nor will there be any future when we shall cease to be.

গত ২৫শে ফেব্রুয়ারি ছিল জর্জ হ্যারিসনের জন্মদিন! ৪৭ বছর আগে সাত সমুদ্দুর তের নদীর ওপারের নিতান্তই অচেনা একটা দেশের মানুষের জন্য, মানবতার জন্য যে অসামান্য ভালোবাসা আর মমতা দেখিয়েছিলেন এই মহাপ্রাণ, সেই ভালোবাসার ঋণ কখনই শোধ করতে পারবো না আমরা। শোধ করতে পারবে না বাংলাদেশ…

জর্জ হ্যারিসন- আপনার জন্য অতল শ্রদ্ধা!

Comments
Spread the love